হাতে থাকা স্মার্টওয়াচ এখন শুধু সময় দেখা, হাঁটার হিসাব কিংবা ঘুম পর্যবেক্ষণের যন্ত্র নয়। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অনেক স্মার্টওয়াচ হৃদস্পন্দন মাপা, অনিয়মিত হার্ট রিদম শনাক্ত করা এবং কিছু ক্ষেত্রে ইসিজি রেকর্ড করার সুবিধাও দিচ্ছে। ফলে শরীরের কোনো অস্বাভাবিকতার ইঙ্গিত কি হাতের ঘড়িই আগে থেকে দিতে পারে এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে।
অনেক স্মার্টওয়াচ নিয়মিত ব্যবহারকারীর পালস বা হৃদস্পন্দনের গতি পর্যবেক্ষণ করে। বিশেষ কিছু মডেলে আবার সিঙ্গল-লিড ইসিজি করার সুবিধা থাকে। এর মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের একটি সংক্ষিপ্ত রেকর্ড পাওয়া যায়। তবে এই তথ্যকে চিকিৎসকের করা পরীক্ষা বা রোগ নির্ণয়ের বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
কীভাবে কাজ করে স্মার্টওয়াচের হার্ট মনিটরিং?
হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণে অধিকাংশ স্মার্টওয়াচে ব্যবহার করা হয় ফটোপ্লেথিসমোগ্রাফিবা পিপিজি প্রযুক্তি। ঘড়ির সেন্সর থেকে আলো ত্বকের দিকে পাঠানো হয়। রক্তপ্রবাহের সঙ্গে সেই আলোর প্রতিফলনে যে পরিবর্তন হয়, তা বিশ্লেষণ করে ডিভাইসটি হৃদস্পন্দনের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। এই তথ্যের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হৃদস্পন্দনের ছন্দে অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না, তার একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে। কিছু ডিভাইস দীর্ঘ সময় ধরে এই তথ্য সংগ্রহ করতে পারে বলে দৈনন্দিন জীবনে মাঝেমধ্যে হওয়া অস্বাভাবিক হার্ট রিদমও নজরে আসার সুযোগ তৈরি হয়।
অনিয়মিত হৃদস্পন্দন কি ধরতে পারে?
কিছু ক্ষেত্রে পারে। বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন বা এএফ-এর মতো অনিয়মিত হার্ট রিদমের সম্ভাব্য ইঙ্গিত স্মার্টওয়াচ শনাক্ত করতে পারে। ঘড়ি যদি স্বাভাবিক ছন্দের বাইরে কোনও প্যাটার্ন লক্ষ্য করে, তখন ব্যবহারকারীকে সতর্কবার্তা দিতে পারে। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্মার্টওয়াচের অ্যালার্ট মানেই রোগ নিশ্চিত হওয়া নয়। এটি মূলত সম্ভাব্য অস্বাভাবিকতার একটি সংকেত। নিশ্চিতভাবে সমস্যা রয়েছে কি না, তা জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা দরকার।
ইসিজি সুবিধা কতটা কাজে আসে?
কিছু স্মার্টওয়াচে ডিভাইসের নির্দিষ্ট অংশে আঙুল স্পর্শ করিয়ে ইসিজি রেকর্ড করা যায়। এতে হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের একটি সীমিত রেকর্ড তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই তথ্য চিকিৎসককে রোগীর হার্ট রিদম সম্পর্কে অতিরিক্ত ধারণা দিতে পারে। বিশেষ করে এমন অস্বাভাবিকতা যদি মাঝে মধ্যে দেখা দেয় এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় তা আর না থাকে, তখন স্মার্টওয়াচে সংরক্ষিত তথ্য চিকিৎসকের কাছে উপকারী হতে পারে।
কিন্তু ভুল অ্যালার্টও আসতে পারে:
স্মার্টওয়াচের সেন্সর অত্যাধুনিক হলেও এটি চিকিৎসা পরীক্ষার সমতুল্য নয়। শরীর বেশি নড়াচড়া করলে, ঘড়ির স্ট্র্যাপ ঠিকমতো কব্জিতে না বসলে কিংবা রক্তপ্রবাহে সাময়িক পরিবর্তন হলে সেন্সরের তথ্য প্রভাবিত হতে পারে। ফলে কখনো কখনো অস্বাভাবিক রিডিং বা সতর্কবার্তা দেখা দিতে পারে, যদিও প্রকৃতপক্ষে গুরুতর কোনো সমস্যা নাও থাকতে পারে।
তাই ঘড়িতে একটি অস্বাভাবিক রিডিং দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনই সেটিকে একেবারে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। বারবার এমন সতর্কবার্তা এলে বা একই সঙ্গে বুক ধড়ফড়, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতার মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
রাতের অ্যালার্ট চিকিৎসকের কাজে লাগতে পারে:
ধরা যাক, গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে স্মার্টওয়াচ কোনো ব্যক্তির হার্ট রিদমে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করল। সকালে উঠে তিনি স্বাভাবিক অনুভব করছেন। হাসপাতালে যাওয়ার পর সাধারণ ইসিজি-তেও যদি কোনো সমস্যা ধরা না পড়ে, তখন রাতের সেই স্মার্টওয়াচ রেকর্ডটি চিকিৎসকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হতে পারে। কারণ কিছু হার্ট রিদমের সমস্যা সব সময় থাকে না; নির্দিষ্ট সময় পর আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। সেই সময়ের রেকর্ড চিকিৎসককে পরবর্তী পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।
স্মার্টওয়াচকে শরীরের প্রাথমিক সতর্ক সংকেত পাওয়ার একটি প্রযুক্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে। নিয়মিত হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ এবং অস্বাভাবিকতার সম্ভাব্য ইঙ্গিত পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি উপকারী হতে পারে। কিন্তু স্মার্টওয়াচের তথ্যকে চূড়ান্ত রোগ নির্ণয় হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
সহজভাবে বললে, ঘড়ি যদি অস্বাভাবিক কিছু দেখায়, সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো। আর কোনও শারীরিক উপসর্গ থাকলে শুধু স্মার্টওয়াচে স্বাভাবিক রিডিং আসছে বলে চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত নয়।