1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৩ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় : ৪ বিষয়ে শিক্ষক সংকট বেশি, শিখনে ঘাটতি পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে দুর্নীতি : ঢাকা ওয়াসার গচ্চা ১৫৬২ কোটি টাকা যশোরে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের প্রাসাদ থেকে অল্প দূরে আছড়ে পড়ল বিমান, ৯ জন নিহত শিক্ষকদের পে-স্কেল বাস্তবায়নে ৩২৬৭ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি ৪০ হাজার বেতনে চাকরি দেবে রকমারি.কম, থাকছে যেসব সুবিধা পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে শাবনূর

ফসলের নীরব প্রহরী, কৃষকেরাও ভুলে যাচ্ছেন কাকতাড়ুয়ার কথা : খায়রুল বাশার আশিক

কৃষি ও প্রকৃতি ডেস্ক |
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৩ বার পঠিত

সবুজ ধানের ক্ষেতের মাঝখানে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে মানুষের মতো কেউ। মাথায় পুরোনো একটি মাটির হাঁড়ি, গায়ে বিবর্ণ শার্ট, শরীরজুড়ে খড়ের গঠন। দূর থেকে দেখে মনে হবে যেন কোনো কৃষক ফসল পাহারা দিচ্ছেন। কাছে গেলে বোঝা যায়—এটি মানুষ নয়, একটি কাকতাড়ুয়া।

একসময় বাংলার গ্রামাঞ্চলের মাঠে এমন দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি থেকে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে অনেক দেশীয় চাষাবাদ পদ্ধতি; তেমনই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষেতের এই নীরব প্রহরীও।একসময় কৃষকের কাছে কাকতাড়ুয়া ছিল ফসল রক্ষার অন্যতম নির্ভরযোগ্য উপায়। শুধু পাখি তাড়ানো নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিশ্বাস, লোকজ সংস্কৃতি এবং কৃষিজীবনের নানা অভিজ্ঞতা। অনেক কৃষকের ধারণা ছিল, জমিতে কাকতাড়ুয়া থাকলে পাখি, ইঁদুর কিংবা অন্যান্য প্রাণী সহজে ফসলের ক্ষতি করতে পারে না। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন, এটি জমিকে অশুভ দৃষ্টি বা কুদৃষ্টি থেকেও রক্ষা করে। ফলে ফলন ভালো হয়, গোলাভর্তি ধান ওঠে।

ইতিহাস বলছে, ৩১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশর সভ্যতায় প্রথম কাকতাড়ুয়ার ব্যবহার শুরু হয়। নীল নদের অববাহিকার উর্বর পলিমাটিতে মিশরীয়রা চাষাবাদ করত। গম থেকে শুরু করে নানা রকমের শস্য খুব পরিশ্রম করে ফলাত তারা। কিন্তু পাখির উৎপাতে সেসব ফসল রক্ষা করা দায় হয়ে পড়েছিল মিশরীয়দের। ফসল রক্ষার জন্যে ফসলের ওপরে জাল বিছিয়ে পাখি ধরত তারা। ফসলও বাঁচত, পাখির মাংসও খাওয়া হতো। কিন্তু এভাবে পশুদের আটকানো যাচ্ছিল না। তখনই পাথর দিয়ে ভয়ালদর্শন কিছু কাঠামো সাজিয়ে খেতে দাঁড় করিয়ে রাখা শুরু হয়। সভ্যতার প্রথম কাকতাড়ুয়া সম্ভবত সেটাই ছিল।

বর্তমানে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে কাকতাড়ুয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেক কৃষকই এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত নন। একসময় যে কাকতাড়ুয়া ছিল প্রায় প্রতিটি ক্ষেতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এখন তা কেবল দু’একটি জমিতে চোখে পড়ে।গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠে ঘুরে দেখা যায়, সবুজ ধানক্ষেত কিংবা ভুট্টার জমির সারি থাকলেও আগের মতো আর কাকতাড়ুয়ার উপস্থিতি নেই। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে একটি-দুটি কাকতাড়ুয়া দাঁড়িয়ে থাকলেও তা এখন অনেকটাই ব্যতিক্রম।

কাকতাড়ুয়া তৈরির পদ্ধতিও অত্যন্ত সহজ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। সাধারণত কয়েকটি বাঁশ, খড়, দড়ি, পুরোনো কাপড় এবং একটি মাটির হাঁড়ি দিয়েই তৈরি করা হতো এটি। প্রথমে বাঁশ দিয়ে মানুষের শরীরের মতো কাঠামো বানানো হয়। এরপর খড় দিয়ে শরীরের আকৃতি দেওয়া হয়। মাথার জায়গায় বসানো হয় মাটির হাঁড়ি অথবা খড় পেঁচিয়ে গোলাকার আকৃতি তৈরি করা হয়। অনেকেই হাঁড়ির গায়ে সাদা রং বা কয়লা দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ এঁকে মানুষের মুখাবয়বের মতো করে তুলতেন। পরে গায়ে পরিয়ে দেওয়া হতো পুরোনো শার্ট, গেঞ্জি কিংবা লুঙ্গি। সবশেষে সেটিকে ফসলের জমির মাঝখানে পুঁতে দেওয়া হতো। দূর থেকে দেখতে একেবারেই মানুষের মতো মনে হওয়ায় কাক, শালিক, বক, ঘুঘুসহ নানা পাখি এবং অনেক বন্যপ্রাণী বিভ্রান্ত হয়ে জমিতে নামতে সাহস পেত না।লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কাকতাড়ুয়া শুধু পাখি তাড়ানোর কাজই করত না; এটি নাকি জমিকে অশুভ শক্তি, কুদৃষ্টি কিংবা হিংসুক মানুষের নজর থেকেও রক্ষা করত।

গ্রামের প্রবীণ কৃষকদের অনেকেই এখনো সেই বিশ্বাস লালন করেন। যদিও এসব বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবু বাস্তবিক দিক থেকে কাকতাড়ুয়ার কিছু কার্যকারিতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।কৃষিবিদদের মতে, স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ুয়া পাখিদের মধ্যে মানুষের উপস্থিতির একটি ধারণা তৈরি করে। ফলে অনেক পাখি ফসলের ক্ষেতে নামতে ভয় পায়। বিশেষ করে বীজ বপনের পর কিংবা ধান পাকার মৌসুমে এটি কিছুটা কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ইঁদুর ও কিছু নিশাচর প্রাণীও মানুষের অবয়ব দেখে সতর্ক থাকে। তবে দীর্ঘদিন একই জায়গায় একই কাকতাড়ুয়া রেখে দিলে পাখি ও প্রাণীরা ধীরে ধীরে বুঝে যায় এটি কৃত্রিম। তাই এর অবস্থান বা পোশাক মাঝেমধ্যে পরিবর্তন করলে কার্যকারিতা কিছুটা বাড়ে।

বরগুনা তালতলী উপজেলার প্রবীণ কৃষক আব্দুল আলীর ভাষ্য, নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ গ্রামেই কাকতাড়ুয়ার ব্যাপক ব্যবহার ছিল। তখন রাসায়নিক কীটনাশক বা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এতটা বিস্তৃত ছিল না। কৃষকেরা স্থানীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং লোকজ কৌশলের ওপর নির্ভর করেই ফসল রক্ষা করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি ব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। উচ্চফলনশীল জাত, আধুনিক কীটনাশক, বৈদ্যুতিক বা শব্দসৃষ্টিকারী পাখি তাড়ানোর যন্ত্র এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতির কারণে কাকতাড়ুয়া ধীরে ধীরে কৃষিজীবন থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে।তবে এখনো দেশের কিছু অঞ্চলে ঐতিহ্য ধরে রাখতে কিংবা কম খরচে ফসল রক্ষার জন্য কয়েকজন কৃষক কাকতাড়ুয়া ব্যবহার করেন।

তাদের মতে, এটি শুধু একটি কৃষি উপকরণ নয়; এটি গ্রামীণ সংস্কৃতিরও একটি অংশ। কাকতাড়ুয়া যেন বাংলার কৃষকের সৃজনশীলতা, প্রজ্ঞা এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনব্যবস্থার এক জীবন্ত প্রতীক।কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিক কৃষির যুগেও পরিবেশবান্ধব ও কম খরচের দেশীয় প্রযুক্তিগুলোর গুরুত্ব একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। বরং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে কাকতাড়ুয়ার মতো লোকজ কৌশল এখনো কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। এতে যেমন রাসায়নিকের ব্যবহার কিছুটা কমানো সম্ভব; তেমনই সংরক্ষিত থাকবে বাংলার কৃষি ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গও।একসময় যে কাকতাড়ুয়া ছিল বাংলার মাঠের নিত্যসঙ্গী, আজ সেটিই হয়ে উঠেছে বিরল দৃশ্য। আধুনিকতার দৌড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে কৃষকের সেই নীরব প্রহরী। অথচ এই সাধারণ খড়, বাঁশ আর পুরোনো কাপড়ে গড়া অবয়বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলার কৃষি-ঐতিহ্য, লোকজ জ্ঞান ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অমূল্য স্মৃতি। তাই কাকতাড়ুয়াকে শুধু অতীতের একটি কৃষি উপকরণ হিসেবে নয় বরং বাংলার কৃষি-ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক হিসেবেও সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর