ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিয়েছে বুথফেরত জরিপ। দুই নেতাই নির্বাচনে নিজেদের জয়ের দাবি তুলে ধরেছেন।
তবে ইরান যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা উচিত, তা নিয়ে তাদের অবস্থানে রয়েছে বড় পার্থক্য। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভি বলছে, নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল চলমান এই যুদ্ধ। দেশটির সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান আইজেনকট ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় যুদ্ধে তার এক ছেলে নিহত হন। যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পর ছেলেকে হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্যেও তিনি এমন এক আধুনিক ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যেখানে ইহুদি ও আরব জনগোষ্ঠী পাশাপাশি বসবাস করবে।
ইরানকে পরাস্ত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগকে দেখছেন আইজেনকট। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সামরিক হামলার পক্ষে থাকলেও তিনি সর্বাত্মক যুদ্ধ আবার শুরু করার বিরোধী।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর অবস্থান হলো—ইসরায়েলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। নিজের বক্তব্যের গুরুত্ব বোঝাতে ভোটের আগের দিন তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি তেল আবিবে পারমাণবিক বোমা হামলার একটি ছবিও প্রকাশ করেন।
সাম্প্রতিক সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ প্রস্তাবে সম্মতি দেননি বলে জানিয়েছে একটি ইসরায়েলি সূত্র।
সূত্রটি বলেছে, ‘নেতানিয়াহু নির্বাচনের আগে ইরানে যৌথ হামলার জন্য ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প সবুজ সংকেত দেননি।’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া খবর’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
তবে নির্বাচনে আইজেনকটের বিরোধী জোটের সঙ্গে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পুনরায় শুরুর চেষ্টা চালানোর অভিযোগ এটিই প্রথম নয়।
যুদ্ধ নিয়ে মুখোমুখি দুই নেতা
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান আইজেনকট মনে করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার কৌশলের সমালোচনা করে আসছেন। তার মতে, যুদ্ধের পরিকল্পনা যথাযথ ছিল না এবং সংঘাতের অবসানে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, অতীতে যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া আইজেনকট এখন ট্রাম্পের ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ নীতিকে সমর্থন করেন। তার মতে, নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে পরাজয়ের অনুভূতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেও নেতানিয়াহুর সঙ্গে আইজেনকটের পার্থক্য রয়েছে। নেতানিয়াহু মনে করেন, ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সুসম্পর্কই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
অন্যদিকে, আইজেনকট বারবার বলেছেন, ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে ইসরায়েলকে এবং দেশটির নিজস্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
ক্ষমতার চাবি কার হাতে?
ইসরায়েলের বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোটের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে জরিপে কোনো পক্ষকেই স্পষ্ট বিজয়ী হিসেবে দেখা যায়নি। তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধের পরও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জরিপ অনুযায়ী, পরবর্তী পার্লামেন্টে বর্তমান সরকারের বিরোধীরা সম্মিলিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। ঐতিহাসিক সাফল্যের ইঙ্গিত পাওয়া আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে আদর্শগতভাবে ভিন্ন এসব দল একসঙ্গে জোট সরকার গঠন করতে রাজি হবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এ নিয়ে আলোচনা হলে কয়েক সপ্তাহ ধরে দর-কষাকষি চলতে পারে।