1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৭ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
বান্ধবীর সঙ্গে ঝগড়ার পর টঙ্গীর মাঠে যান তাহসিফ রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলন : অর্থায়নে ইলিয়াস-কচি-জাহাঙ্গীর,সমন্বয়ে আলিফ-জুয়েল পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ-অবরোধ : মিরপুর, গাজীপুর ও সাভারে বন্ধ ছয় শতাধিক কারখানার উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বড় সংঘাতের আশঙ্কা : জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় : ৪ বিষয়ে শিক্ষক সংকট বেশি, শিখনে ঘাটতি পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে দুর্নীতি : ঢাকা ওয়াসার গচ্চা ১৫৬২ কোটি টাকা যশোরে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের প্রাসাদ থেকে অল্প দূরে আছড়ে পড়ল বিমান, ৯ জন নিহত শিক্ষকদের পে-স্কেল বাস্তবায়নে ৩২৬৭ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি

পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ-অবরোধ : মিরপুর, গাজীপুর ও সাভারে বন্ধ ছয় শতাধিক কারখানার উৎপাদন

নিজস্ব প্রতিবেদক |
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২৯ বার পঠিত

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের গাড়িসহ শতাধিক যানবাহন ভাংচুর এবং পুলিশের একটি ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের পাশাপাশি লাঠিপেটা করে। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

শ্রম অসন্তোষের প্রভাবে শিল্পাঞ্চলে পোশাক কারখানার উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত সংগঠনটির সদস্যভুক্ত ২ হাজার ১৩৪ কারখানার মধ্যে খোলা ছিল ১ হাজার ৪৬৪টি। শ্রম অসন্তোষের কারণে বন্ধ ছিল ৬৭০ কারখানা। কাজ না করে কারখানা থেকে বেরিয়ে যান ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৭২ শ্রমিক।

বিজিএমইএর এলাকাভিত্তিক হিসাবে, রাজধানীর মিরপুরে ৩২০ কারখানার মধ্যে ৬৫টিতে শ্রমিকরা কাজ না করে বেরিয়ে যান। এসব কারখানার ৫৩ হাজার ৪৫০ শ্রমিক কাজে যোগ দেননি। গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় ৮৩৬ কারখানার মধ্যে ৩৮২টি বন্ধ ছিল। এ দুই এলাকার ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭২ শ্রমিক কাজ না করে বেরিয়ে যান। অন্যদিকে সাভার-আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৪৪১ কারখানার মধ্যে ২২৩টি বন্ধ ছিল। এ এলাকায় কাজ না করে বেরিয়ে যান ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫০ শ্রমিক। নারায়ণগঞ্জের ১৯৭টি ও চট্টগ্রামের ৩৪০ কারখানায় শ্রমিক বের হয়ে যাওয়ার কোনো তথ্য দেয়নি বিজিএমইএ।

এদিকে চলমান শ্রম অসন্তোষ ও সহিংসতার পেছনে কয়েকজন শিল্প মালিকের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে সরকার। তাদের কেউ আগে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারখানা বন্ধ করা মালিকদের তালিকা তৈরি করে সরকারকে দিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অস্থিরতা সৃষ্টিতে জড়িত শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের তালিকাও চেয়েছে সরকার। গতকাল সকালে সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘কিছু শিল্প মালিকের রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন কয়েকজন শিল্প মালিক অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করছেন বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে এবং তা প্রমাণ হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে তাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। কিছু শিল্প মালিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারখানা বন্ধ করেছেন বলে তারা জানিয়েছেন। এ ধরনের মালিকদের তালিকা সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু শ্রমিক নেতা ও সংগঠন অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের নামের তালিকাও চাওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, তাদের সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই বলে সরকার বিশ্বাস করে। প্রকৃত শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা কখনো নিজেদের কর্মসংস্থান বিনষ্ট হোক, তা চাইবেন না। রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে শ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা প্রতিহত করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনে পতিত স্বৈরাচারের সমর্থক কিছু পক্ষের ইন্ধন রয়েছে। তার ভাষ্য, সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও বিভিন্ন সহিংস ঘটনার মাধ্যমে শিল্প খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। এসব কর্মকাণ্ডের অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণ সরকারের হাতে রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

শিল্প খাতের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মালিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। মালিক সংগঠনগুলোও তাদের প্রতিনিধি ঠিক করেছে। সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতির তথ্য আদান-প্রদান এবং ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য পুলিশ সদর দপ্তরে একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সরকার কোনো শিল্প-কারখানা বন্ধ হোক, তা চায় না। কারখানার সঙ্গে শ্রমিকদের রুটি-রুজির বিষয় জড়িত। আর্থিক সংকট কিংবা রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার কারণে কোনো কারখানা বন্ধ হওয়ার বিষয়টি আলাদা। কিন্তু অস্থিরতা সৃষ্টির কারণে কারখানা বন্ধ করা গ্রহণযোগ্য নয়।’ শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান বজায় রাখা এবং শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা চেয়েছে সরকার।

সাভারে মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা ছবি: সংগৃহীত।


বিকালে একই স্থানে শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাক শিল্পে চলমান সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত পোশাক শ্রমিক কিংবা ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সম্পৃক্ততা নেই। বিগত কয়েকদিনের সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ও শিল্প খাত ধ্বংস করতে সুযোগসন্ধানী ও ফ্যাসিস্টের সমর্থকরা মুখে মাস্ক পরে আন্দোলনস্থলে অনুপ্রবেশ করে সহিংসতা ছড়াচ্ছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সড়ক-মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তারা শ্রমিকের বন্ধু হতে পারে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ শ্রমিকদের কোনো অপপ্রচারে কান না দিয়ে অবিলম্বে কাজে ফিরে নিজ নিজ কর্মস্থলে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় যেসব নিরপরাধ শ্রমিক বা নেতা গ্রেফতার হয়েছেন, তাদের আইনানুগ মুক্তির বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাসও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তিন বছর অন্তর মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শেষে দ্রুত বোর্ড গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে শ্রমিকবান্ধব ও শিল্পবান্ধব মজুরি নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছেন।’ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে বোর্ডের প্রথম সভা শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বৈঠকে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও নবগঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আক্তার বলেন, ‘শ্রমিক সংগঠনগুলো আনুষ্ঠানিক কোনো ধর্মঘট বা কারখানা বন্ধের ডাক দেয়নি। কতিপয় বহিরাগত কারখানায় ঢিল ছুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মূল দাবি ছিল ন্যূনতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন, যা সরকার দ্রুত গঠন করেছে। বোর্ডের প্রথম সভায় শ্রমিক পক্ষের প্রস্তাব তুলে ধরা হবে।’ কারখানার উৎপাদন সচল রেখে নিয়মতান্ত্রিকভাবে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে দাবি আদায়ের জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই যৌক্তিক ও মানসম্মত নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বাবুল আক্তার।

এদিকে রাজধানীর মিরপুরে গতকাল সকাল থেকেই সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেখানে জলকামান ও দাঙ্গা দমনের যানও প্রস্তুত রাখা হয়। সেনপাড়া পর্বতা ও রূপনগর এলাকার বিভিন্ন অলিগলি থেকে ছোট ছোট দলে শ্রমিকেরা প্রধান সড়কে আসার চেষ্টা করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকেরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এক পর্যায়ে ধাওয়া ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়। বড় ধরনের সড়ক অবরোধ না হলেও পুলিশের তৎপরতা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় দিনভর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করে।

এর আগে রোববার মিরপুরে পুলিশের গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পাঁচটি মামলা করে পুলিশ। গতকাল দুপুরে পুলিশ বাদী হয়ে এসব মামলা করে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাতনামা এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

গতকাল সকালে মিরপুরের পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন—উত্তর) মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘রোববার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আজ (সোমবার) কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তবে বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকেরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্রে জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। রোববারের সংঘর্ষ ও পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত ও গোয়েন্দা তৎপরতা চলছে বলেও জানান তিনি।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে গতকালও পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। সকাল থেকে কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ, শফিপুর, চন্দ্রা, গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া বাইপাস, কোনাবাড়ী, সালনা, দেশীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে মহাসড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ ও যানবাহন ভাংচুর করা হয়। বেলা ১১টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাওজোড় এলাকায় পুলিশের একটি ভ্যানে আগুন দেয়া হয়। কালিয়াকৈরে একটি কাভার্ড ভ্যানেও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। পুলিশের গাড়িসহ শতাধিক যানবাহন ভাংচুরের ঘটনাও ঘটে।

শিল্পাঞ্চল-২ (গাজীপুর) পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানান, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনায় শিল্প পুলিশ, মহানগর ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। রোববার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে আরো গ্রেফতার হতে পারে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। গতকালের ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজবে কান না দিতে শ্রমিক ও নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগে বহিরাগত ও অপরাধী চক্রের সদস্যরা যাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য কালিয়াকৈরে বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিকদের সতর্ক করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ। গতকাল জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভাড়াটিয়ার বাসায় কোনো বহিরাগত বা অপরাধী চক্রের সদস্য অবস্থান করলে দ্রুত থানা কিংবা উপজেলা প্রশাসনকে জানাতে হবে। অন্যথায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায় সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিককে বহন করতে হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম ফখরুল হোসাইন জানান, আন্দোলনের সুযোগে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ও নাশকতা ঠেকাতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, জানমাল ও সরকারি-বেসরকারি সম্পদ রক্ষায় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার বলেন, ‘শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। এ বিষয়ে সরকার মজুরি কমিশন গঠন করেছে। আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে। আগামী জানুয়ারি থেকে বেতন বাড়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

এর আগে রোববারও মাওনা, শফিপুর, চন্দ্রা ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। টানা তৃতীয় দিনের আন্দোলনে শিল্পাঞ্চলের কারখানার উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে।

ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় গতকাল টানা তৃতীয় দিনের মতো পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। সকালে আশুলিয়ার জিরাবো ও নরসিংহপুর এলাকায় শ্রমিকেরা বিভিন্ন দলে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। এক পর্যায়ে তারা বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় সড়কের পাশে থাকা একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।

দুপুরে সাভারের উলাইল এলাকায় আল মুসলিম পোশাক কারখানার সামনে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ইটপাটকেল নিক্ষেপের কারণে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢাকাগামী লেনে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। কারখানা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বহিরাগত কিছু ব্যক্তি তাদের কারখানায় হামলার চেষ্টা করেছেন। এসব ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে নিরাপত্তার স্বার্থে সাভার-আশুলিয়ার ২৬৪টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।’ এসব ঘটনায় ১২ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

বিকালে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করেন ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কিছু বহিরাগত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। তাদের অনেককে শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আশুলিয়া থানায় তিনজন এবং সাভার থানায় একজন রয়েছেন। অন্যদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।’ আগের দুই দিনের তুলনায় গতকাল শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত ছিল বলেও জানান তিনি।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। আধা ঘণ্টা পর তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন। এতে অন্তত ৪ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। বেলা আড়াইটার দিকে সড়কের ভূঁইগড় এলাকায় শ্রমিকদের মুখোমুখি অবস্থানে যায় পুলিশ ও বিজিবি। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর মধ্যে বৃষ্টি শুরু হলে শ্রমিকেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। প্রায় ৩০ মিনিট বৃষ্টির কারণে শ্রমিকেরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় কিছু সময়ের জন্য সড়কে যান চলাচল শুরু হয়। পরে শিবু মার্কেট এলাকায় আবারো শ্রমিকেরা জড়ো হলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়ক অবরোধের কারণে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া মানুষ দুর্ভোগে পড়ে। অনেকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছায়, কেউ কেউ বিকল্প পথ ব্যবহার করে।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর