নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি এখন ভয়াবহ বন্যায় ক্ষত বিক্ষত। সীমিত পরিসরে খুবই ধীরগতিতে চলছে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন। এতে করে সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট। বাড়ছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে ভোগান্তি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য ত্রাণ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক কনটেইনার তিন-চার দিন ধরে মহাসড়কে আটকে থাকার কারণে পুরো যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম। যানজটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না। এতে করে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরটিতে কনটেইনার জট দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগিদের মতে, হাইওয়ে পুলিশের নিস্ক্রিয়তায় যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। পুলিশ সক্রিয় হলে মানুষের এত ভোগান্তি পোহাতে হতো না। যদিও পুলিশের দাবি, যানজট নিরসনে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা জানান, মহাসড়কটি পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে না। এতে করে পণ্য সরবরাহ ঘাটতিতে সারাদেশেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসিপত্রের দামে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সেনাবাহিনীর তত্ত¡বধানে জরুরীভিত্তিতে মহাসড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। সওজের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী সুমীত চাকমা বলেন, ভয়াবহ বন্যায় সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত হয়ে গেছে। কিছু অংশের গর্ত সংস্কার করা হয়েছে। বাকি গর্তগুলোও দ্রুত সংস্কার কাজ চলছে। আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক হবে।
জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর লালপুল ও লেমুয়া ব্রিজ এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম এলাকায় বন্যার খরস্রোতের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বন্যার পানি কমে যাওয়ায় মহাসড়ক থেকে পানি নামার পর গত রোববার বিকাল থেকে ধীর গতিতে যান চলাচল শুরু হয়। তবে এর আগে, চার দিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম এবং চট্রগ্রামের মিরসরাই থেকে ফেনী সদরের লালপোল পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটারে শত শত যানবাহন আটকে ছিল। যানবাহনের মধ্যে বেশির ভাগই বন্দর থেকে বের হওয়া পণ্যবাহী যানবাহন।
বন্যার পানির তীব্র স্রোতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লালপোল ও লেমুয়া অংশে ফাটলের কারণে সৃষ্টি হয় একাধিক বিশাল গর্তের। একই সঙ্গে ভেঙে পড়ে মহাসড়কের সড়ক বাঁধ বা ডিভাইডার। কুমিল্লা ও ফেনী অংশের অধিকাংশ জায়গায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। চলাচলের সময় এসব গর্তে পড়ে অনেক গাড়ি বিকল হয়েছে। কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড থেকে ফেনীর লেমুয়া ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ৮৭ কিলোমিটার সড়ক ভেঙে যাওয়ায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে নিয়মিত। পানি নামার খবরে মহাসড়কের যান চলাচলের খবর পেয়ে গত রোববার রাতে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম থেকে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল শুরু হওয়ায় মহাসড়কে গাড়ির চাপ তীব্র আকার ধারণ করে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে মহাসড়কে কয়েক হাজার পণ্যবাহী গাড়ি এক সারিতে আসা-যাওয়া করছে। ত্রাণবাহী গাড়িও চলাচল করছে খুবই ধীরগতিতে। চাল, পেঁয়াজ, তেল, আটা, রসুন, মসলা ও মসুর ডালের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য বিভিন্ন জেলার উদ্দেশ্য রত্তনা দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় দিকে কয়েক হাজার পণ্যবাহী ট্রাক আটকা পড়ে আছে। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক জামাল হোসেন বলেন, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে এখন প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত লেনদেন কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে নিত্যপণ্য সরবরাহব্যবস্থায় ধস নামবে।
এদিকে, চট্রগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা গ্রীনলাইন পরিবহন চালক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, বুধবার বিকালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে যানজটে আটকা পড়ি। এখন বিকাল হয়ে গেছে। চৌদ্দগ্রামে আটকে আছি। ঢাকায় কখন পৌঁছাব তা জানি না। যানজটের কারণে কোনো খাবার পাচ্ছি না।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্রাকের চালক শাকিল আহমেদ বলেন, ফেনী সদরের লালপোল এলাকায় মহাসড়কের একটা অংশ ভেঙে গিয়েছিল। পানি ছিল বুক পর্যন্ত। আজ পানি সরে গেছে। সেনাবাহিনী ভাঙা অংশ মেরামত করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার ভাঙা সড়কের চৌদ্দগ্রাম একটি গাড়ি উল্টে যাওয়ায় আটকে ছিল প্রায় শত শত গাড়ি। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়শনের (বাফা) সহ-সভাপতি খায়রল আলম সুজন বলেন, গত কয়েকদিনের তুলনায় বেসরকারি ডিপোতে বেশি রপ্তানিমুখী যানবাহন আসছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েকদিন সময় লাগবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, মহাসড়কটি দ্রæত মেরামত করা দরকার। বন্যার কারণে মহাসড়কের অনেক অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, পরিস্থিতি যাই হোক আশা করছি দুই-তিন দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল বলেন, মহাসড়কের কয়েকটি এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আবারও কনটেইনার জট দেখা দিয়েছে। তবে এখন ওইসব এলাকার পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যে মহাসড়কে যাতায়াত নির্বিঘœ হবে।
এদিকে এছাড়া মহাসড়কের যান চলাচলের খবর পেয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল শুরু হওয়ায় মহাসড়কে গাড়ির চাপ আরো তীব্র ধারণ করে। এতে করে গণপরিবহনের নারী ও শিশুদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। যানজটে আটকা পড়ে আছে ত্রাণবাহী গাড়ি। আব্দুল কুদ্দুস নামে এক লরি চালক বলেন, সড়কে যান চলাচল শুরুর খবর শুনে গত রাতে গাজীপুর থেকে পোশাকপণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে রওনা হয়েছি। ১৫ ঘণ্টা হয়ে গেছে, এখনো পদুয়াবাজার পার হতে পারিনি। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী হানিফ পরিবহনের যাত্রী নুসরাত জাহান বৃহস্পতিবার দুপুরে বলেন, মহাসড়কের যান চলাচলের খবর শুনে ঢাকার উদ্দ্যেশে রওনা করি। দিনের ২টা বেজে গেছে, এখনো চৌদ্দগ্রামে আটকা পড়ে আছি।
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের অতিরিক্ত ডিআইজি খাইরুল আলম বলেন, যান চলাচল স্বাভাবিক করতে হাইওয়ে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।