1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০২:০৯ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় : ৪ বিষয়ে শিক্ষক সংকট বেশি, শিখনে ঘাটতি পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে দুর্নীতি : ঢাকা ওয়াসার গচ্চা ১৫৬২ কোটি টাকা যশোরে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের প্রাসাদ থেকে অল্প দূরে আছড়ে পড়ল বিমান, ৯ জন নিহত শিক্ষকদের পে-স্কেল বাস্তবায়নে ৩২৬৭ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি ৪০ হাজার বেতনে চাকরি দেবে রকমারি.কম, থাকছে যেসব সুবিধা পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে শাবনূর

ধান উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় বাড়ছে, ন্যায্যমূল্য কোথায়?

প্রদীপ রায় জিতু |
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৮ বার পঠিত

ধানের শীষে যখন সোনালি রং ধরে; তখন কৃষকের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন জাগে। সেই স্বপ্নে থাকে সন্তানের পড়াশোনা, ঘরের প্রয়োজন মেটানো, পুরোনো ঋণ পরিশোধ, পরবর্তী মৌসুমের বীজ-সারের ব্যবস্থা কিংবা একটু স্বস্তির জীবন। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার পর সেই স্বপ্নের হিসাব মেলাতে গিয়ে যদি কৃষক দেখেন, উৎপাদন খরচই উঠছে না; তখন ভালো ফলনও তার কাছে আনন্দের কারণ থাকে না। মাঠে সোনালি ধান থাকলেও কৃষকের মনে তখন জমে ওঠে অনিশ্চয়তার মেঘ।

চলতি আমন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেই বাস্তবতাই আবার সামনে এসেছে। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় আগাম আমন ধান কাটা ও বাজারজাত শুরু হয়েছে। ফলন ভালো হলেও বাজারদর নিয়ে কৃষকের উদ্বেগ বাড়ছে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে আগাম আমন ধানের দাম মণপ্রতি ৭৫০-৯০০ টাকার মধ্যে নেমে এসেছে। একই সময়ে কৃষকেরা জানিয়েছেন, সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমের ব্যয় বেড়ে বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ ২০ হাজার টাকার বেশি হয়েছে। ফলে ভালো ফলন পেয়েও অনেক কৃষক কাঙ্ক্ষিত আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই পরিস্থিতি শুধু একটি উপজেলার বাজারদরের বিষয় নয়। বরং বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির একটি পুরোনো কিন্তু ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠা প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। উৎপাদন ব্যয় যখন বাড়ছে; তখন কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হচ্ছে কোথায়?

কৃষির সাফল্য সাধারণত উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে মাপা হয়। কত হেক্টর জমিতে আবাদ হলো, কত টন ধান উৎপাদিত হলো, আগের বছরের তুলনায় ফলন কত বাড়ল—এসব পরিসংখ্যান কৃষির অগ্রগতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু কৃষকের জীবন বোঝার জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। কৃষকের হাতে উৎপাদনের পর কত টাকা থাকল, সেই হিসাবও কৃষির সাফল্যের অংশ হওয়া উচিত।

দিনাজপুরের মতো ধান উৎপাদন প্রধান এলাকায় আমনের আবাদ ও উৎপাদন দেশের খাদ্যব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চলতি মৌসুমে ফুলবাড়ী উপজেলায় ১৮ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আমন চাষ হয়েছে ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে এবং এসব আগাম জাতের ধান ৯০-১১০ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হওয়ায় একই জমিতে পরবর্তীতে আলু বা ভুট্টা চাষের সুযোগ তৈরি হয়।

অর্থাৎ কৃষক শুধু একটি ফসল উৎপাদন করছেন না; একই জমি থেকে বছরে একাধিক ফসল তুলে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রথম ফসলেই যদি উৎপাদন ব্যয় উঠে না আসে, তাহলে পরবর্তী ফসলের বিনিয়োগও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কৃষকের কাছে ভালো ফলন তখন আর নিছক সাফল্য থাকে না; তার সঙ্গে যুক্ত হয় বাজারদরের উৎকণ্ঠা।

একজন কৃষক জমিতে ধান ফলানোর জন্য শুধু অর্থ বিনিয়োগ করেন না; নিজের শ্রম, সময় ও ঝুঁকিও বিনিয়োগ করেন। আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, রোগবালাই, পোকামাকড়, সেচের সমস্যা, শ্রমিকের মজুরি এবং বাজারদরের ঝুঁকি সবকিছুর ভার তাকেই বহন করতে হয়। অথচ উৎপাদন শেষে বাজারদর পড়ে গেলে সেই ক্ষতির বড় অংশও তার ঘাড়েই এসে পড়ে।

কৃষকের উৎপাদন খরচের মধ্যে শুধু বীজ ও সার নেই। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, আগাছা দমন, সেচ, সার প্রয়োগ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো ও পরিবহন সবকিছু মিলিয়েই প্রকৃত ব্যয় তৈরি হয়। এসব খাতে কোনো একটি ব্যয় বাড়লেও তার প্রভাব পড়ে মোট উৎপাদন খরচে। কিন্তু কৃষক যখন ফসল বিক্রি করতে যান; তখন বাজার তাকে সেই বাড়তি ব্যয়ের সমপরিমাণ মূল্য দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। এখানেই কৃষকের সংকটের মূল জায়গাটি। উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণে তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত, আবার বিক্রয়মূল্য নির্ধারণেও তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত। তিনি বাজারের একটি নির্ধারিত পরিস্থিতির মধ্যে নিজের পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে উৎপাদনের ঝুঁকি যেমন তার; বাজারের ঝুঁকিও যেন তার।

ফসল কাটার পর কৃষকের হাতে আবার সময়ও থাকে না। শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করতে হয়, কৃষিঋণ বা স্থানীয় ধার শোধ করতে হয়, পরিবারের দৈনন্দিন খরচ চালাতে হয়, পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ ও সার কিনতে হয়। এই আর্থিক চাপের কারণে বাজারদর কম থাকলেও অনেক কৃষক ধান ধরে রাখতে পারেন না। তাকে দ্রুত বিক্রি করতে হয়।

এই বাধ্যবাধকতা কৃষকের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা থাকলে কৃষক হয়তো কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু গ্রামীণ পর্যায়ে আধুনিক গুদাম, ধান শুকানোর ব্যবস্থা ও স্বল্পসুদের সংরক্ষণভিত্তিক ঋণ সুবিধা সীমিত হওয়ায় ফসল কাটার পরপরই বিক্রি করার প্রবণতা তৈরি হয়। বাজারে তখন সরবরাহ বেশি থাকে, আর সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যাওয়ার স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। এখানেই কৃষকের ন্যায্যমূল্যের প্রশ্নটি শুধু বাজারদরের প্রশ্ন না হয়ে অবকাঠামোর প্রশ্নেও পরিণত হয়।

বাংলাদেশের কৃষি বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কৃষক যে দামে ধান বিক্রি করেন এবং ভোক্তা যে দামে চাল কেনেন, তার মধ্যে এত ব্যবধান কেন? অবশ্য ধান ও চালের দাম সরাসরি তুলনা করা অর্থনৈতিকভাবে সঠিক নয়। ধান থেকে চাল উৎপাদনের সময় মিলিং, শুকানো, শ্রম, পরিবহন, মজুত এবং অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হয়। কিন্তু উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত মূল্য কীভাবে বাড়ে? তার একটি স্বচ্ছ হিসাব থাকা জরুরি।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বর্তমান অনলাইন বাজারদর ব্যবস্থায় আমন সরু চালের দাম ৭২-৭৫ টাকা, মাঝারি চাল ৫৬-৬০ টাকা এবং মোটা চাল ৪৮-৫০ টাকা কেজি দেখানো হচ্ছে। এগুলো চালের বাজারদর; ধানের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার সুযোগ নেই। তবে এই তথ্য মূল্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তর বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।

কৃষক কত পেলেন, সংগ্রাহক পর্যায়ে কত হলো, আড়তে কত হলো, মিলে কত খরচ যুক্ত হলো এবং ভোক্তার কাছে গিয়ে কত দাঁড়াল—এই তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করা গেলে কৃষকের আয় কোথায় কমে যাচ্ছে, তা বোঝা সহজ হবে। বাজারের কোন স্তরে কত মূল্য সংযোজন হচ্ছে, সেটিও তখন স্পষ্ট হবে।

সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। তবে শুধু সরকারি সংগ্রহমূল্য ঘোষণা করলেই কৃষকের সমস্যা সমাধান হয় না। গুরুত্বপূর্ণ হলো কখন সংগ্রহ শুরু হচ্ছে, কত পরিমাণ সংগ্রহ হচ্ছে, প্রকৃত কৃষক কতটা সহজে এতে অংশ নিতে পারছেন এবং বিক্রির পর কত দ্রুত তার হাতে অর্থ পৌঁছাচ্ছে।

ফসল বাজারে ওঠার পর যদি সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম পর্যাপ্ত দ্রুত শুরু না হয়, তাহলে কৃষক তার আগেই কম দামে বেসরকারি বাজারে ধান বিক্রি করে ফেলতে পারেন। আবার সরকারি সংগ্রহের প্রক্রিয়া যদি কৃষকের জন্য জটিল হয়, তাহলে ঘোষিত মূল্য থাকলেও তার বাস্তব সুফল সীমিত হতে পারে। তাই সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থাকে আরও কৃষকবান্ধব, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন। প্রকৃত কৃষকের পরিচয়, জমির পরিমাণ, উৎপাদন ও বিক্রয়ের তথ্য ডিজিটালভাবে সমন্বয় করা গেলে সরকারি সহায়তার লক্ষ্যভিত্তিক প্রয়োগ সহজ হতে পারে।

সরকারি খাদ্য মজুতও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মোট মজুত ছিল ২৩ লাখ ৩১ হাজার ৪৩৩ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ছিল ২০ লাখ ৫৫ হাজার ২৭৮ টন এবং গম ২ লাখ ৬৪ হাজার ৭৭৩ টন। সরকারি খাদ্য মজুত দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মজুত ভালো থাকলেই কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন—এমন সরল সম্পর্ক নেই। বরং খাদ্য মজুত, সরকারি সংগ্রহ, বাজারে সরবরাহ, আমদানি এবং কৃষকের উৎপাদনমূল্যের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় দরকার।

সরকারকে একই সঙ্গে দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হয়। একদিকে সাধারণ মানুষ যেন সহনীয় দামে খাদ্য কিনতে পারেন; অন্যদিকে কৃষক যেন উৎপাদন করে লোকসানের মুখে না পড়েন। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই কৃষিনীতি ও খাদ্যনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

কৃষিপণ্যের দাম কমলেই মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করার প্রবণতাও আছে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানে সংগ্রহ, পরিবহন, বাছাই, শুকানো, মজুত ও বাজারসংযোগের প্রয়োজন আছে। এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে সমস্যার কারণ হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়।

সমস্যা তৈরি হয় যখন বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায়, কৃষকের কাছে পর্যাপ্ত মূল্যতথ্য থাকে না অথবা কোনো একটি পর্যায়ের বাজার ক্ষমতা অতিরিক্ত বেড়ে যায়। তাই সমাধান শুধু মধ্যস্বত্বভোগী বাদ দেওয়ার মধ্যে নয়; বরং প্রয়োজন প্রতিযোগিতামূলক বাজার, স্বচ্ছ মূল্যতথ্য, কৃষকের সরাসরি বাজার সংযোগ এবং সমবায় ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা।

একজন কৃষক যদি জানতে পারেন, তার উৎপাদিত ধানের দাম পাশের বাজারে কত, সরকারি সংগ্রহ কোথায় চলছে এবং কোন বাজারে চাহিদা তুলনামূলক বেশি, তাহলে তিনি নিজের পণ্য কোথায় এবং কখন বিক্রি করবেন সে বিষয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের অনলাইন বাজারদর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এই তথ্যকে আরও সহজ, স্থানীয় ও কৃষকবান্ধবভাবে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। ডিজিটাল কৃষি বলতে শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগ শনাক্তকরণ বা আধুনিক প্রযুক্তি বোঝাবে না; কৃষকের হাতে সঠিক সময়ে সঠিক বাজারতথ্য পৌঁছে দেওয়াও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কৃষকের প্রতি আমাদের নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন দরকার। দীর্ঘদিন ধরে কৃষির আলোচনায় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উন্নত জাত, উন্নত প্রযুক্তি, সার, সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফলন বাড়ানো হয়েছে। এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু উৎপাদনের পর কৃষক কত আয় করছেন, সেটিও কৃষি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হওয়া উচিত।

একজন কৃষক যদি ভালো ফলন পেয়েও লোকসান করেন, তাহলে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিকে সাফল্য বলা কঠিন। কারণ কৃষক লোকসান দিলে পরবর্তী মৌসুমে বিনিয়োগ কমাতে পারেন, ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে এবং কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ কমতে পারে। তরুণ প্রজন্মও কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব খাদ্যনিরাপত্তার ওপর পড়তে পারে।

ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার অর্থ ভোক্তার জন্য অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য তৈরি করা নয়। একজন কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন এবং একজন শ্রমজীবী মানুষও সহনীয় দামে চাল কিনতে পারবেন এই দুটি লক্ষ্য একই সঙ্গে অর্জন করতে হবে। এ জন্য মূল্যশৃঙ্খলের অদক্ষতা কমানো, সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা, পরিবহন ব্যয় কমানো, বাজারতথ্য উন্মুক্ত করা এবং সরকারি ক্রয়কে সময়োপযোগী করা জরুরি। কৃষকের ন্যায্যমূল্য ও ভোক্তার সহনীয় মূল্যকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে দক্ষ ও স্বচ্ছ করতে হবে।

এখন সবচেয়ে জরুরি হলো অঞ্চলভিত্তিক ও ফসলভিত্তিক বাস্তব উৎপাদন ব্যয়ের নিয়মিত হিসাব তৈরি করা। একই ব্যয় ধরে পুরো দেশের কৃষকের হিসাব করা যাবে না। ফসল কাটার আগেই সরকারি সংগ্রহের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা দরকার, যাতে বাজারে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের সামনে একটি কার্যকর বিকল্প বাজার থাকে। সরকারি সংগ্রহে প্রকৃত কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ সহজ করতে হবে এবং অর্থ পরিশোধে বিলম্ব কমাতে হবে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে ধান শুকানো, সংরক্ষণ ও গুদাম সুবিধা বাড়াতে হবে। কৃষক সমবায় ও উৎপাদক সংগঠনকে কার্যকরভাবে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কৃষকের মোবাইলে স্থানীয় বাজারদর ও সরকারি সংগ্রহসংক্রান্ত তথ্য সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়, কৃষকের বিক্রয়মূল্য এবং ভোক্তার ক্রয়মূল্যের মধ্যকার ব্যবধান নিয়মিত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় নীতি নির্ধারণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে দেখলে চলবে না। কৃষকও একজন অর্থনৈতিক অংশীদার। তার আয়, বিনিয়োগ, শ্রম ও ঝুঁকির মূল্য আছে। কৃষিখাত টেকসই করতে হলে কৃষকের আয়ও টেকসই করতে হবে। ধানের শীষ দেখতে সুন্দর। কিন্তু সেই শীষের পেছনে যে শ্রম, ঋণ, ঝুঁকি ও অপেক্ষা থাকে, তার হিসাব সাধারণত বাজারে দেখা যায় না।

একজন কৃষক যখন ফসল ঘরে তোলেন; তখন তিনি শুধু ধান উৎপাদন করেন না। তিনি একটি পরিবারের আগামী কয়েক মাসের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তৈরি করেন। তার আয় দিয়ে স্থানীয় বাজার সচল হয়, শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ হয়, সন্তানের পড়াশোনা চলে, পরিবারের চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচ মেটে। কৃষকের আয় কমে গেলে তার প্রভাব তাই শুধু কৃষকের ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে।

চলতি আমন মৌসুমে উৎপাদন নিয়ে আশাবাদ থাকলেও বাজারদর নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিকে এখনই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ভালো ফলন হওয়ার পরও উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে ধান বিক্রির পরিস্থিতি সেই সংকটের একটি বাস্তব উদাহরণ।

কৃষককে শুধু বেশি উৎপাদন করতে বলা যথেষ্ট নয়। তার উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও কৃষিনীতি, বাজারনীতি ও খাদ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ কৃষকের হাতে যদি ফসল থাকে, কিন্তু ন্যায্যমূল্য না থাকে, তাহলে উৎপাদনের সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আর কৃষকের ঘরে যদি ধান ওঠে, কিন্তু সেই ধানের সঙ্গে স্বস্তি না ওঠে, তাহলে আমাদের কৃষি উন্নয়নের হিসাবটি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রশ্নটি তাই শুধু ধানের দাম কত তা নয়। প্রশ্ন হলো, যে কৃষক দেশের মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা তৈরি করেন, তার নিজের জীবনের অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা আমরা কতটা তৈরি করতে পেরেছি?

কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। বাজারের অনিশ্চয়তা বাড়ছে। জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ছে। কিন্তু ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা এখনো অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তা দূর করা এখন আর শুধু কৃষকের স্বার্থের বিষয় নয়। এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। কৃষককে বাঁচাতে হলে শুধু তার জমিতে ফলন বাড়ালেই হবে না; তার ঘরেও সেই ফলনের ন্যায্যমূল্য পৌঁছাতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর