1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় : ৪ বিষয়ে শিক্ষক সংকট বেশি, শিখনে ঘাটতি পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে দুর্নীতি : ঢাকা ওয়াসার গচ্চা ১৫৬২ কোটি টাকা যশোরে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের প্রাসাদ থেকে অল্প দূরে আছড়ে পড়ল বিমান, ৯ জন নিহত শিক্ষকদের পে-স্কেল বাস্তবায়নে ৩২৬৭ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি ৪০ হাজার বেতনে চাকরি দেবে রকমারি.কম, থাকছে যেসব সুবিধা পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে শাবনূর

যৌনকর্মী : সভ্যতার ইতিহাস থেকে জীবিকার বাস্তবতা

বিডি নিউজ ডেস্ক |
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৩ বার পঠিত

ওরা আঁধারে জাগে। মোমের আলোয় কক্ষ সাজিয়ে নাচে। অন্ধকারেই গায়। সেই অন্ধকার জীবনটা লুকিয়ে থাকে ভাগ্যের রেখায়। ছন্দে বলা কথাগুলো শুনতে ভালো লাগতে পারে। কিন্তু যাদের জীবনকে কেন্দ্র করে এই কথাগুলো, তাদের কাছে বাস্তবতা এতটা কাব্যিক নয়। প্রতিদিনের জীবনে দারিদ্র্য, সামাজিক অবজ্ঞা, অনিশ্চয়তা, সহিংসতা ও বঞ্চনার সঙ্গে লড়াই করতে হয় তাদের অনেককে। তারা পেশাদার যৌনকর্মী হিসেবে পরিচিত।কেউ তাদের ‘পতিতা’, কেউ ‘দেহব্যবসায়ী’ আবার কেউ ‘রাতের পাখি’ বলে সম্বোধন করেন।

পেশাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত হয়েছে নানা অবমাননাকর শব্দ ও গালিগালাজ। যৌনসঙ্গী হিসেবে প্রয়োজনের সময় তাদের কাছে টানা হলেও, সমাজের বড় একটি অংশ তাদের মানুষ হিসেবে প্রাপ্য মর্যাদা দিতে অনীহা দেখায়। তাদের জীবন-জীবিকা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক অধিকার নিয়ে আলোচনাও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত।অথচ তাদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা জীবনকাহিনি—কারও জীবনে দারিদ্র্য, কারও জীবনে প্রতারণা, কারও জীবনে নির্যাতন আবার কারও জীবনে রয়েছে নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার গল্প। যৌনকর্মীদের জীবনকে বুঝতে হলে শুধু পেশাটির দিকে তাকালে চলে না; দেখতে হয় সেই পেশার পেছনে থাকা মানুষ, সমাজ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও।

যৌনপেশা: প্রথা থেকে জীবিকানৃবিজ্ঞানের বিভিন্ন সূত্রে প্রাচীন রাজকীয় রীতিতেও গণিকাবৃত্তির প্রচলনের কথা জানা যায়। পুরুষের যৌনচাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে যৌনপেশার অস্তিত্ব মানব ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা যায়। আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে দাস সমাজব্যবস্থার উদ্ভবের সময়ও নারীদের যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করা হতো। এক মালিকের কাছ থেকে অন্য মালিকের কাছে তাদের বারবার বিক্রি করা হতো। এভাবে হাতবদল হতে হতে একপর্যায়ে তাদের অনেকেই যৌনকর্মী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।ঐতিহাসিকভাবে যৌনপেশার বিকাশের সঙ্গে এ প্রথারও সম্পর্ক রয়েছে। সেই ঐতিহাসিক ধারার নানা প্রভাব আজও দেখা যায়। বাংলাদেশেও যৌনকর্মের প্রচলন রয়েছে। আর এ পেশায় যুক্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ।

সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে পৃথিবী যখন পুঁজিবাদী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যায়, তখন মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক মূল্যবোধ ও সচেতনতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে।শিক্ষার বিস্তার এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে বিভিন্ন দেশে যৌনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ যৌনাচার নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পেতে থাকে। অন্যদিকে, দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষার সীমিত সুযোগ ও সামাজিক বৈষম্যও অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে জীবিকার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে। এসব পরিস্থিতিতে কেউ কেউ যৌনপেশায় যুক্ত হন। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান অঞ্চলেও ঔপনিবেশিক আমলসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্যায়ে যৌনপেশার নানা ধরন বিস্তার লাভ করে।

বাংলাদেশে যৌনকর্মীদের বর্তমান বাস্তবতা:
বাংলাদেশে যৌনকর্মীদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশ বিষয়ক তথ্যে দেশে প্রায় ২ লাখ নারী যৌনকর্মীর একটি আনুমানিক হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে যৌনকর্মীদের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করা প্রধান বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সেক্স ওয়ার্কার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ, অন্যতম।এছাড়া মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং সেভ দ্য চিলড্রেন যৌনকর্মী ও তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে। এমন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষণাতেও বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ যৌনকর্মী থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।গবেষণাগুলোর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের যৌনকর্মীদের মধ্যে ৬০ শতাংশ ভাসমান এবং বাকিরা যৌনপল্লি ও হোটেলভিত্তিক। এছাড়া, রাজধানী ঢাকাতেই যৌন শোষণের শিকার প্রায় ৫ হাজার শিশু রয়েছে বলে জানা যায়। ২০২০ সালের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১৪টি নিবন্ধিত যৌনপল্লি চালু রয়েছে। তবে এই সংখ্যাকে সর্বশেষ বা নির্ভুল গণনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। যৌনকর্মীদের চলাচল, পরিচয় গোপন রাখার প্রবণতা এবং জরিপের আওতাভুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন। যৌনকর্মের জরিপগুলো গোপনীয়তার কারণে শতভাগ নির্ভুল হওয়া কঠিন, তাই বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে তারতম্য রয়েছে।

শ্রেণিভেদে যৌনকর্মীদের আয় ও কর্মপরিবেশ:
বাংলাদেশে যৌনকর্মীদের কর্মপরিবেশও এক রকম নয়। কেউ নির্দিষ্ট যৌনপল্লীতে থাকেন, কেউ রাস্তায় বা জনসমাগমস্থলে গ্রাহক খোঁজেন, কেউ আবাসিক হোটেল বা ব্যক্তিগত বাসায় কাজ করেন। আবার কেউ পরিচিত গ্রাহকের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগের ভিত্তিতে যৌনসেবা দেন। কর্মস্থল, গ্রাহকের ধরন, কাজের সময়, মধ্যস্থতাকারীর উপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত দর-কষাকষির সুযোগের ওপর যৌনকর্মীদের আয় নির্ভর করে। মাঠজরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের যৌনকর্মীদের মোটামুটি চার ভাগে ভাগ করা যায়। মাঠপর্যায়ের আলোচনায় যৌনকর্মীদের পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে ব্যাপক পার্থক্যের কথা উঠে আসে।

পল্লীকেন্দ্রিক যৌনকর্মী :
নির্দিষ্ট যৌনপল্লীতে বসবাস বা কাজ করা কর্মীরা সাধারণত পরিচিত পরিবেশে গ্রাহক গ্রহণ করেন। যৌনপল্লীতে কর্মরত কর্মীরা প্রতি সাক্ষাতে ২০০–৩০০ টাকা পারিশ্রমিক পান। তবে তাদের আয়ের মধ্যেই বাসাভাড়া, খাবার, ঋণ, মধ্যস্থতাকারীর কমিশন কিংবা অন্যান্য খরচ থাকে। তাই গ্রাহকের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের পুরোটাই তাদের হাতে থাকে না।দরজার সামনে তারা রং মেখে দাঁড়ায়। মুখে মেকআপের সেই প্রলেপ অন্ধকার বন্ধ ঘরে গেলেই লেপটে যায়, সাময়িক ভালোবাসায়। ফের মেকআপ-সাজগোজ, ফের নতুন কারও জন্য অপেক্ষা। নতুন সঙ্গীর সঙ্গে দেহ দেওয়া-নেওয়া। সেই চুক্তিতে অনেক বাসনা, কেউ নিংড়ে নেয়, কেউবা নেয় নির্যাতন করে। শত কষ্ট হলেও ভালোবাসা বিলানোর দায়িত্ব নারীর। একবার চুক্তি হলে ভালোবাসা কড়ায়গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতেই হবে। অবশ্য এই রঙিন ভালোবাসার লোভেই পুরুষরাও আসে বারবার। এক নারীর ঘরের বাধা কাস্টমার হয় কেউ কেউ।যৌনপল্লীতে কর্মরত কোনো কোনো নারী নিয়মিত গ্রাহকের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হয়, কেউ ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাদের অনেকেই গ্রাহকের প্রেমে পড়ে যান। সেই প্রেম দাম্পত্য না হলেও বন্ধুত্ব দেয়। অর্থের বিনিময়ে গড়ে ওঠা সম্পর্কের মধ্যে ব্যক্তিগত অনুভূতি শেষ অবধি বিয়েতে রূপ নেয় খুবই কম। তবুও গ্রাহক ধরে রাখতে তাদের হাসিমুখ- ভালো ব্যবহার- যৌনতার উষ্ণতা বিলানোয় কোনো কার্পণ্য থাকে না।

হোটেল, ফ্ল্যাট ও ব্যক্তিগত যোগাযোগভিত্তিক যৌনকর্মী: হোটেল, ফ্ল্যাট বা অন-কল ব্যবস্থায় যৌনকর্মীদের রেট পাঁচশ থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্তও হয়। এই শ্রেণির কর্মীদের আয় গ্রাহক, স্থান, সময় ও পারিশ্রমিকের চুক্তি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। কেউ পরিচিত মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে, কেউ ব্যক্তিগত যোগাযোগের ভিত্তিতে কাজ করেন। তাদের কারও কারও গ্রাহক বাছাই ও পারিশ্রমিক নির্ধারণে তুলনামূলক স্বাধীনতা থাকলেও নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং প্রতারণার ঝুঁকিও থাকে।যৌনকর্মীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সংগৃহীত তথ্য বলছে, শহরকেন্দ্রিক হোটেল-ফ্ল্যাটে কিংবা অন কলে এখন যৌনকর্মীর হাট। এরা পাড়ার মতো মুক্ত নয়- নিশ্চিন্ত নয়, আবার রাস্তার যৌনকর্মীটির মতো সস্তাও নয়। এই শ্রেণির যৌনকর্মী নিজেরাই কাজের সময়, গ্রাহক ও পারিশ্রমিক নির্ধারণ করতে পারেন। তবে তাদের কাজ দেশের প্রথা-সমাজ-আইনকে ফাঁকি দিয়ে। তাই এদের সঙ্গ পেতে রাস্তা আর পাড়ার থেকেও খরচ একটু বেশি।পারিশ্রমিকের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর কমিশন, যাতায়াত বা অন্যান্য খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে। হোটেল, ফ্ল্যাট কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে কাজ করা যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার উদ্বেগ রয়েছে। তাদের সবাই সমানভাবে স্বাধীন নন। ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা তাদের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ভাসমান যৌনকর্মী : রাস্তা, রেলস্টেশন কিংবা অন্যান্য জনসমাগমস্থলে গ্রাহক খোঁজা যৌনকর্মীদের কর্মপরিবেশ বিপজ্জনক। পরিচিত গ্রাহক না থাকা, দর-কষাকষির সীমিত সুযোগ এবং অনিরাপদ পরিবেশের সঙ্গে তাদের মানিয়ে নিতে হয়। ভাসমান যৌনকর্মীরা মিলনপ্রতি ৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত নেন। তাদের আয় ওঠানামা করে। হয়রানি, সহিংসতা, গ্রাহকের সঙ্গে বিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে জটিলতার আশঙ্কাও তাদের মধ্যে বেশি থাকে।ঢাকার কমলাপুর এলাকায় ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করেন হালিমা আক্তার (ছদ্মনাম)। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ভাসমান যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নতুন গ্রাহক হয়। সাধারণত একজন পুরুষ এই কাজে বারবার লিপ্ত হলেও, একই নারীর সঙ্গ দ্বিতীয়বার মিলিত হওয়ার উদাহরণ খুব কম। এক্ষেত্রে নারী যৌনকর্মীরা একজন গ্রাহককে ফের পাওয়ার জন্য ভালো ব্যবহার করে, তৃপ্তি দেওয়ার চেষ্টাও করে। তবে, ভাসমান কোনো যৌনকর্মীকে পুরুষরা দ্বিতীয়বার ব্যবহার করতে চায় না। পুরুষরাই বারবার নতুন মুখের, নতুন কোনো ভালোবাসায় নতুন অভিজ্ঞতা নিতে চায়।

খণ্ডকালীন বা ব্যক্তিগত যোগাযোগভিত্তিক যৌনকর্মী:
কেউ কেউ নিয়মিত অন্য পেশা, ব্যবসা বা ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি যৌনসেবা দেন। তাদের গ্রাহকসংখ্যা তুলনামূলক সীমিত এবং পারিশ্রমিকও ভিন্ন। খণ্ডকালীন যৌনকর্মীরা সাধারণত বেছে বেছে গ্রাহক গ্রহণ করেন। মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, তাদের পারিশ্রমিক প্রতি সাক্ষাতে বা প্রতি রাতের জন্য ১০ হাজার টাকার বেশি হয়ে থাকে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যৌনকর্মী নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানান, খণ্ডকালীন যৌনকর্মীরা সাধারণত বেশ পরিপাটি আর চলনসই বেশভূষার হয়ে থাকে। বিভিন্ন পাঁচতারকা হোটেল, রিসোর্টে, আবাসিক বাসা-বাড়িতে এরা মোটা অঙ্কের বিনিময়ে যৌনতায় জড়ায়। বিদেশি আগত অতিথি, পর্যটক এদের টার্গেটে থাকে।এছাড়াও তারা আগতদের সঙ্গে ঢাকার বাইরের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও সাক্ষাৎ করে রাত কাটায়। এদের মূলত হাতেগোনা গ্রাহক থাকে। ফলে অল্প পরিশ্রমে আয় করে বেশি।

যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার একাধিক মাঠকর্মীর মতে, বাংলাদেশে যৌনকর্মীদের মধ্যে ধনিক শ্রেণির সঙ্গ দেওয়ার সুযোগ পায় অন্তত ১৫-২০ শতাংশ।সেচ্ছাসেবী সংগঠন সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট ওয়ারকার ফোরম এর ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়ক ইব্রাহীম ওয়াহিদ মনে করেন, যৌনকর্মীদের জীবন নিয়ে বাইরে থেকে অনেক ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মানসিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং সম্পর্কের জটিলতা সম্পর্কে সমাজের জানাশোনা সীমিত।

যৌনকর্মীদের জীবনে শুধু অর্থনৈতিক লেনদেনই মুখ্য নয়। তাদেরও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আবেগ, পরিবার, সন্তান, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা রয়েছে। পেশাগত পরিচয় দিয়ে তাদের সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে বিচার করা যায় না।

হিসাবের বাইরে যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা: যৌনকর্মীদের দৈনিক বা বার্ষিক গ্রাহকসংখ্যা নির্ধারণের কোনো সর্বজনীন সূত্র নেই। কর্মস্থল, গ্রাহকের চাহিদা, ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, স্বাস্থ্য, কাজের ধরন এবং বিশ্রামের সুযোগের ওপর তা নির্ভর করে। ফলে একজন যৌনকর্মী প্রতিদিন গড়ে কতজন গ্রাহক গ্রহণ করেন কিংবা বছরে কতবার যৌনমিলনে অংশ নেন—এমন নির্ভরযোগ্য কোনো জরিপ নেই।তবে, সরেজমিন সাক্ষাৎকারের তথ্য বলছে, মাস-বছরের হিসেবে হাজারো পুরুষের সঙ্গে একজন যৌনকর্মী মিলিত হন। একজন যৌনকর্মী প্রতিদিন গড়ে ১০ জন, সপ্তাহে ৭০ জন, পুরুষের সঙ্গে যৌনতায় জড়ান। কমিয়ে যদি এর অর্ধেকও ধরা হয়, তাতেও সপ্তাহে ৩৫ জন বা বছরে ১ হাজার ৮২০ বার এরা যৌনমিলন করেন। ঋতুচক্রের দিনগুলো বাদ দিয়ে হিসাব করলেও বছরে এরা কম হলেও ১৫০০ বার মিলনে লিপ্ত হন।স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা (গাইনি ও অবস) বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) সাবেক বিভাগীয় প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডা. সেলিনা বানু (অব.) জানান, একজন সক্ষম বিবাহিতা নারীর সপ্তাহে ২–৩ বার, পুরো মাসে মোট ১২ দিনের বেশি মিলন করা উচিত নয়। এতে নারীর দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কর্মক্ষমতা লোপ পেতে পারে। যদিও চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌনমিলনের কোনো সর্বজনীন সাপ্তাহিক বা মাসিক সীমা উল্লেখ নেই। যা অতিক্রম করলেই নারীর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বা কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়। যৌনমিলনের ঘনত্ব ব্যক্তির ইচ্ছা, শারীরিক অবস্থা, স্বাচ্ছন্দ্য ও পারস্পরিক সম্মতির ওপর নির্ভর করে।সমাজ, আইন ও আড়ালে থাকা পেশা আধুনিক বিশ্বে যৌনতাভিত্তিক জীবিকা হয়ে ওঠে ‘ওপেন সিক্রেট’।

বৈশ্বিক ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও পৌঁছে যায় অগণিত যৌনতাভিত্তিক পেশাজীবী। তবে এ দেশের প্রচলিত সমাজকাঠামো, আইন, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক চাপ, ধর্মীয় রীতিনীতির কারণে এ কাজ বরাবরই চলেছে অনেকটা আড়ালে-আবডালে।আধুনিক নগরজীবনে যৌনকর্মের ধরন বদলেছে। প্রযুক্তি, ব্যক্তিগত যোগাযোগ, যাতায়াতব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে যৌনসেবা প্রদানের নানা পদ্ধতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন দেখা যায়। আর এমন ব্যবসা চালাতে বারবার কৌশল বদলাতে হয়েছে আধুনিক যৌনকর্মীদের। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় নানা নামের ভাইদের ভিজিটিং কার্ডগুলো সেই কৌশলেরই অংশ।তবে যৌনকর্মকে ঘিরে আইনি অবস্থান সরল নয়। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির স্বেচ্ছায় যৌনকর্মে যুক্ত থাকা, পতিতালয় পরিচালনা, জনসমক্ষে গ্রাহক আহ্বান, নারী বা শিশুকে যৌনকাজে বাধ্য করা এবং মানব পাচার—এসব পৃথক আইনি বিষয়।

অন্যদিকে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌনশোষণ, জবরদস্তি, প্রতারণা, মানব পাচার কিংবা কাউকে যৌনকাজে বাধ্য করার মতো কর্মকাণ্ড গুরুতর অপরাধের বিষয়।বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক যৌনকর্মীদের হলফনামা দেওয়ার একটি চর্চার কথা বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদন ও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌনপল্লিতে বসবাস বা কাজ করার ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে স্বেচ্ছায় এই পেশায় যুক্ত থাকার ঘোষণা দিতে হতো। তবে এই হলফনামাকে সর্বজনীন যৌনকর্মের লাইসেন্স হিসেবে বিবেচিত নয়। একইভাবে, বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন, ২০১৪-এ হোটেলের নিবন্ধন, লাইসেন্স ও পরিচালনার বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আইনে অবিবাহিত নারী-পুরুষের দৈহিক সম্পর্কের ব্যবস্থা করাকে সরাসরি অপরাধ বলা হয়েছে।

মুক্তির পথ: মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বিকল্প জীবিকা – যৌনকর্মীদের অধিকার রক্ষা, শোষণ ও মানব পাচার প্রতিরোধ এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যু। এ ক্ষেত্রে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ এবং সহিংসতা ও শোষণের শিকার ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর সহায়তা। যৌনকর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগ উঠলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সুনাগরিক ফাউন্ডেশন এর চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম মনে করেন, যৌনকর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে শুধু পেশা ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান যথেষ্ট নয়। যারা এই পেশা থেকে বেরিয়ে আসতে চান, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা, নিরাপদ আবাসন এবং সামাজিক পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক যারা স্বেচ্ছায় এই পেশায় যুক্ত রয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনি সুরক্ষাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, পেশা থেকে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য যেমন বাস্তবসম্মত বিকল্প দরকার, তেমনি পেশায় থাকা ব্যক্তিদেরও অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি।তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্যের দিক থেকেও যৌনকর্মীদের প্রতি বৈষম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। কনডম ব্যবহারে বাধা, গ্রাহকের চাপ, সহিংসতা এবং স্বাস্থ্যসেবা পেতে বৈষম্যের শিকার হওয়া যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই তাদের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা, নিরাপদ যৌনাচার সম্পর্কে সচেতনতা এবং গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মধ্যে সংবেদনশীলতা বাড়ানো জরুরি, যাতে পেশাগত পরিচয়ের কারণে কেউ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন।

বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল বলেন, যৌনকর্মীদের সন্তানদের শিক্ষা, পুষ্টি, নিরাপত্তা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। মায়ের পেশাগত পরিচয়ের কারণে কোনো শিশুকে বৈষম্য, অবহেলা বা সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে দেওয়া উচিত নয়। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা তাদের অধিকার রক্ষারই অংশ।এক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে যৌনকর্মীদের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, মানব পাচার ও জবরদস্তির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ, সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা, বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সমাজের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। পাশাপাশি, যেকোনো উদ্যোগ গ্রহণের আগে যৌনকর্মীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।যৌনকর্মীদের জীবনকে কেবল অন্ধকার, পাপ কিংবা সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে দেখলে তাদের বাস্তবতা যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

আবার শোষণ, জবরদস্তি ও সহিংসতার ঘটনাগুলো উপেক্ষা করে যৌনকর্মকে নিছক ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না। ব্যক্তির সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক বৈষম্য এবং নিরাপত্তার বাস্তবতা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই এ বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।জনস্বাস্থ্যের সমস্যার দায় শুধু যৌনকর্মীদের ওপর চাপিয়েও সমাধান সম্ভব নয়। গ্রাহকদের দায়িত্বশীল আচরণ, কনডমের সহজলভ্যতা, স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ এবং সহিংসতা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পাবে, জবরদস্তি ও শোষণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যাঁরা বিকল্প জীবিকা বেছে নিতে চান, তাঁদের সামনে বাস্তবসম্মত সুযোগ তৈরি করা হবে।যৌনকর্মীদের জীবন নিয়ে আলোচনা তাই শুধু একটি পেশাকে ঘিরে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য, নারী-পুরুষের ক্ষমতার সম্পর্ক, জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে মানবিক, তথ্যনির্ভর ও অধিকারভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণই পারে যৌনকর্মীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে।

তথ্যসূত্র: ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ, এইচআইভি/এআইডিএস—যৌনকর্মীদের আনুমানিক সংখ্যা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিসংক্রান্ত তথ্য।ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ এবং যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা—স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার, সামাজিক কলঙ্ক ও যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর