1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৫ অপরাহ্ন

দেশের মাটিতে মরুভূমির খেজুর চাষে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন পাবনার সাইফুদ্দিন হিরু

কৃষি ও প্রকৃতি ডেস্ক |
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৬ বার পঠিত

দেশের মাটিতে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির ফসল ফলানো কি আদৌ সম্ভব? বিশেষ করে যে ফলটির জন্য প্রয়োজন তীব্র দাবদাহ আর শুষ্ক আবহাওয়া। চার বছর আগে যখন পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের তরুণ সাইফুদ্দিন হিরু এই স্বপ্ন দেখেছিলেন; তখন স্থানীয়রা তাকে ঘিরে এমন প্রশ্নই ছুঁড়ে দিয়েছিলেন।

হিরুর এমন উদ্যোগে অনেকেই বলেছিলেন, ‌‘নিজ মাটিতে বাঙালির ভাগ্যে সৌদি খেজুর কেমনে জোটে।’ কিন্তু সব সংশয় উড়িয়ে দিয়ে হিরু আজ অনন্য দৃষ্টান্ত। তার ৩৩ শতাংশের সবুজ জমিতে এখন ঝুলছে থোকায় থোকায় আজোয়া আর মরিয়মসহ বিভিন্ন জাতের খেজুর। পাবনার মাটিতে বিদেশি খেজুর চাষের এ সফল রূপান্তর এখন আলোচিত বিষয়।

২০২২ সালের কথা। শখের বশে গয়েশপুর এলাকার রাজিব নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে মাত্র ৪টি চারা সংগ্রহ করে বাগানের যাত্রা শুরু করেন হিরু। জমি নির্বাচন করেন মাত্র ৩৩ শতাংশ। শুরুতেই তাকে পড়তে হয় সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে। বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়া এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত খেজুর চাষের জন্য বড় প্রতিবন্ধক। স্থানীয় অভিজ্ঞ কৃষকেরাও তাকে নিরুৎসাহিত করেন।

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই কেবল ইন্টারনেট এবং ইউটিউবকে মাধ্যম করে পড়াশোনা শুরু করেন হিরু। হাল না ছেড়ে কৌশলগত উপায়ে এগোতে থাকেন। দেশের আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে পারে এমন জাত খোঁজা শুরু করেন। বর্তমানে তার বাগানে আজওয়া, মরিয়ম, মেজুল, ছুক্কারি, ওয়ারহিছ ও বরইসহ প্রায় ১০-১২টি উন্নত জাত আছে। গাছের সংখ্যা ৬০টি। গাছ থেকে উৎপাদিত নতুন চারা বা ‘সাকার’ দিয়ে বাগান বড় করার কথা ভাবছেন তিনি।

হিরুর এই অভাবনীয় সাফল্য দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দূর-দূরান্তের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বাগানের ভিডিও দেখে চাটমোহর থেকে ফেরার পথে টেবুনিয়ার কৃষক হাসান দেখতে এসেছেন এই বাগান। গাছে গাছে খেজুরের ফলন দেখে তিনি রীতিমতো আপ্লুত।

একদন্ত এলাকার তরুণ রুহুল আমিন জানান, হিরু প্রমাণ করেছেন যে সঠিক চেষ্টা থাকলে মরুভূমির ফলও দেশের মাটিতে ফলানো সম্ভব। তবে পাবনা শহর থেকে আসা কলেজছাত্র রাফিনের মতো অনেকের মনেই এখন একটাই প্রশ্ন—‘মরুভূমির খেজুরের মতো এই খেজুরও কি সমান সুস্বাদু হবে?’ স্বাদের ওপরই নির্ভর করছে এই চাষের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিকীকরণ।

হিরুর এই সফলতা জানান দেয়, সঠিক জাত নির্বাচন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করলে বাংলাদেশের মাটিও হয়ে উঠতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প। সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেলে এই ‘মিষ্টি সোনা’ দেশের অর্থনীতিতে নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারে।

সফলতার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সাইফুদ্দিন হিরু বলেন, ‘শুরুতে যখন মানুষ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতো, খুব কষ্ট হতো। কিন্তু আমি দমে যাইনি। আজ যখন গাছে গাছে ফল, তখন সব কষ্ট সার্থক মনে হয়। তবে বাণিজ্যিকভাবে এটিকে বড় করতে হলে এখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা প্রয়োজন।’

পাবনা জেলায় এটাই প্রথম বাণিজ্যিক খেজুর চাষের উদ্যোগ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘উদ্যোক্তা সাইফুদ্দিন হিরু ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সফল হয়েছেন। তবে মরুভূমির তুলনায় এ দেশের মাটিতে গাছ ও খেজুরের বৃদ্ধির হার কিছুটা কম। এই প্রবৃদ্ধি কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আমাদের কৃষি বিভাগ কাজ করছে এবং বাগানটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে।’

তিনি বলেন, ‘এই খেজুরের স্বাদ ও বাজারদর সন্তোষজনক হলে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই-বাছাই করে পুরো জেলায় এর চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।’

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর