1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৪১ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় : ৪ বিষয়ে শিক্ষক সংকট বেশি, শিখনে ঘাটতি পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে দুর্নীতি : ঢাকা ওয়াসার গচ্চা ১৫৬২ কোটি টাকা যশোরে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের প্রাসাদ থেকে অল্প দূরে আছড়ে পড়ল বিমান, ৯ জন নিহত শিক্ষকদের পে-স্কেল বাস্তবায়নে ৩২৬৭ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি ৪০ হাজার বেতনে চাকরি দেবে রকমারি.কম, থাকছে যেসব সুবিধা পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে শাবনূর

লাঙল-যন্ত্র, আশির দশকের কৃষি ও আজকের কৃষকের পরিবর্তন

ফিচার ডেস্ক | সানজিদা নুসরাত পিংকী |
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬
  • ৮৭ বার পঠিত

ভোরের আলো তখন ঠিকমতো ফোটেনি। কুয়াশা ভেজা মেঠোপথ ধরে এক কৃষক মাঠের দিকে হাঁটছেন। কাঁধে লাঙল, হাতে দড়ি, পাশে ধীরগতিতে এগিয়ে চলেছে দুটি বলদ। দূরে কোথাও শোনা যাচ্ছে গরুর ঘণ্টার শব্দ, আবার কোথাও কৃষকের সুরেলা ডাক। গত কয়েক দশক আগেও এ দৃশ্য ছিল গ্রামবাংলার প্রতিদিনের চিত্র। কৃষি তখন ছিল শ্রম, ধৈর্য আর প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের এক জীবনব্যবস্থা। সময়ের স্রোতে সেই কৃষি আজ বদলে গেছে অনেকখানি। লাঙলের যুগ পেরিয়ে এখন কৃষি পৌঁছেছে যন্ত্রের যুগে। তবে এই পরিবর্তনের গল্প শুধু প্রযুক্তির নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের জীবন, সম্পর্ক ও অনুভূতিরও পরিবর্তন।

চলুন আজ স্মৃতির পাতায় একটু ফিরে যাই। প্রবীণ ও বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে শোনা কৃষির গল্প যেন আমাদের নিয়ে যায় এক ভিন্ন সময়ের গ্রামবাংলায়। আগেকার কৃষিকাজ, কৃষকের জীবনযাপন এবং আজকের কৃষির সঙ্গে নানা পরিবর্তনের দিকগুলোই তুলে ধরা হলো অতীতের অভিজ্ঞতা আর বর্তমান বাস্তবতার আলোকে।

প্রথা-কৃষ্টি-সৃষ্টিতে বেজায় ফারাক:
আশির দশকের কৃষিজীবন ও আজকের কৃষির মধ্যে প্রথা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির দিক থেকে বেশ বড় ফারাক দেখা যায়। তখন কৃষিকাজ শুধু উৎপাদনের বিষয় ছিল না, এর সঙ্গে গ্রামীণ বিশ্বাস, আচারও গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। ক্ষেতের মাঝে কাকতাড়ুয়া দাঁড় করানো হতো শুধু পাখি তাড়ানোর জন্য নয়, অনেক সময় এটিকে ফসল রক্ষার প্রতীক হিসেবেও দেখা হতো। নতুন ধান উঠলে ক্ষেত বা গোলার সামনে ছোটোখাটো অনুষ্ঠান বা পূজার আয়োজন করা হতো। দরিদ্রদের মধ্যে দান করাও ছিল সাধারণ রীতি। একই সঙ্গে গরু-মহিষকে আদর করে বিশেষ দিন পালন করা হতো। ঐ দিনটাতে হালের গরু-মহিষকে দিয়ে কোনো কাজ করানো হতো না, বরং পোষা পশুগুলোকে গোসল করিয়ে সারা শরীরে তেল-জরি মেখে ভালো ভালো খাবার খাওয়ানো হতো।

এছাড়া যারা চাষের সঙ্গী থাকতেন, তাদের জন্য বিশেষভাবে খাওয়ানোর আয়োজন করা হতো; ভালো খাবার দিয়ে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ছিল কৃষকের এক ধরনের সংস্কৃতি। কিন্তু আধুনিক যন্ত্রনির্ভর কৃষির যুগে এসব প্রথা ও কৃষ্টির অনেকটাই এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে।

শ্রমনির্ভর থেকে যন্ত্র নির্ভরতা:
আশির দশকের কৃষি ছিল মূলত শ্রমনির্ভর। জমি চাষের প্রধান উপকরণ ছিল লাঙল ও বলদ। এক বিঘা জমি চাষ করতে কৃষকের লেগে যেত দীর্ঘ সময়, আর সেই কাজে থাকত পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাঠে কাজ করে কৃষকেরা ক্লান্ত শরীরে ফিরতেন বাড়িতে। যদিও সেই ক্লান্তির মধ্যেও ছিল এক ধরনের প্রশান্তি কারণ কৃষি ছিল তাদের জীবন ও পরিচয়ের অংশ।

আজকের কৃষির দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন মাঠে লাঙলের জায়গা নিয়েছে ট্র্যাক্টর, পাওয়ার টিলার ও কম্বাইন হারভেস্টারের মতো আধুনিক যন্ত্র। জমি চাষ, বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল কাটা সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। এতে সময় কম লাগে, শ্রমও কম প্রয়োজন হয়। কৃষক এখন অনেক কম সময়েই বড় আকারের জমি চাষ করতে পারেন।

সেই সেচব্যবস্থার সঙ্গে এই সেচব্যবস্থার মিল নেই
আগেকার সেচব্যবস্থা এতটা উন্নত ছিল না। অনেক কৃষকই বৃষ্টির উপর নির্ভর করতেন। বর্ষা ঠিক সময়ে না এলে কৃষকের মনে উদ্বেগ দেখা দিত। আকাশের মেঘ দেখেই তারা বুঝতে চাইতেন ভবিষ্যৎ ফসলের ভাগ্য। মাঠে তখন দেখা যেত স্থানীয় জাতের ধান, গম বা ডাল। কৃষকেরা নিজেরাই বীজ সংরক্ষণ করতেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই বীজের ব্যবহার চলত।

তবে এখনকার সেচব্যবস্থাতে এসেছে বড় পরিবর্তন। গভীর নলকূপ, বিদ্যুৎচালিত পাম্প কিংবা সোলার চালিত সেচযন্ত্র কৃষিকে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য করেছে। ফলে কৃষক এখন শুধু বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকেন না; প্রয়োজন অনুযায়ী জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হয়। একই সঙ্গে উন্নত জাতের বীজ ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে ফসলের উৎপাদনও বেড়েছে অনেক।

তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতির ভেতরেও রয়েছে কিছু অমিল ও প্রশ্ন। আশির দশকের কৃষক ছিলেন মাটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জমি ছিল শুধু আয়ের উৎস নয়; এটি ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের অংশ। কৃষকেরা নিজেদের জমিকে নিজের সন্তানের মতো যত্ন করতেন। মাঠে কাজ করার সময় পাশের জমির কৃষকের সঙ্গে গল্প হতো, একে অপরকে সাহায্য করতেন।

ধান কাটার মৌসুমে নেই সেই সহযোগিতা:
ধান কাটার মৌসুমে একে অপরকে সহযোগিতার দৃশ্য ছিল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। এক কৃষকের ধান কাটতে গ্রামের অনেকেই এগিয়ে আসতেন। কেউ কাস্তে নিয়ে মাঠে নামতেন, কেউ ধান বেঁধে গাদা করতেন, আবার কেউবা শ্রমিকদের জন্য পানি বা খাবারের ব্যবস্থা করতেন। কাজ শেষে উঠোনে বসে সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করতেন, চলত হাসি-আড্ডা। কৃষি তখন ছিল শুধু কাজ নয়, ছিল সামাজিক বন্ধনেরও একটি ক্ষেত্র।

বর্তমান সময়ে সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। এখন কৃষিকাজের বড় অংশই যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। শ্রমিক ভাড়া করে কাজ করানো হয়, আর কাজ শেষ হলে সবাই আলাদা হয়ে যায়। প্রযুক্তি কৃষিকে দ্রুত ও কার্যকর করেছে, কিন্তু মানুষের মধ্যে সেই আন্তরিক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে কমিয়ে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও যেন নতুন নিয়মে:
অর্থনৈতিক বাস্তবতাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আশির দশকে কৃষকের আয় সীমিত ছিল ঠিকই, তবে কৃষির খরচও ছিল কম। স্থানীয় বীজ, কম সার এবং হাতে-কলমে কাজের কারণে ব্যয়ের চাপ তুলনামূলক কম ছিল। আজকের কৃষিতে উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক, সেচব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতির কারণে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে কৃষকের উৎপাদন বাড়লেও বিনিয়োগের চাপও বেড়েছে।

বাজারব্যবস্থাও এখন কৃষকের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। ফসলের দাম কখন বাড়বে বা কমবে এই অনিশ্চয়তা কৃষকের মনে উদ্বেগ তৈরি করে। অনেক সময় ভালো ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকের হতাশা বাড়ে। আশির দশকের কৃষিতে বাজারের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম ছিল; কৃষকেরা অনেক সময় নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্যই চাষাবাদ করতেন।

তবে পরিবর্তনের এই দীর্ঘ পথে কৃষক কখনো থেমে থাকেননি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেছেন, নতুন পদ্ধতি শিখেছেন। মাঠে এখন যন্ত্রের শব্দ শোনা যায়, মোবাইল ফোনে কৃষি বিষয়ক তথ্য পাওয়া যায়, কৃষকেরা নতুন ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

তবু কৃষির মূল চিত্রটি একই রয়ে গেছে মাটি, পরিশ্রম এবং আশার গল্প। কৃষকের ঘামে যেমন ধানের শীষ ভরে উঠত, আজকের কৃষকের শ্রমেও তেমনি জন্ম নেয় অন্নের সম্ভার। পরিবর্তনের ঢেউ যতই আসুক, কৃষক জানেন তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু সেই মাটিই।

লাঙলের দিন হয়তো অনেকটাই ইতিহাস হয়ে গেছে, কিন্তু সেই দিনের স্মৃতি এখনও গ্রামবাংলার বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আর যন্ত্রের এই আধুনিক যুগেও কৃষকের চোখে থাকে একই স্বপ্ন ফসলভরা মাঠ, পরিবারের মুখে হাসি এবং আগামী দিনের নিশ্চয়তা। কৃষির এই পরিবর্তনের গল্প তাই শুধু প্রযুক্তির অগ্রগতির নয়; এটি মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও আশারও এক দীর্ঘ কাব্য।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর