যে বিশ্বাস করে সে-ই বেঁচে থাকে। এই বিশ্বাস এবং কাজের মধ্যে যে ডুবে যেতে পেরেছে তাকে কোন দুঃখ, মালিন্য স্পর্শ করতে পারে না। কাজের নিজস্ব আনন্দ রয়েছে। কাজের মধ্যে ডুবে যেতে হলে স্বপ্নের প্রয়োজন হয়।
আমরা অনেকেই মনে করি স্বপ্ন মানেই একটি নিছক কল্পনামাত্র। কিন্তু আসলে তা নয়; স্বপ্ন মানেই বাস্তব, স্বপ্ন মানেই গন্তব্য। আমি কোথায় যেতে চাই তার নাম স্বপ্ন।
বাস্তব স্বপ্ন ও চেষ্টা কখনোই ব্যর্থ হয় না। যদি স্বপ্নকে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে পারা যায় তাহলে তা অর্জনও করা যায়। বিশাল এই পৃথিবীতে দূর মহাকাশের নক্ষত্র থেকে আলো এসে পড়ে। আমরা সবাই এই পৃথিবীর প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছি মাত্র কিছু সময়ের জন্য যে সময়টা খুব বেশীও নয় আবার খুব কমও নয়। এই সময়কে নিজের ইচ্ছে মতো সাজিয়ে নিতে দরকার সুপরিকল্পিত স্বপ্নের।
একজন জেসমিন খান চাঁদনী। পরিবারে তার বাবা একজন কন্ঠশিল্পী, তিনি বিখ্যাত কাওয়ালী সমীর কাওয়ালের সাথে গান করতেন। বাবা,চাচা, পরদাদা কণ্ঠশিল্পী হওয়ায় জেসমিন খান চাঁদনীও গান গাইতে পছন্দ করেন এবং তিনি ভালো গানও গান। কারো সহযোগিতা না পাওয়াই তার বাবা মোহাম্মদ আলী বড় শিল্পী হয়ে উঠেনি, হোটেল ব্যবসার পাশাপাশি গান করে সংসার চালাতেন। তার কোন ভাই নাই, তিন বোন। সৈয়দপুরে জন্ম হলেও ছোট বেলা,শৈশব কাটে ঢাকার রামপুরায়। শৈশব কৈশর এবং বড় হওয়া এখানেই। বর্তমানেও ঢাকায় বসবাস করছেন। তিনি বর্তমানে প্রতিষ্ঠাতা ,আজরিফ ফ্যাশন গ্যালারী (মিনি গার্মেন্টস) , পরিচালক আজরিফ ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড, সিইও, ই-কমার্স মার্কেটপ্লেস ইবিডিবাজার.কম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইবিডিবাজার ট্রেড লিমিটেড, সিইও ফ্লাই কুরিয়ার সার্ভিস লিমিটেড এবং ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাতীয় সাপ্তাহিক এক দুই তিন পত্রিকা।
তার যখন বয়স ১২ বছর তখন থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি তার আপন মামা খোকন সিকদারের কাছে সেলাই কাজ শিখেন। একটা সময় জীবনের তাগিদে অল্প বয়সেই চাকরি শুরু করেন। তখন থেকেই কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে বড় হতে থাকেন জেসমিন। আজকে তার এই অবস্থায় আসার জন্য আত্মীয় স্বজন কারো সহযোগিতা পাননি তিনি।
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তার বাবা যখন এক্সিডেন্ট করে মারা যান তখন থেকেই একা হয়ে যান। ঢাকার বাসা ছেড়ে তার মা তার ছোট বোনকে নিয়ে কুমিল্লায় নানার বাড়ি চলে যান। এবং তার বড় বোন শশুর বাড়ী, আর তিনি ঢাকায় একা চাকরির জন্য রয়ে যায়। ব্যাচেলর জীবন এবং কষ্টকে সঙ্গী করে চলতে থাকে জীবন যুদ্ধ।
২০১৬ সালে মসিহা হয়ে আসে তার হাসবেন্ড এয়াকুব বাদশা। এবং ২০১৭ সালের মে মাসে তারা দুইজন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন। শুরু হয় চাকরি ছেড়ে সংসার জীবন। বর্তমান তাদের ঘরে ৭ বছরের আজরিফ ইনতিশার নামের একজন ছেলে সন্তান রয়েছে।
মহামারি করোনায় যখন তার স্বামীর ব্যবসার মূলধন ১৫ লক্ষ টাকারও বেশি পূঁজি ধ্বংস হয়ে তাদের ব্যবসা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। তার হাসবেন্ড এর সাংবাদিকতায় পাওয়া ১২০০০ টাকার সম্মানি দিয়ে সংসার চলা দায় হয়ে পড়ে, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেন ঢাকা ছেড়ে চলে যাবেন। কিন্তু ঢাকা ছেড়ে কি করবেন কিভাবে এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠবেন সেই ভাবনাও প্রতিমুহূর্তে অন্তরে চলতে থাকে তাদের।
তখন বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে পরামর্শ নিলে নার্গিস নামের এক আপুর সাথে কথা হয়, এবং তিনি তাদের ঢাকা ছাড়তে বারণ করেন। তখন তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন এবং ঢাকা ছাড়বেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন। শুরু হলো মনোবল এবং সাহস নিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনের যুদ্ধ।
তার হাসবেন্ড এর সহযোগিতা নিয়ে ব্যতিক্রম কিছু ভাবতে শুরু করলেন। যেহেতু তিনি সমাজ সেবার সাথে জড়িত তাই তার ব্যবসাটাও সামাজিক ভাবে নারী কল্যাণে কাজে আসে সেই ভাবে আগানোর পরিকল্পনা করতে থাকেন।
উদ্যোক্তা হবো চাকরি দিবো! এই স্বপ্ন দেখিয়েছে তার হাসবেন্ড। সে একজন লেখক এবং সাংবাদিক এবং ব্যবসায়ীও বটে। ব্যবসার স্পৃহাটাই পান তিনি মূলতঃ তার স্বামীর কাছ থেকেই। সেও ছোট বেলা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে চলেছেন। স্বামীর লেখালেখি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম দেখে নিজের মিনি গার্মেন্টস এবং ই-কমার্স মার্কেটপ্লেস করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য চিন্তা মাথায় জেঁকে বসে।
ভিন্ন ধারার কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি এবং তার হাসবেন্ড সুন্দর একটি আইডিয়া বের করলেন। তিনি বলেন- আমার হাসবেন্ড এর অবদান অনস্বীকার্য।
নিজে কিছু করার পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে করোনার সময় আত্মবিশ্বাসী ১০০ শত নারী উদ্যোক্তাকে তার নিজ খরচে ফ্রি টেইলারিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার কথা সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন। তার পোষ্টটি পেয়ে মিনিমাম ঢাকাসহ ঢাকার বাহিরে মিলে ৪ হাজার নারী তাকে মেসেজ করতে থাকেন এবং সেলাই কাজ শিখার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তিনি যেহেতু ঢাকায় থাকেন তাই ঢাকাতেই তার “আজরিফ ফ্রি টেইলারিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি” চালু করেন। পরবর্তী নিজের টাকায় জামালপুরের হৃদয় খানের রিকুয়েষ্টে ১ মাসের জন্য নারী প্রশিক্ষক পাঠিয়ে সেখানকার ৩০ জন নারীকে এবং ঢাকায় নিজে ৭০ জনসহ মোট ১০০ নারীকে সেলাই কাজ শেখান। নারীদের কাজ শেখার আগ্রহ দেখে পরিকল্পনার কথা বলেন– “আমার এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখবো ইনশাল্লাহ যদি কারো সহযোগিতা পাই” এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য আমার হাসবেন্ড প্রতিষ্ঠা করেন-রাহবার স্মার্ট লার্নিং এন্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
তিনি বলেন,আমি মিনি গার্মেন্টস করবো বলেছি কিন্তু ফ্রি সেলাই কাজ শিখাতে গেলাম কেন এই প্রশ্ন হাজার জন করেছেন; হয়তো আপনাদেরও একই প্রশ্ন।
তাদের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম দেখে ব্র্যাক ব্যাংক মগবাজার শাখা পাশে দাঁড়ানোর জন্য অঙ্গিকার করে ছিলেন এবং তারা নিজ উদ্যোগে তাদের কার্যক্রম পরিদর্শন করে যায়।
তাছাড়া ব্র্যাক বলেছে; তাদের টিমে যেসব নারী উদ্যোক্তারা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্ন বুনছেন তাদের পাশেও দাঁড়াবে। এখনো সহযোগিতা না পেলেও উৎসাহ পেয়েছেন তিনি জানান।
তিনি মনে করেন তিনি এখনও সফল হননি। তবে তিনি তার স্বপ্ন বিনির্মাণ করবার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং সেটা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। কারণ তিনি মনে করেন একজন স্বপ্নবাজ নারী, স্বপ্ন দেখেন উদ্যোক্তা হবার।
তিন বলেন,আমি বিশ্বাসশ করি, ‘স্বপ্ন মানেই বাস্তব, স্বপ্ন মানেই গন্তব্য’। আমি দৃঢ় নিশ্চিত-আমি পারবো।
“বিশ্বাস পাহাড়কেও টলাতে পারে। বিশ্বাস একটি অদ্ভূত শক্তি, এটা কোন ম্যাজিক বা অলৌকিক বিষয় নয়।”
তিনি এক পর্যায়ে বলেন, আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলি আপনাদের, “যে স্বপ্নের জন্য আপনি মরতেও রাজি এমন স্বপ্ন দেখুন। স্বপ্ন না থাকলে আপনি কখনও উন্নতি করতে পারবেন না, কারণ স্বপ্নই জীবনের জ্বালানী। নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখুন এবং তা পূরণের প্রতিজ্ঞা করুন। সমস্ত ঝুঁকি গ্রহণ করুন সাহসের সাথে।”
মনে রাখবেন, “মানুষ আমাকে মারতে পারবে, অত্যাচার চালাতে পারবে। কিন্তু আমার আত্মা আর এগিয়ে যাবার চেতনা কেউ শেষ করে দিতে পারবে না।”
পরিশেষে আরেকটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, “স্বপ্ন যদি ভুল করেও একবার দেখে ফেলেন, তবে তা পূরণ করেই ছাড়বেন। প্রয়োজনে স্ট্র্যাটেজি পাল্টাবেন, চিন্তা পাল্টাবেন, পথ পাল্টাবেন ; যা যা পাল্টানোর সবই পাল্টাবেন কিন্তু ভুলেও স্বপ্নটা পাল্টাবেন না, টার্গেট পাল্টাবেন না।”