কোটা আন্দোলন জুলাইয়ের শুরুর দিকে খুবই সাধারণ একটা যৌক্তিক দাবিতে শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এসেও কেন এই বৈষম্য থাকবে এই বাংলায়, এই সামান্য দাবি টুকু আজ গণআন্দোলনের দাবানলে রূপ নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের দিকে এগুচ্ছে, কিন্তু কীভাবে?
ছাত্র আন্দোলন শুরুতে দমানোর জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও শিক্ষামন্ত্রী নওফেল ছাত্রলীগ ও ভাড়াটে গুন্ডাবাহিনী এবং আওয়ামী পুলিশ লীগ লেলিয়ে দিলেন। দাবি পূরণে নূন্যতম তোয়াক্কা না করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আইনের মারপ্যাচ দেখাতে থাকেন শিক্ষার্থীদের। এতে শিক্ষার্থীরা একটুও বিচলিত না হয়ে তাদের ন্যায্য দাবী আদায়ে অনড় থাকেন এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন ফেরত সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করে আন্দোলনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে শিক্ষার্থীদের উল্টো রাজাকার ট্যাগ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন উস্কানিমূলক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ঐ দিনই মধ্যরাতে দেশজুড়ে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সরকার তার পেটুয়াবাহিনী পুলিশ ও সশস্ত্র ছাত্রলীগ দিয়ে বরাবরের মতো আন্দোলন দমানোর জন্য বর্বরোচিত হামলা মামলা হত্যা নির্যাতন চালালে আবু সাঈদসহ ৬ শিক্ষার্থী শহিদ হন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হন ও কারাবরণ করেন। এতে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ লাভ করে। ফলে সরকার বেসামাল হয়ে কারফিউ জারি সহ বিরোধী দমন-পীড়নে অতিমাত্রায় সর্বোচ্চ বল প্রয়োগ শুরু করেন। এতে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার রাজনৈতিকভাবে সমাধানের লক্ষ্যে যেখানে সর্বদলীয় জাতীয় সংলাপ ডাকার প্রয়োজন ছিলো, তা না করে একব্যক্তি কেন্দ্রীক রাজনৈতিক দলের নেতা ১৪ দলের নেতাদের ডেকে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন এবং ২ দিনে তা বাস্তবায়ন করেন। অনির্বাচিত তকমায় বার বার নির্বাচিত এ সরকার ক্ষমতার ঘোরে গণতন্ত্রের প্রতি সামান্যতম দৃষ্টি না দিয়ে বিরোধী দমন-পীড়ন ধারা অব্যাহত রাখেন। ইতিহাসের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী এ আন্দোলনে আত্মাহুতি দিলেও সরকারের আজও টনক নাড়েনি। ন্যাক্বারজনক হামলা দিয়ে এই নৃশংতার সূত্রপাত, ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে যেই হামলা প্রথম নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা ছাত্রসমাজকে, যেই আন্দোলন পরে গড়িয়ে যায় আরো সামনের দিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে বের করে দেয়া ছাত্রলীগকে, সারাবাংলায় রব উঠে আমি কে, তুমি কে রাজাকার, রাজাকার।। কে কে বলেছে, কে কে বলেছে স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।।
মানুষের যখন পতন আসে, পদে পদে তার ভুল হতে থাকে, এই বিখ্যাত উক্তি আমরা সবাই পড়েছি। এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল, পুরো জুলাই মাস সরকারের একের পর এক ভুল পদক্ষেপে।
এ জাতি দেখল আবু সাঈদের বীরত্ব এবং পুলিশ বাহিনীর নির্মমতা, যা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি কেউ। সময়ের পরিক্রমায় ১৫,১৬ জুলাইয়ের দিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলো বিজিবি, পুলিশের পদক্ষেপে এবং মেরুদণ্ডহীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে যখন ভ্যাকেন্ট করে দেয়া হয়, অনেকেই ভেবেছিলেন আন্দোলন হয়তো থেমে যাবে।
কিন্তু ফিনিক্স পাখির মত ছাইচাপা সেই আগুন থেকে বুক চিতিয়ে জেগে ওঠে দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলো ব্র্যাক, নর্থ সাউথ, ইস্ট ওয়েস্ট সহ ১০০ খানেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রতিরোধ গড়ে উঠে ১৮ জুলাই, তার স্বাক্ষী হয় পুরো বিশ্ব। সবাই স্বাক্ষী হয় এই সরকারের পালিত বাহিনী পুলিশ, বিজিবির নির্মম হত্যাযজ্ঞ এর মুগ্ধ, ৬ বছরের রিয়া , বাসায় বসে গুলিবিদ্ধ হওয়া, ছাদে বসে শহীদ হওয়া, বিল্ডিংয়ের কার্নিশে ঝুলে থাকা মানুষের গায়ে একের এক গুলির ঘটনা দেখেছে সবাই।
১৮ জুলাইয়ের পর ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট, কারফিউ জারি দিয়ে শেষরক্ষার চেষ্টা হয়েছিল। চেষ্টা হয়েছিল ডিবি অফিসে সমন্বয়কদের দিয়ে সাজানো বিবৃতি দিয়ে আন্দোলন থামানোর। কিন্তু ভাই- বোন ও আপামর জনতার রক্তের উপর দিয়ে কোটার সমাধান চায়নি কেউ। তাই, ছাত্র জনতার ৯ দফা দাবি, এখন গণমানুষের দাবি। আইনজীবী, শিক্ষক, জনতা, সাংবাদিক, চিকিৎসক সবার দাবি। দেশের পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক নয়, মিডিয়া সহ দায়িত্বশীল মানুষের চাটুকারিতায় মানুষ এখন আর ভোলে না, সবাই ন্যায় অন্যায়ের ফারাক বুঝে। একটা স্বাধীন দেশে এইভাবে গণগ্রেফতার,গুম, খুন চলতে পারে না, যা বুঝতে পেরেছে সর্বস্তরের মানুষ, যা এগিয়ে যাছে গণআন্দোলনের দিকে,হতে পারে গণঅভ্যুত্থান।
আন্দোলন আগস্ট মাসেও থেমে নেই, রক্তে আগুন জ্বলছে, ঢাকা,চট্টগ্রাম, খুলনা,বরিশাল, সিলেট, হবিগঞ্জ সহ সারাদেশের ছাত্র জনতা জেগে উঠেছে। আর কতো রক্ত চাই,কতো লাশ দেখতে চায়,আমরা একবারও মরবো তাহলে সেই মৃত্যু কেন বীরের মৃত্যু নয়,কেন শহীদ আবু সাইদ ও মুগ্ধ’র মতো নয়।ছেলে গুলির সামনে আমি কেন বসে থাকবো। এই বন্ধুর পথ অনেক বাকি, সামনে আরো কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। এখন সময় নয় ডান,বাম, ধর্ম, জাত বর্ণের, কোনো বিশ্বাসের ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ করার, এখন সময় একতার।
“যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ
কিন্তু, তুমি যদি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমি বাংলাদেশ। ”
বিজয় আসবেই
মো: মঞ্জুর হোসেন ঈসা
চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার সমিতি