বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে ‘ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা’য় পড়েন জেলেরা। ফলে ওই মুহূর্তগুলোয় জেলেরা সমুদ্রে যেতে পারেন না। এমন দিনগুলোতে বাধ্যগত পরিবর্তন আসে জেলেপাড়ার জীবনব্যবস্থায়। অর্থকষ্ট, পেশা ও নেশার তাড়না তাদের তাড়ালেও সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার সাহস করেন না। অভাবের সংসারে প্রতিটি জেলেই যেন নিরুপায় হয়ে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। আবার সুখের স্মৃতিও জমে। লম্বা সময় বাবাকে কাছে পায় জেলেদের সন্তানরা। অনেক জেলে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতেও যান। সুখ-দুঃখ মিলেই অবরোধের অবসর কাটে জেলেদের।
মা ইলিশ রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ৮ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে দেশের নদীর অভয়াশ্রমগুলোতে ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা চলবে। এ সময়ে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে এরই মধ্যে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে নদী ও মাছঘাটগুলোতে প্রচারণা চালানো হয়েছে। জেলেদের সচেতন করতে বিভিন্ন এলাকায় সভা ও মাইকিং করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে মাছ ধরতে না যাওয়ার জন্য জেলেদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলেদের জন্য এই সময়টা বেশ ভোগান্তির। কেউ কেউ সরকারি সহায়তার চাল পান আবার কেউবা পান না। পরিবারের ভরণ-পোষণ, জেলেপল্লির শিশুদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে পুরো জেলে পরিবারগুলো এমনিতেই যখন হিমশিম খায়; ঠিক তখন ‘নিষেধাজ্ঞা’ আবার নতুন হতাশার জন্ম দেয়। অবরোধের সময়টা বেকার থাকতে হয় তাদের। ফলে তারা মহাজন ও আড়তদারের থেকে দাদনের টাকা (অগ্রিম ঋণ) নেন। পাড়ার দোকানের বাকির খাতাও বেশ ভারী হয়ে ওঠে। আবার বাধ্য হয়ে অনেকে এনজিও থেকে ঋণ নেন। এসব কারণে ঋণের বোঝা পিছু ছাড়ে না জেলেদের।
ইলিশ ধরা ও বিক্রির কাজ যখন বন্ধ, তখন নানা কাজে জড়িয়ে পেট চালান মাঝি-জেলেরা। দিন এনে দিন খাওয়া এসব মানুষের জন্য অন্য কোনো পেশার সুযোগ কম। তাদের অন্য কোনো পেশায় জড়ানোর অভ্যাসও নেই। তবুও যাদের শক্তি-সামর্থ্য আছে তারা যোগ দেয় কাজে। মাটি কাটা কিংবা রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন। কেউ নেন হাট-বাজারে মজুরের কাজ। ট্রাক থেকে পণ্য নামানো, ভ্যান চালানো, মাটি কাটার কাজ, সবজির ক্ষেতে জোগালুসহ নানা কাজে দেখা যায় জেলেদের।
‘ইলিশ ধরা বন্ধ থাকলে তো আর ঘরে বইসা থাকলে পেট চলবে না। সংসার চালাইতে হইলে কিছু একটা করতেই হয়। তাই তখন নানা কাজ করেন জেলেরা। আমিও সুযোগ পাইলে যে কাজ পাই, সেই কাজই করি। কিন্তু সব দিন তো আর কাজ পাওয়া যায় না। মাছ ধরার কাজ বন্ধ, তার ওপর অন্য কাজও নিয়মিত মেলে না। তবু পেটের দায়ে কষ্ট কইরা চলতে হয়।’ বলছিলেন জেলে হারুন হাওলাদার।
আবার অধিকাংশ জেলেই পড়ে থাকেন জাল মেরামতের কাজে। মূলত মাছ ধরতে গেলে জালের কিছু ক্ষতি হয়, জাল ছিঁড়ে যায়, সুতা নষ্ট হয়। এসব জাল ফের সারতে হয়। যখন জেলেদের হাতে কাজ না থাকে, তখনই তারা জালগুলোর মেরামতের কাজে বসেন। এ কাজের জন্য জালের মালিকের থেকে জেলেরা রোজ ২০০-৩০০ টাকা পান।

জাল বুনে সময় কাটাচ্ছেন জেলে
অভাবের সংসারে শত আর্থিক টানাপোড়েন থাকলেও জেলে পরিবারেও আছে কিছু চাওয়া-পাওয়ার গল্প। মাছ ধরতে সমুদ্রে গেলে অনেক দিন লেগে যায়। সময় হয় না পরিবারকে খুব বেশি কাছে পাওয়ার। অবরোধের এই সুযোগে অনেক জেলে দম্পতি বেড়াতে যায়। জেলেবধূর ইচ্ছে জাগে, এই সময়টাতে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার।
অভাব-অনটন না বুঝলেও বাবাকে কাছে পেয়ে খুশি হয় জেলেপাড়ার শিশুরা। সারাবছরের অধিকাংশ সময় বাবাদের কাছে পায় না ওরা। অবরোধকালে বাবার কাজের চাপ না থাকায়, শত বায়না থাকে শিশুদের। সস্তা মজার খাবার, জামাকাপড়, বেড়াতে নিয়ে যাওয়াসহ শত বায়না নিয়ে বাবার আশপাশে ঘুরঘুর করে শিশুরা। বাবাকে ঘিরেই চলে ওদের খুনসুটি। আবার বাবা-চাচাদের সঙ্গে বসে শখ করে জাল মেরামতের কাজ শিখে নেয় শিশুরা।
বরগুনায় দেখা হয় শিশু হাসিবের সঙ্গে। সে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। হাসিবের বাবা হাবিবুর রহমান কাজে না যাওয়ায় বুঝে গেছে তার বাবার এখন হাতে কাজ নেই। হাসিবের নানাও একজন জেলে। হাসিব তার মায়ের কাছে শুনেছে, তার নানা ভাইও তখন বাড়িতেই আছেন। বাবা আর নানার এই ছুটির মুহূর্তে শিশুটি তার বাবার কাছে বায়না ধরেছে, পাথরঘাটায় তার নানাবাড়ি বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার। শিশু হাসিব বলল, ‘গত ছয় মাসে নানাবাড়ি যাই নাই, আমার মায়েও যায় নাই। নানায় বেড়াইতে যাইতে কইছে। আব্বায় আমাগো লইয়া বেড়াইতে যাইবে।’ অবশ্য হাসিমুখে ছেলের দিকে তাকিয়ে হাবিবুর রহমান বলছিলেন, ‘ওর মা ওকে এসব শিখিয়ে দিয়েছে।’
জানা যায়, মা ইলিশ রক্ষা, নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত, স্বাচ্ছন্দ্যে ডিম ছাড়ার সুযোগ সৃষ্টি এবং জাটকা নিধন বন্ধ করাসহ প্রতি বছর একাধিক কারণে দীর্ঘসময়ের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। বন্ধ করা হয়, জেলেদের সমুদ্রযাত্রা। ফলে সেই সময়গুলোতেও মাছ ধরতে পারেন না জেলেরা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় মৎস্য-২ (আইন) অধিশাখা ১০-এর অধীনে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি হয় ২০১৫ সালে। তখন ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার নিয়ম ছিল। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ও কঠিন আবরণযুক্ত জলজ প্রাণী বসবাসের নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং মাছের মজুত সংরক্ষণের স্বার্থ রক্ষার চিন্তাই ছিল এ আইনের মূল প্রতিপাদ্য।

ঘাটে নৌকা বেঁধে অলস সময় কাটাচ্ছেন জেলেরা
নিষেধাজ্ঞা শেষেই হয়তো জেলেদের জাল ভরে উঠবে রুপালি ইলিশ। এমন স্বপ্ন নিয়ে অথই জলের সীমানায় চোখ জেলেদের। সেই চোখেই আবার উৎকণ্ঠার ছাপ। মুখে হতাশার বাণী। জেলেরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাছের গতিবিধি-চালচলন বদলে গেছে। অসময়েও জাল ভরে ইলিশ উঠছে, আবার ভরা মৌসুমেও শূন্য উঠছে জাল। সমুদ্র-ইলিশের এমন বৈরী আচরণ উপকূলীয় জেলেদের চিন্তার বড় কারণে পরিণত হয়েছে। সাগরে জাটকাসহ ইলিশ ও অন্যান্য মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা সময়ে আর্থিক সহায়তা করা হচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে সর্বদা নজরদারিতে থাকে সমুদ্র অঞ্চল। কিন্তু তারপরও সাগর ক্রমে ইলিশশূন্য হয়ে পড়ছে।