1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০৬ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় : ৪ বিষয়ে শিক্ষক সংকট বেশি, শিখনে ঘাটতি পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে দুর্নীতি : ঢাকা ওয়াসার গচ্চা ১৫৬২ কোটি টাকা যশোরে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের প্রাসাদ থেকে অল্প দূরে আছড়ে পড়ল বিমান, ৯ জন নিহত শিক্ষকদের পে-স্কেল বাস্তবায়নে ৩২৬৭ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি ৪০ হাজার বেতনে চাকরি দেবে রকমারি.কম, থাকছে যেসব সুবিধা পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে শাবনূর

পাহাড় ও সমুদ্র সম্পদের সদ্ব্যবহার জরুরি

ভ্রমণ ডেস্ক | সানজিদা নুসরাত পিংকী |
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬
  • ৭০ বার পঠিত

পাহাড় পৃথিবীর অন্যতম রক্ষাকবচ। অন্যভাবে বলতে গেলে পাহাড়কে বলা হয় পৃথিবীর পেরেক। পেরেক মেরে যেমন কিছু আটকে রাখা যায়, তেমনি পাহাড়ও পৃথিবীর উপরিস্থলের প্লেটগুলোকে আঁকড়ে ধরে রাখে। মাটির ওপরে পাহাড়ের দৃশ্যমান অংশ ছাড়া মাটির নিচে রয়েছে বিস্তৃত আরেক অংশ, অনেকটা ফ্রাস্টাম অব কোনোর মতো। এই অংশ পাহাড়ের স্থায়িত্ব ও ভূপৃষ্ঠের ভারসাম্য বজায় রাখতে বিরাট ভূমিকা রাখে। এমনকি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় রেখে চলে বিশেষ ভূমিকা। অথচ আজ চারদিকে পরিবেশ বিধ্বংসী নানান কর্মকাণ্ডের মধ্যে পাহাড় কাটা বিশেষ আলোচনায় আসছে।

পাহাড়কে কেটে ফেললে বা পাহাড় উপরিস্থিত বৃক্ষের বিনাশ পাহাড়ের রক্ষাকবচের ভূমিকাকে অকেজো করে দেয়। একসময় পাহাড় নিজেই দুর্বল হয়ে ধসে পড়ে। নদ-নদী, গাছপালার মতোই পাহাড় পরিবেশ-প্রতিবেশের এক বিশেষ অনুষঙ্গ, যার বিনাশ পৃথিবীকে নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ঠেলে দেয়। বর্ষা মৌসুম এলেই দেশে পাহাড় কাটার ধুম পড়ে যায়। চট্টগ্রাম, সিলেট ও মৌলভীবাজারে পাহাড় কাটার মহোৎসবের খবর প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। তাতে যেমন এলাকার নান্দনিকতা নষ্ট হচ্ছে; তেমনি প্রকৃতির ভারসাম্য পড়েছে হুমকির মুখে। এমনকি পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু চরম বেদনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সিলেট ও মৌলভীবাজারে অঞ্চলে পাহাড় কাটার ধুম লেগেছে যেন। এ অঞ্চলে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, রাজধানী ঢাকার বড় বড় শিল্পপতিরা পাহাড় দখল করে বাগান বিলাস কেউবা আবার রিসোর্ট, হোটেল, মোটেলসহ বসতি গড়ছেন। শুধু তাই নয়, তারা বিক্রি করছেন সরকারি পাহাড়ের দখলস্বত্ব। এভাবে চট্টগ্রাম, সিলেট ও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বেশক’টি সরকারি পাহাড় এখন দখলদারদের দখলে।

পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে মধ্যে কাউকে কাউকে জরিমানা করলেও বন্ধ হচ্ছে না পাহাড় কাটা। জরিমানা দিয়ে অনেকে পুনরায় পাহাড় কাটছেন এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে অনেক। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, জরিমানা দেওয়া মানে পাহাড় কাটার বৈধতা পাওয়া। পরিবেশ অধিদপ্তর বলেছে, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আমাদের কথা হলো, অভিযান যদি পরিচালনা করা হয়ই, তাহলে পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না কেন?

নির্বিচারে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন এবং বন-জঙ্গল ও গাছপালা উজাড় করার কারণেই সিলেটের মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঘনঘন পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। কিন্তু তবুও থেমে নেই পাহাড় কাটা। পর্যটন নগরী হওয়ায় এক শ্রেণির প্রভাবশালী লোকের নির্দেশে রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল নির্মাণের নামে পাহাড় কাটা এ অঞ্চলে এখন প্রায় নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ দিকে পাহাড়ের গায়ে জন্মানো বন-জঙ্গল ও গাছপালা মাটির অভ্যন্তরীণ বন্ধন মজবুত রাখে। পাহাড় কাটার কারণে সেই বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সহজে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। ফলে প্রতিবারই প্রাণ হারায় মানুষ।

বস্তুত কিছু মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। গত এক দশকে চট্টগ্রাম, সিলেট ও মৌলভীবাজারে নিশ্চিহ্ন হয়েছে ৩৫টি পাহাড়। সেইসঙ্গে অন্তত ১৫৬টি পাহাড় ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পড়ে আছে। পাহাড় ধসের ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি পাহাড় ধসের ২৮টি কারণ নির্ণয় করে ৩৬ দফা সুপারিশ প্রণয়ন করেছিল; কিন্তু সেগুলো আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

অন্যদিকে দুঃখজনকভাবে পার্বত্য এলাকার অর্থনৈতিক সম্পদ ও সম্ভাবনার খুব কম অংশই ব্যবহার করা হচ্ছে। অতীতে আদিবাসীদের প্রধান পেশা ছিল জুম চাষ। গত ১৫ বছর ধরে তারা ফল চাষের দিকে বেশ আগ্রহী হয়েছেন। কিন্তু অল্প পরিমাণে বাগান ছাড়া অধিকাংশ পাহাড় আগাছা জাতীয় উদ্ভিদে পূর্ণ। অথচ এগুলোতে সেগুন, মেহগনি, চন্দন এবং আগর, তেজপাতা, কাজুবাদাম গাছ লাগানো যায়। এসব গাছ রোপণের ফলে বারবার পাহাড়ের মাটি পোড়াতে হবে না এবং পরিকল্পিতভাবে রোপণ করা হলে জুম চাষের চেয়ে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর পর্যটন ছাড়া এখানে আর কোনো শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। এ এলাকায় একমাত্র চন্দ্রঘোনা কাগজকল ছাড়া আর বড় শিল্প কারখানাও গড়ে ওঠেনি। অথচ পার্বত্য এলাকার পাহাড়ের বাঁশ-কাঠ ব্যবহার করে এখানে আরও কয়েকটা কাগজের কল প্রতিষ্ঠা করা যেত, যার ফলে দেশে কাগজের দামও কমত। এ ছাড়া এ এলাকায় ফল, আসবাবপত্র ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কাপ্তাই হ্রদের তীরে নৌযান এবং এর যন্ত্রাংশ উৎপাদন কারখানা প্রতিষ্ঠা করা যায়।

পর্যটন যে কীভাবে একটা দরিদ্র এলাকার জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রই তার প্রমাণ। এসব জেলায় একাধিক পর্যটনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হওয়ায় দরিদ্র আদিবাসীদের অনেকের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নির্মিত প্রায় ২০০০ ফুট পাহাড়ের ওপর সাজেক পর্যটনকেন্দ্র পরিণত হয়েছে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে। এমনকি আরও প্রায় ১০০ ফুট উঁচু কংলাক পাহাড়ের ওপরও পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার জন্য আদিবাসীরা হোটেল-রেস্টুরেন্ট বানিয়েছে। সারাবছর সেখানে ভিড় থাকে।

নদী, পাহাড়, বন ও হ্রদ বেষ্টিত কাপ্তাই পার্বত্য অঞ্চল আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হলেও সেখানে বেসরকারি হোটেল আছে মাত্র একটা। সরকারি সংস্থাগুলোরও আবাসন ভাড়া অত্যন্ত বেশি। এখানে আরও হোটেল প্রয়োজন। বাংলাদেশে নদী বা সমুদ্রে সাঁতার কাটার জন্য একটা জায়গাও নেই। এখানকার শান্ত কর্ণফুলি নদীতে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে পর্যটকদের সাঁতারের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়। পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষি, পর্যটন এবং শিল্প-কারখানার স্থাপন করে সেগুলোতে আদিবাসীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে এখানকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

বাংলাদেশের অন্যতম সম্পদ সমুদ্র। কক্সবাজার সৈকতের বালুতে ইলমেনাইট, জিরকন, রুটিল, ম্যাগনেটাইট, লিউকক্সিন, কিয়ানাইট, গারনেট এবং মোনাজাইটের মতো অনেক মূল্যবান খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলেও ১৯৮০ সাল থেকে ‘সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্র’ নামফলক স্থাপন ছাড়া এ ক্ষেত্রে আর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অবহেলার কারণে সৈকতের খনিজের ওপর নির্মিত হচ্ছে বড় বড় হোটেল! ২০১২ থেকে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বিশাল এক সমুদ্রসীমার অধিকারী হয়েছে, যেখানে তেল-গ্যাসসহ বহু মূল্যবান সমুদ্র সম্পদ আছে। কিন্তু এসব সম্পদ উত্তোলনে কোনো উদ্যোগ নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি সম্পর্কে সরকারির উদাসীনতা এবং নিষ্ক্রিয়তায় গত ৫৪ বছর ধরে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর এ খনিজ সম্পদগুলো নষ্ট হচ্ছে এবং সমুদ্রে হারিয়ে যাচ্ছে। এমনকি এই সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের জেলেদের মাছ ধরার কার্যক্রমও খুব কম। এই সুযোগে বিদেশি জেলেরা মাছ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে! দেশের বাজারেও সামুদ্রিক মাছের দাম খুব বেশি। অথচ আধুনিক নৌযান ও সরঞ্জামের সাহায্যে বেশি সংখ্যক জেলেকে নিজেদের সমুদ্রসীমায় মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত করা হলে অনেকের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হতো, বাড়তো রপ্তানি আয়ও।

মনে রাখা দরকার, প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। পরিবেশ রক্ষায় আন্তরিক না হলে আমাদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে সেই দায় শোধ করতে হয়। পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে বেআইনিভাবে পাহাড় কাটা রোধে এবং পাহাড়ে বসবাসকারীদের সুরক্ষায় সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর