ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোসাদপ্রধান রোমান গোফম্যান দেশটির ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগের রাতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে অভিযানের খবর ভুলবশত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা বন্ধ হয়ে যায়। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে এ দাবি করা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনটির পক্ষে কোনো সূত্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং এর তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিতও করা যায়নি। চ্যানেল ১২ বলেছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একাংশ এই অভিযানের পক্ষে ছিলেন না। তাদের আশঙ্কা ছিল, এমন পদক্ষেপের ফলে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হতে পারে এবং নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তা সত্ত্বেও অভিযানের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্যের ভুলের কারণে অভিযানের খবর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে যায়। এরপর ওয়াশিংটন দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে পরিকল্পনাটি আটকে দেয়।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই প্রতিবেদন অস্বীকার করেছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট করেছিলেন যে ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে হামলার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
চ্যানেল ১২ আরও জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচক সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক বৃহস্পতিবার চ্যানেলটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, নেতানিয়াহু ইরানকে ঘিরে ‘উসকানিমূলক পদক্ষেপ’ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার দাবি, সেনাপ্রধানের অগোচরে মোসাদের মাধ্যমে এই পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
শুক্রবারের প্রতিবেদনটি এমন কয়েকটি প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতায় এসেছে, যেগুলো ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে প্রচারিত হয়েছিল।
গত ২৫ অক্টোবর, অর্থাৎ নির্বাচনের দুই দিন আগে চ্যানেল ১২ জানিয়েছিল, নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান এয়াল জামিরের মধ্যে নজিরবিহীন বিরোধ তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহু একটি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, ওই পদক্ষেপের ফলে ইরানের সঙ্গে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
নাম প্রকাশ না করা সূত্রের বরাত দিয়ে চ্যানেলটি জানায়, জামির ওই পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছিলেন। তিনি এ বিষয়ে আরও আলোচনা এবং পদক্ষেপটির আইনি অনুমোদনসংক্রান্ত নেতানিয়াহুর স্বাক্ষর করা নথি চেয়েছিলেন।
চ্যানেলটির দাবি, আগের ২৪ ঘণ্টায় বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। সামরিক সেন্সরশিপের বিধিনিষেধ মেনেই প্রতিবেদনটি প্রচার করা হচ্ছে বলেও তখন জানানো হয়।
প্রতিবেদনে এক সামরিক সূত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, এটি এমন একটি পদক্ষেপের বিষয়, যা ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। এমন সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এটি ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে চ্যানেলটি আরও জানায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইরান ইস্যুকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের কাজে ব্যবহার করতে পারে বলে সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল।
২৫ অক্টোবর রাতে চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে নেতানিয়াহু সেটিকে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দেন। জামিরের সঙ্গে কোনো বিরোধের কথাও অস্বীকার করেন তিনি। তবে সাক্ষাৎকারের আগের এক পর্যায়ে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তিনি সম্প্রতি আইডিএফ ও মোসাদকে ইরানের সরকার উৎখাতের নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও এই বক্তব্যের সঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা নির্দিষ্ট সামরিক নির্দেশের সম্পর্ক স্পষ্ট ছিল না।
চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পালমাখিম বিমানঘাঁটিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে নেতানিয়াহু ও জামিরের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বৈঠকের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। প্রতিবেদনে এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জামির যে ভূমিকা রেখেছেন, ইতিহাস তা ভুলবে না।’ তবে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
পরদিন ২৬ অক্টোবর, নির্বাচনের এক দিন আগে চ্যানেল ১২ ও ১৩ জানায়, নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ যে সামরিক পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন, তার বিরোধিতা করেছিলেন কেবল জামির। আইডিএফের আশঙ্কা ছিল, ওই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে এবং নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
একই দিন নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে নতুন করে বিমান হামলার পরিকল্পনা করছিলেন, তবে জামির তা আটকে দেন। পত্রিকাটি আরও জানায়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জামির উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হামলার বাইরে অন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। জামিরের আশঙ্কা ছিল, এমন পদক্ষেপ ভুল সিদ্ধান্ত হবে এবং এর জবাবে ইরান ইসরায়েলে হামলা চালাতে পারে।
‘আমরা ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছি’
ইরানের বিরুদ্ধে বাতিল হওয়া অভিযানের এই খবর এমন সময় সামনে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনায় অগ্রগতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও হামলা শুরু করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলেও খবর রয়েছে।
চ্যানেল ১২-এর আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ভোটের পরপরই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে রিপাবলিকানরা বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। তবে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার জন্য আরও সময় দিতে চান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর আশঙ্কা, আলোচনার ফলে ইরানের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প আপাতত ইসরায়েলকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
শুক্রবার ইরানের প্রতি তার বার্তা কী—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউজের বাইরে ট্রাম্প বলেন, আমরা ইরানকে পরাজিত করেছি। ইরানের সঙ্গে আমরা খুব ভালো অবস্থানে আছি। আমরা ইরানের সঙ্গে কথা বলছি। ছয়-সাত মাসে আমরা একজন সেনাও হারাইনি।
ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত না রাখলে আজ ইসরায়েল এবং প্রকৃতপক্ষে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অস্তিত্বই থাকত না।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেন, কেউ এ কথা বলতে চায় না, কিন্তু সবাই জানে এটি সত্য!
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল