1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩০ অপরাহ্ন

সুমি ইসলামের গুচ্ছ কবিতা • কত কথা বলেছিলে আমার দুহাত ধরে

সাহিত্য ডেস্ক |
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার পঠিত

ধানের গন্ধে তোমাকে পাই :

অঘ্রাণের মাঠে মাঠে ধান কাটা হলে,
খড়ের আঁটিতে রোদ ঘুমায় মাথা রেখে;
তোমার হাতের গন্ধ লেগেছিল চুলে—
আজও সে গন্ধ পাই ধানক্ষেত পেরিয়ে এসে।

কলমির ফুলগুলো জল ছুঁয়ে নুয়ে আছে,
হিজলের শেকড়ে এসে ঠেকেছে ভাঙা নাও;
তুমি কি আমার মতো পথ ভুলে কোনো সাঁঝে
অচেনা নদীর কাছে চেনা কারও নাম পাও?

শিরিষের পাতা ঝরে, ঝুরঝুর করে ঝরে,
মেঠোপথ ঢেকে যায়—পায়ের শব্দ ঢাকে;
কত কথা বলেছিলে আমার দুহাত ধরে,
কিছু কথা আজও তাই হাতের রেখায় থাকে।

হীরামন পাখি এসে দোলে শিরিষের ডালে,
ঠোঁটে তার কচি পাতা, চোখে ফেরার তাড়া;
তোমারও ফেরার কথা ছিল এই পথেরই বাঁকে—
পাখিদের ঘর ভরে, আমার বুকটি ছাড়া।

রঙিন খলসে মাছ কলমির ছায়ার তলে
একবার দেখা দিয়ে কোথায় লুকিয়ে যায়;
তোমার মুখের মতো কেঁপে ওঠে টলমল জলে—
ধরতে গেলেই শুধু নিজের ছায়া পাই।

বাঁশবনে পেঁচা ডাকে; কুয়াশায় ভেজে চাঁদ,
ধানের নাড়ায় বসে কেঁপে ওঠে ছোট পাখি;
তোমাকে জড়িয়ে ধরে কেটে যেত যে রাত,
আজও তার শূন্য বুকে আমার দুহাত রাখি।

আবার ফসল হবে এইসব শূন্য মাঠে,
খড় নিয়ে উড়ে যাবে চড়ুই শিরিষ ডালে;
আমাদের বসে থাকা পুরোনো পুকুরঘাটে
দুটি ছায়া কাঁপবে কি পাশাপাশি জলে?

হয়তো তখনো আমি জল ছুঁয়ে বসে রব,
তোমার বসার ঠাঁই আঁচল দিয়ে মুছে;
যে চলে যায়, সে কি সবটুকু নিয়ে যায়—
নাকি কিছু থেকে যায় কারও বেঁচে থাকার পাছে?

জীবনের দিকে ফিরে:

কত শোক পেরিয়েও পৃথিবীর রং মুছে যায় না;
গমের শিষে রোদ ওঠে, মটরক্ষেতে ফুল।
পথের ধারে ঘাসফুলে শিশির লেগে থাকে,
হীরামন পাখির ডাকে কেঁপে ওঠে ভোর।
শুকনো পাতার নিচেও নতুন অঙ্কুর জাগে,
বৃষ্টির আশায় চাতক আকাশে মেলে ডানা;
এত ভাঙনের পরেও কলমিলতা ফুল ফোটায়—
জীবন বুঝি হারিয়েও ধরে রাখার বাসনা।

স্বর্ণচাঁপার গন্ধে ভরে পুরোনো বাড়ির পথ,
কাশফুলে হাওয়া লাগে, নদীর বুকে ছায়া;
বাঁশবনে হুতুম প্যাঁচা ডেকে ওঠে রাতে,
অন্ধকারেও কত প্রাণ জেগে থাকার মায়ায়।
দিন ফুরোয়, প্রিয় মুখও ক্রমে আড়াল হয়,
কিছু কথা বলার আগেই থেমে যায় সব কথা;
তবু কারও অসুখ হলে শিয়রে আলো জ্বলে—
এত শোকের মধ্যেও জীবনকে ভালোবাসা।

রোজ একটু মরি, তবু অনুভূতিরা বাঁচে:

প্রতিদিন একটু একটু করে ফুরিয়ে যাই,
আগের মতো সবকিছু আর মনে লাগে না;
যে কথায় একসময় চোখ ভিজে যেত,
এখন সে কথাতেও কান্না আসে না।

আগে কারও ডাকে বুক কেঁপে উঠত,
কারও অপেক্ষায় কেটে যেত দিন;
এখন অপেক্ষা করতেও ক্লান্ত লাগে,
কাউকে বলতে ইচ্ছে করে না কিছুই।

প্রথমে কমে গেল অভিমান করার ইচ্ছে,
তারপর নিজের কষ্ট খুলে বলা;
কত কথা বুকের মধ্যে জমে থাকে,
শুনবে না ভেবে আর হয় না বলা।

প্রতিদিন অনুভূতিগুলোকে কবর দিই,
নিজেকে বলি—আর মনে করব না;
অথচ রাত হলে তারা ফিরে আসে,
যেন তাদের কোথাও যাওয়া হয়নি।

আবার সেই মুখ, আবার সেই কথাগুলো,
আবার না পাওয়ার কষ্ট বুকে বাজে;
যা কিছু ভুলে সারাদিন কাটিয়ে দিই,
রাত হলে সবই এসে বসে পাশে।

সকাল হলে উঠি, চুল বাঁধি, কাজ করি,
সবার সঙ্গে আগের মতো কথা বলি;
কেউ জানে না, কতবার কান্না থামিয়ে
মুখে একটু হাসি নিয়ে সামনে আসি।

তবু কেউ আদর করে কাছে ডাকলে,
আটকে রাখা কান্না আর মানে না বাধা;
তখন বুঝি, অনুভূতিগুলো মরে যায়নি—
আমি শুধু তাদের লুকিয়ে রাখতে শিখেছি।

মানুষের পৃথিবী:

শহরজুড়ে আলো জ্বলে, তবু কত ঘর অন্ধকার,
ক্ষুধার্ত শিশুর পাশ দিয়ে খাবারবোঝাই গাড়ি যায়;
মানুষ দূরের নক্ষত্রের খবর রাখে,
অথচ পাশের ঘরে কে কাঁদে—
সেই খবর রাখে না কেউ;

কাছে থাকলেই কি মানুষের কাছে থাকা হয়?
তবু অভাবের দিনেও শেষ মুঠো চাল ভাগ হয়,
অচেনা মৃতের চোখ ঢেকে দেয় অপরিচিত হাত;
যে মাঠে রক্ত ঝরেছে, সেখানেও গমের শিষ দোলে,
সন্তানকে বুকে নিয়ে মা জেগে কাটায় রাত।
এত নিষ্ঠুরতার পরেও মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ায়—
কেউ হাত ধরে বলেই আরেকজন বাঁচার সাহস পায়।

যেটুকু রয়ে যায়:

পুরোনো বাড়ি ভাঙলে ধুলোয় ঢাকে পথ,
যে গাছ ছায়া দিত, পড়ে থাকে তার ডাল;
বাসা খুঁজতে পাখি এসে ঘুরে ঘুরে যায়,
এখানে কারা থাকত, ভুলে যায় মহাকাল।
তবু চলে যাওয়ার আগে লাগানো চারাগাছে
প্রথম ফুল দেখে থেমে যায় অচেনা পথিক;
যে মানুষটি নেই, তার হাতের যত্নটুকু
ফুল হয়ে রয়ে যায় আরও কিছুদিন।

এইটুকু ইচ্ছে:

ইচ্ছে করে, নিজের জন্য বাঁচলে অপরাধী হতে না হয়,
ক্লান্ত হলে বলা যায়—আজ আর পারছি না।
ভালোবাসার মানুষকে ভালো রাখতে গিয়ে
নিজের ভালো থাকাটুকু বিসর্জন দিতে না হয়।
কেউ ভালোবাসুক পাশাপাশি হেঁটে,
পায়ের নিচে জায়গা দিয়ে নয়।
আর চলে যেতে চাইলে যেতে পারি—
নিজেকে সঙ্গে নিয়েই।

মাটির কাছে রাখা:

কত নাম মুছে গেছে ভাঙা ঘাটের ইট থেকে, কত মুখ ডুবে গেছে পুকুরের শ্যাওলা-সবুজে; কার্তিকের ধান কেটে ঘরে ফিরেছে মানুষেরা, কেউ আর ডাকেনি তাকে—ধানের গন্ধে যে ফিরত।

অশ্বত্থের শেকড় এসে জড়িয়ে ধরেছে পুরোনো ভিটে, বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে আলতার শেষ লালটুকু; যে হাতে ভাত বেড়ে দিত, সে হাত মাটির নিচে—আজও কারও ক্ষুধা পেলে সেই হাত মনে পড়ে।

মানুষ চলে গেলে তার সবটুকু চলে যায় না, কিছু থেকে যায় অন্যের শীতের কাঁথা হয়ে; অনেক বছর পরে সেই কাঁথা গায়ে টেনে বুড়ো একটি মানুষ শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়ে।

জমে থাকা কথা:

অনেক দিন পর তোমার পাশে বসে আমাদের পুরোনো কথাগুলো খুলে বসলাম। এতকাল না বলায় সব শক্ত হয়ে গেছে, একটাও আর মুখে তোলা যায় না।

তুমি বললে, একটু জলে ভিজিয়ে রাখো, দেখো আবার আগের মতো হয় কি না। আমি জল আনতে গিয়ে ফিরে এলাম, কথাগুলো তখন তোমার চোখে ভিজছে।

একটা কথা তুলে তুমি বললে, এটা সেদিন বললেই পারতে। আমি বললাম, তুমি চলে যাচ্ছিলে, ডাকতে গিয়ে গলায় আটকে গিয়েছিল।

তুমি কথাটাকে দুহাতে ভেঙে অর্ধেক আমার হাতে তুলে দিলে। এত বছর বাদে সেটুকু মুখে দিয়ে দুজনেই বুঝলাম, কতটা ক্ষুধা ছিল।

উত্তরাধিকার:

পিতার কবর থেকে উঠে আসে লৌহসিঁড়ি; প্রতি ধাপে একটি অসমাপ্ত অনশন। আমি উঠতে থাকি— পায়ের নিচে ক্ষয়ে যায় বংশলতিকা।
চূড়ায় কোনো সিংহাসন নেই; একটি শস্যহীন গোলা, ভাঙা দাঁড়িপাল্লা। পাল্লার একদিকে রাখি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ঈশ্বর, অন্যদিকে মায়ের না-খাওয়া ভাত— পৃথিবী মায়ের দিকে কাত হয়ে থাকে।

নির্বাসন:

আমার জিহ্বায় একটি বিলুপ্ত নগর; উচ্চারণ করলেই ধসে পড়ে তার প্রাকার। সেখানে মৃতেরা মুদ্রা গোনে, জীবিতেরা নিজের নাম বন্ধক রাখে।
আমি সেই নগরের শেষ অধিবাসী—কণ্ঠনালিতে বহন করি তার ভগ্ন তোরণ। আমাকে নির্বাসন দিতে এসে সম্রাট দেখলেন, তাঁর সাম্রাজ্যের মানচিত্র আমার তালুর রেখায়।

প্রত্নলিপি:

আমার পাঁজর খুঁড়ে যে তাম্রলিপি পেলে, তার অক্ষরগুলো এখনও উষ্ণ। ওগুলো পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে তোমার আঙুলে লেগে যাবে অনূদিত না হওয়া কান্না।
লিপিকারের নাম মুছে গেছে; শুধু একটি ক্রিয়াপদ অক্ষত—অপেক্ষা। তার পাশে তোমার নামের জন্য রাখা শূন্যস্থানে শেকড় নামিয়েছে একটি অন্ধ অশ্বত্থ।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর