কোথাও শ্যাওলা জমেছে। কোথাও ভেঙে পড়েছে প্রাচীরের অংশ। চারদিকে জন্মেছে আগাছা। এভাবে অযত্ন-অবহেলায় জীর্ণ হয়ে পড়েছে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক নয় গম্বুজ মসজিদ। দ্রুত সংস্কার করা না হলে মসজিদটি অচিরেই ধ্বংসাবশেষে রূপান্তরিত হবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ না নিলে নয় গম্বুজ মসজিদের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে। ভবিষ্যতে স্থাপনাটির মূল কাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
নয় গম্বুজ মসজিদ বাগেরহাট সদর উপজেলার খান জাহান আলীর (রহ.) মাজারের ৪০০ মিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ঠাকুর দিঘি বা খাঞ্জেলী দিঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। ১৫শ শতাব্দীতে সুলতানি আমলে নির্মিত মসজিদটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ‘মসজিদের শহর বাগেরহাট’-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মসজিদের অভ্যন্তরে দুই সারি পাথরের পিলার দিয়ে মোট নয়টি চারকোনা খণ্ডে বিভক্ত করা হয়েছে। এই নয়টি খণ্ডের ওপর মসজিদের নয়টি গম্বুজ অবস্থিত।
মসজিদটির ছাদে ৪টি পাথরের স্তম্ভের ওপর নয়টি গম্বুজ আছে। এটি সুনিপুণ টেরাকোটা অলংকরণে সমৃদ্ধ। পশ্চিম দেওয়ালে নির্দিষ্ট দূরত্বে তিনটি মেহরাব আছে। মসজিদের ভেতরে এবং বাইরে ইটের নকশা ও পোড়ামাটির কারুকাজ আছে। মসজিদে প্রবেশের জন্য সামনের অংশে একটি প্রধান ও সমদূরত্বে দুটি পার্শ্ব দরজা আছে। এ ছাড়া কথিত আছে, মসজিদের একটি পিলারে হজরত খানজাহান আলীর (রহ.) আঙ্গুলের ছাপ আছে। যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

নয় গম্বুজ মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা ওমর ফারুক বলেন, ‘নয় গম্বুজ মসজিদটি হজরত খানজাহান আলীর (রহ.) ইবাদতখানা ছিল। এখানে তার আঙুলের ছাপও আছে। তার স্মৃতি বিজড়িত মসজিদটির কিছু জায়গা ভেঙে গেছে। কিছু জায়গায় লবণ ধরেছে। ছাদ থেকে পানি পড়ার উপক্রম হয়েছে। মেরামত না করা হলে অচিরেই ছাদ ধসে পড়তে পারে। আমরা চাই, মসজিদটি মেরামত করা হোক। স্থানীয়রা অনেকে নিজ উদ্যোগে কাজটি করতে চাচ্ছেন। কিন্তু সরকার তা করতে দিচ্ছে না।’
স্থানীয় ইমরান বলেন, ‘১৫০০ শতকের দিকে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) বাগেরহাট আসেন ইসলাম প্রচার করার জন্য। এসময় তিনি ষাট গম্বুজ মসজিদ, নয় গম্বুজ মসজিদসহ অনেক মসজিদ তৈরি করেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেগুলো নষ্ট হতে শুরু করেছে। এই নয় গম্বুজের অবস্থা খুবই নাজুক। ষাট গম্বুজ মসজিদের জনপ্রিয়তা বেশি থাকায় সেটার কিছু সংস্কার করা হচ্ছে। কিন্তু এই নয় গম্বুজ মসজিদ অবহেলায় আছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যদি মসজিদটিতে নজর দেয় তাহলে এটা টিকে থাকবে। এই মসজিদ বাগেরহাটের ঐতিহ্য। এটা যদি সংস্কার করে রাখা হয় তাহলে হয়তো ৫০০ বছর পরও দর্শনার্থীরা দেখতে পাবেন। এটা যদি সংস্কারহীন থাকে তাহলে এক-দুশ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে।’

আবু তালেব বলেন, ‘মসজিদটিতে বিভিন্ন জায়গায় লবণ ধরে গেছে। বিভিন্ন জায়গা ধসে পড়েছে। দেওয়ালে শ্যাওলা ও বিভিন্ন জায়গায় পরগাছা হয়েছে। এইভাবে অবহেলায় থাকলে মসজিদটি বিলীন হয়ে যাবে। আমরা সরকারের কাছে আবেদন করবো, যেন মসজিদটিতে তারা নজর দেয়।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নয় গম্বুজ মসজিদটির সীমানা প্রাচীর ভেঙে গেছে। এ ছাড়া স্থাপনাটির দেওয়াল ও ছাদ পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার এ বছরেই করা হবে।’