বাংলাদেশের নারীরা কর্মক্ষেত্রে আগমন করেছে অনেক আগেই যদিও শুরুর দিকে এই সংখ্যা ছিল সীমিত । কিন্তু দিন দিন সমাজে কর্মজীবি নারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে । আর এইসব নারীদের যেমন ঘরের কাজ ব্যস্ত থাকতে হয় তেমনি সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কর্মক্ষেত্রেও সমানভাবে কাজ করতে হয় । ঘর আর বাহির একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে কর্মজীবি নারীকে সহ্য করতে হয় নানা কস্টকর অবস্হা। চারিদিক সামলাতে গিয়ে স্বাভাবিক কারনেই শারিরীকভাবে অসুস্হ হয়ে যেতে পারেন নারীরা । প্রথমেই এই ব্যস্ততার মাঝেও কিভাবে শরীরটাকে সুস্হ রাখা যায় সে বিষয়ে কর্মজীবি নারীদের সচেতন থাকতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই কর্মজীবি নারীদের জীবন যাপন অর্থ্যাৎ দৈনন্দিন কিছু রুটিন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা উচিত।
বলা হয়ে থাকে সকালের নাশতাই সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন এবং দিনের শুরুটাই আসল । কিন্তু কর্মজীবি নারীর দিনের শুরুতেই শুরু হয় সবচেয়ে ব্যস্ততা । বাচ্চাকে স্কুলের জন্য তৈরী করা , পরিবারের সকলের নাশতা তৈরী করা , সারাদিনের খাবার নিশ্চিত করা , কাজের মানুষকে সামলানো ইত্যাদি নানা আয়োজন সম্পন্ন করতে গিয়ে অনেক কর্মজীবি নারীরা নাশতা খাবার সময় ভুলে যান কিম্বা সময় পাননা । কিন্তু সকালের নাশতার উপর গুরুত্ব দিতে হবে সকল কর্মজীবি নারীকে । চা আর বিস্কুট দিয়ে দিন শুরু করুন । তারপর হাতে তৈরী রুটি , ব্রাউন ব্রেড , ওট , কর্নফ্লেক্স আর অন্তত দুটি মৌসুমী ফল রাখুন সকালের খাদ্য তালিকায় । কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার সকালের দিকেই খেতে নেয়া ভাল কারন কাজ শুরু করলে অনেক সময় খাবার সময় যেমন পাওয়া যায়না তেমনি আয়োজন করাও সহজ হয়না অনেকসময় । তাই বাকি দিনটা যদি প্রোটিন আর ফলের উপর থাকা যায় তা মন্দ হয়না । এর মাধ্যমে সারাদিনের পুস্টি নিশ্চিত হয় ।
যারা অফিসে কাজ করেন তাদের মুলত পানি কম খাওয়া হয় । এসির মধ্যে বসে থাকার দরুন পানি পিপাসা কম থাকে । আমাদের দেশের আবহাওয়ায় দিনে চার লিটার পানি পান করা জরুরী । সপ্তাহে তিনচারদিন একটা ডাব খাওয়া যেতে পারে যার ফলে শরীরে পটাশিয়াম ও ফসফরাসের লেভেল ঠিক রাখা যায় । সকালের দিকে হাল্কা গরম পানিতে একটু লেবু দিয়ে খেলে শরীরের মেদ ঝরে যেতে সাহায্য করতে পারে কারন কর্মজীবি নারীদের অনেকসময় একটানা চেয়ারে বসে থাকতে হয় যার কারনে বাড়তি মেদ জমতেই পারে । দিনের মাঝের সময়টাতেও যদি একটু হাল্কা গরম পানিতে চুমুক দেয়া যায় তাতেও ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে । আর রাতে খাওয়ার কিছুক্ষন পর হালকা গরম পানি খেতে পারলে খাবার যেমন হজম হয় তেমনি ডিট্ক্স প্রক্রিয়া ভাল হয় । শরীরের সুস্হতায় সঠিকভাবে পানি পান করা একটি গুরুত্বপুর্ন বিষয় ।
কর্মজীবি নারীদের কারনে অকারণে চা খাওয়া হয় প্রচুর । কিন্তু দুধ চা এবং দুধ কফি শরীরের জন্য ক্ষতিকর । গ্রিনটির অভ্যাস করা স্বাস্হ্যসম্মত। অনেকের কাছেই গ্রিনটি স্বাদহীন মনে হয় ।কিন্তু কয়েকদিনের অভ্যাস করলেই সবটাই বদলে যেতে পারে । দিনে তিনচারবার গ্রিনটির অভ্যাস শরীরের জন্য খুবই উপকারী কারন এর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট শরীরের নানাবিধ সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম । ওজন নিয়ন্ত্রনেও এটি ভুমিকা রাখতে পারে ।
কর্মজীবি নারীদের কর্মক্ষেত্রের নানা মিটিং , সেমিনার ওয়ার্কশপে ফাস্টফুড আর মিস্টি থাকে । ফাস্টফুড আর মিস্টির লোভ অনেকসময় সম্বরন করা সম্ভব হয়না । নানা স্ট্রেস থাকার কারনে এসব খাবার খেতে তখন ভালই লাগে যদিও এগুলি ক্ষতিকর সবাই জানে । খাদ্য তালিকা থেকে সব ধরনের ফাস্টফুড মিস্টি বাদ দিতে হবে । সেই জায়গাটা দখল করুক সালাদ আর ফল । আপেল , পেয়ারা , জামরুল , আনারস , তরমুজ , পাকা পেঁপে , শশা , আমড়া , আমলকি সহ সকল ফল আর সালাদই নারীদের জন্য উপকারী । এটি শুধু কর্মজীবি নয় সকল নারীরাই অনুসরন করতে পারেন ।
বাড়ীতে পাতা টকদই লান্চে খাওয়া উপকারী । সাথে ব্রাউন রাইস কিম্বা ব্রাউন আটার রুটি , ওটমিল ইত্যাদির সাথে ডাল, সব্জি আর মাছ কিম্বা মুরগীর ঝোল হেলদি খাবার হিসাবে উপযোগী । বিফ কিম্বা মাটন না খাওয়াই ভাল । আর অধিকাংশ মানুষের এত সামাজিক ও পারিবারিক প্রোগ্রাম আর পার্টি থাকে সেক্ষেত্রে না চাইলেও রিচফুড খাওয়া হয়ে যায় ।
কর্মজীবি নারীদের মধ্যে যারা সারাদিন চেয়ারে বসে কাজ করেন তাদের জন্য বিপদ একটু বেশী হতে পারে । তাই যতটা পারা যায় ঘোরা ফেরা করতে হবে । চেয়ার থেকে মাঝে মাঝে উঠে দাড়িয়ে অফিস চত্বরে ঘোরাঘুরি করতে হবে কিম্বা রুমের ভিতরেই পায়চারি করতে হবে ।
অনেক নারীরা খালিপেটে থাকাকেই ডায়েটিং বলে মনে করেন কিন্তু এই ধারনা সম্পুর্ন ভুল । বেশীক্ষন না খেয়ে থাকার পর যে খাবারই খাবেন না কেন শরীর সেটা থেকে দ্রুত ফ্যাট তৈরী করে এমনকি পানি খেলেও । তাই নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর খাবার এবং পানি খান । খালিপেটে একেবারেই থাকা যাবেনা । তাই হেলদি থাকার জন্য এটিও জরুরী ।
শরীর সুস্হ রাখতে হলে নিয়মিত ব্যায়াম জরুরী । তাই আপনার একশনটাইম ঠিক করতে হবে । অনেকে মনে করেন ঘরের কাজ করলেই এটি হয়ে যায় তা কিন্তু নয় । ঘরের কাজে আপনার স্ট্রেস যুক্ত থাকে যার কারনে ওজন আরো বাড়ে কারন অধিকাংশ নারীরাই ঘরের কাজ শেষ করে ফ্রিজ খুলে একটা কিছু খেয়ে নেয় যা শরীরে বাড়তি মেদ যোগ করে । তাই সময় করে যোগ, জিম , হাঁটা , সাঁতার কোন একটা নিয়মিত করতেই হবে । সপ্তাহে পাঁচ ঘন্টা শরীরচর্চার জন্য রাখা উত্তম । এরমধ্যে আড়াইঘন্টা শরীর থেকে প্রচুর ঘাম ঝরাতে হবে । শরীর চর্চা ওজন কমানো ছাড়াও শক্তি বাড়ায়, হাড় মজবুত রাখে এবং স্ট্রেস ফ্রি রাখতে সাহায্য করে । শরীরের সুস্থতার জন্য শরীর চর্চার জুড়ি নাই ।
কর্মজীবি নারীদের ঘুমটাও অত্যন্ত জরুরী । ঘুম ঠিকমত না হলে ওজন বেড়ে যেতে পারে । তাই দিনে সাতঘন্টা ঘুম জরুরী । ব্যালেন্সড ডায়েট , নিয়মিত শরীর চর্চা , ডিনারের পর হালকা গরম পানি ও স্ট্রেস ফ্রি থাকতে পারলে ঘুম ভাল হয় ।
শরীরের সুস্থতার জন্য ভিটামিন ডি অত্যন্ত প্রয়োজন কিন্তু অধিকাংশ কর্মজীবি নারীদের যে সময়টাতে সুর্যের আলোতে ভিটামিন ডি পাবার সম্ভাবনা থাকে সেই সময়টাতে অফিসে থাকতে হয় । যেমন সকাল সাতটা থেকে দশটা এবং বিকাল তিনটা থেকে চারটা প্রকৃতিতে ভিটামিন ডি বেশী থাকে । কিন্তু কর্মজীবি নারীদের পক্ষে এসময় বাইরে থাকা সম্ভব হয়না । এক্ষেত্রে ছুটির দিন গুলোতে নিয়ম করে সুর্য স্নান করা যেতে পারে । ভিটামিন ডি এর ঘাটতি বেশী হলে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট গ্রহন করা জরুরী ।
পয়ত্রিশের পরে কর্মজীবি নারীদের হেলথ চেকআপ জরুরী । ব্লাড সুগার , কোলেস্টেরল ও প্রেসার নিয়ন্ত্রনে আছে কিনা সেটি নিশ্চিত করতে হবে । সেই সাথে ব্রেস্ট মেমোগ্রাম করা উচিত প্রতি বছরে একবার । কারন বয়স বাড়ার সাথে সাথে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে থাকে ।
কর্মজীবি নারীরা চ্যালেন্জ মোকাবেলা করে পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে । এই সময় অধিকাংশ নারীরা শারিরীক অস্বস্তি বোধ করে । অনেকের মাথা ব্যথা , ঝিমঝিম ভাব , গা ম্যাজম্যাজ করতে থাকে । অনেকের প্রথম দুইতিন দিন ভারী ব্লিডিং চলতে থাকে । সেইসময় অফিসে কাজের ঝামেলা বেশী থাকলে অনেক কস্ট হয় । তারপরও সেটি ম্যানেজ করতে হবে । এক্ষেত্রে বাথরুম কমন হলে নারীদের স্যানিটারী প্যাড বদল করতে ঝামেলা পোহাতে হয় । এক্ষেত্রে নারীদের খেয়াল রাখতে হবে আঁশে পাশে মহিলা বাথরুম আছে কিনা এবং ব্যাগে একটি পলিথিন রাখতে হবে ।
মা হওয়া এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি নারীদের জন্য আরেকটি চ্যালেন্জ । মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয়মাস করাতে অনেক নারীদের সুবিধা হয়েছে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ছুটি শেষ হলে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলী করা হয় যা অনেক সময় ক্যারিয়ারিস্ট নারীরা মেনে নিতে পারেনা । যার ফলে তার মাঝে অনেকসময় ডিপ্রেশন বা ফ্রাস্টেশন আসতে পারে । এটিও নারীদের মোকাবেলা করতে হবে নিজের মানসিক শক্তি দিয়ে । যত কস্টে থাকুক তাকে প্রমান করতে হবে একটি শিশু জন্ম দেবার পরও সে সমানভাবে অফিসে কন্ট্রিবিউট করছে । অনেকের ক্ষেত্রে এটি করা সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে তারা সন্তান লালন পালনকে মুখ্য জ্ঞান করে কর্মক্ষেত্রে কম গুরুত্বপুর্ন কাজ করে যার ফলে নারীদের মাঝে প্রফেশনালিজম কম কাজ করে । এটি কাম্য নয় । পুরুষরা যদি সন্তান লালন পালনে সমানভাবে অংশগ্রহন করে তবে নারীরা প্রফেশনালিজম বিল্ডআপ করতে পারত । তবে নারীদের শুধু সংসারধর্ম আর সন্তান পালনে ব্যস্ত না থেকে কোয়ালিটি টাইম বের করে নিয়ে কাজ করতে হবে তবেই কাজের ক্ষেত্রে সফল হতে পারবে ।
নারীদের সুস্হ থাকতে হবে কারন একজন কর্মজীবি নারী কিন্তু ঘর বাহির সব কিছুর দায়িত্ব নিয়েছে । তাকে দশভুজা বললে ভুল বলা হবেনা । সন্তানের স্বাস্হ্য পুস্টি , শিক্ষা , মানসিক গঠন সবকিছুর ভার নারীদের । আর কর্মজীবি নারীর সন্তান ভাল রেজাল্ট না করলে তার দায়ভার পড়ে তার উপর । সমাজ ও পরিবার আঙুল উঁচু করে বলে ঐ যে নিজের ক্যারিয়ার ক্যারিয়ার করে নিজের সন্তানের দেখভাল করেনা । এক্ষেত্রে গৃহবধুরা ভাল অবস্হানে থাকে । কারন সন্তান লালন পালনে অন্য কারো সহযোগিতা না হলেও চলে । কিন্তু কর্মজীবি নারীর ক্ষেত্রে পরিবারের ঘনিষ্ট কাউকে এগিয়ে আসতে হয় । এক্ষেত্রে দেখা যায় নারীদের মায়েরা , বোনেরা যেভাবে এগিয়ে আসে শাশুড়ী কিম্বা স্বামীর আত্মীয় স্বজনরা তেমন কোন ভুমিকা পালনে এগিয়ে আসেনা । ব্যতিক্রম থাকতেই পারে কিন্তু সবক্ষেত্রে নয় । আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র অপ্রতুল এবং নিম্নমানের । যার ফলে অনেক নারী অনেক উচ্চশিক্ষা গ্রহন সত্ত্বেও কোন কাজ করার চিন্তা করেনা কিম্বা করতে পারেনা । এছাড়া বৃদ্ধনিবাসের বিষয়টি খুবই নেতিবাচক হিসাবে দেখা হয় । যার কারনে বয়োবৃদ্ধদের দেখাশুনা করা এবং তাদের চিকিৎসাকালীন সেবার সব দায়িত্ব পরিবারের নারী সদস্যদের উপর পড়ে । একটি পরিবারের শিশু আর বয়োবৃদ্ধদের সেবা করার পর অনেক নারীই মধ্য বয়সে এসে চাকরী ছাড়তে বাধ্য হয় । অধিকাংশ কর্মজীবি নারীরা তাদের উপার্জনের বড় অংশ কিম্বা পুরোটাই সংসারের সেবায় ব্যয় করে । নিজের স্বাস্হ্য কিম্বা সন্তষ্টির কথা চিন্তা করেনা । নিজে ভাল থাকতে হলে নিজের জন্য আলাদাভাবে সন্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং নিজেকে ভালবাসতে হবে নিজে নিজেকে উপহার দিয়ে ।
অধিকাংশ কর্মজীবি নারীরা নিজের ভাললাগার জায়গাটুকু পর্যন্ত ভুলে যায় । যে সুন্দর গান করত সে কতদিন গান করেনি , যে ছবি আঁকত সে আর ছবি আকেনি যে কবিতা লিখত সে কবিতা ভুলে গিয়েছে । নিজের জন্য সময় বের করা জরুরী । কারন শুধু অফিস আর ঘরকন্যার কাজের মাঝে থাকলে কখনো রিল্যাক্স হওয়া যায়না । তাই নিজের সুকুমার গুন বিকাশের মাধ্যমে আপন আনন্দটুকুও ধরে রাখা জরুরী ভাল থাকার জন্য । অধিকাংশ নারীদের বন্ধু খুব থাকে । থাকলেও সময়ের অভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । যার কারনে অধিকাংশ নারীরা বন্ধুত্ব , আড্ডা কি তাই জানেনা । নির্মল বন্ধুত্বের মধ্যে যে অনাবিল আনন্দ তার স্বাদ নারীরা পায়না বললেই চলে । কর্মজীবি নারীদের অফিস কেন্দ্র করে একটি বন্ধুত্বের বলয় গড়ে উঠে যা অনেকসময় তাদের মানসিক প্রশান্তির একটা জায়গা হতে পারে । কিন্তু সে বন্ধুত্ব অনেকসময় বদলী জনিত কারন কিম্বা পারিবারিক কারনে দুরত্ব তৈরী হয় । ভাল বন্ধুত্বের জন্য সময়ের খুব দরকার । তাই যত কাজই থাক বন্ধুদের জন্য সময় বের করতে হবে । দুই একজন ভাল বন্ধু মানসিক সুস্হতার জন্য প্রয়োজন । কর্মক্ষেত্রে যেহেতু নারীদের সংখ্যা কম থাকে তাই অনেকসময় পুরুষ কলিগদের সাথেও ভাল বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে ।
চলবে –
লেখক : কর কর্মকর্তা।