1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৫ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় : ৪ বিষয়ে শিক্ষক সংকট বেশি, শিখনে ঘাটতি পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে দুর্নীতি : ঢাকা ওয়াসার গচ্চা ১৫৬২ কোটি টাকা যশোরে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের প্রাসাদ থেকে অল্প দূরে আছড়ে পড়ল বিমান, ৯ জন নিহত শিক্ষকদের পে-স্কেল বাস্তবায়নে ৩২৬৭ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি ৪০ হাজার বেতনে চাকরি দেবে রকমারি.কম, থাকছে যেসব সুবিধা পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে শাবনূর

মানুষ রাতে শান্তিতে ঘুমাবে—এমন পুলিশিং ব্যবস্থা রেখে যেতে চাই : ঢাকার এসপি শামীমা

নিজস্ব প্রতিবেদক |
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৯০ বার পঠিত

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় পাঁচ মাস পার করেছেন পুলিশের চৌকস কর্মকর্তা শামীমা পারভীন। ঢাকা জেলার ইতিহাসে প্রথম নারী পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজধানীর চারপাশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক ও কিশোর গ্যাং দমন, সাইবার অপরাধ রোধ, নারীর নিরাপত্তা, পুলিশে নারীদের অংশগ্রহণ এবং বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানোসহ নানা বিষয়ে কাজ করছেন তিনি। সমাধান খুঁজতে ছুটে গেছেন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়।

দীর্ঘ ২০ বছরের পুলিশিং ক্যারিয়ারে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এই কর্মকর্তার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের। ঢাকা জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশের নানা সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা এবং জনবান্ধব পুলিশিংয়ের ভাবনা নিয়ে বিজনেস ডাইজেস্টের মুখোমুখি হয়েছেন শামীমা পারভীন।

বিজনেস ডাইজেস্ট: দায়িত্ব নেওয়ার পর চার মাস ২৮ দিন অতিবাহিত হলো। ঢাকা জেলার ইতিহাসে প্রথম নারী পুলিশ সুপার হিসেবে এ রকম একটি জটিল জেলার দায়িত্ব নেওয়ার পর কোন চ্যালেঞ্জটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি তাড়িত করেছে?

শামীমা পারভীন: ধন্যবাদ আপনাকে। ঢাকা জেলার ৯৮তম পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় নিজেকে একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবেই ভেবেছি; নারী বা পুরুষ হিসেবে নয়। রাজধানী ঘিরে গঠিত ঢাকা জেলায় বৈচিত্র্যময় মানুষের বসবাস এবং অপরাধের ধরনও ভিন্ন। এসব বিষয় নিয়ে কাজ করাকে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছি। আমার ২০ বছরের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে এসব মোকাবিলা করছি।

পুলিশের মূল কাজই হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশকে স্থিতিশীল রাখা। সারা দেশের মতো ঢাকা জেলাতেও মাদক একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি প্রযুক্তিভিত্তিক সাইবার অপরাধের নতুন ধারা তৈরি হচ্ছে। ভৌগোলিক গুরুত্ব ও বৈচিত্র্যময় অপরাধ সামলানোই এখন আমাদের প্রধান কাজ।

বিজনেস ডাইজেস্ট: ২০০৬ সালে পুলিশে যোগ দেওয়ার পর প্রায় ২০ বছরের কর্মজীবনে নারী কর্মকর্তা হিসেবে কোনো বৈষম্য, অবমূল্যায়ন বা বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন কি?

শামীমা পারভীন: শুধু পুলিশের ক্ষেত্রেই নয়, উন্নত বিশ্বেও নারীদের জন্য পথ কখনওই খুব সহজ নয়। পলিসি লেভেল, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে— বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে অপরাধ নিয়ে কাজ করার সময় প্রথমেই প্রশ্ন তোলা হয় : ‘তিনি তো নারী, কাজটি কি সঠিকভাবে করতে পারবেন?’ অর্থাৎ, একজন পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে মূল্যায়নের আগেই তার নারী পরিচয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে।

সামাজিক এই জেন্ডার বৈষম্য আমরা এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি এবং পুলিশ বাহিনীর ভেতরেও এর কিছু প্রভাব রয়ে গেছে। অবশ্য আমার ২০ বছরের চাকরিজীবনের সিংহভাগ সময় ট্রেনিং সেন্টারে কাটানোয় সরাসরি মাঠপর্যায়ের বৈষম্য অতটা মোকাবিলা করতে হয়নি। তবে, বিগত সরকারের আমলে দেখেছি, অনেক যোগ্য নারী কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও কেবল নারী হওয়ার কারণে তাদের উপযুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

তবে, বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ, তারা নারীবান্ধব মনোভাব দেখিয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর ঢাকা জেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এলাকায় পুলিশ ও জেলা প্রশাসন— উভয় ক্ষেত্রেই নারী কর্মকর্তাদের ওপর আস্থা রাখা হয়েছে। আমাদের ‘নারী’ হিসেবে না দেখে একজন দক্ষ পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা বা প্রশাসক হিসেবে বিবেচনা করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অনেক ডিসি, এসপি ও ইউএনও পদে নারীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন এবং মাঠপর্যায়ে এর ইতিবাচক ফলও পাওয়া যাচ্ছে।

বিজনেস ডাইজেস্ট: আপনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেখানে আপনার নানা ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের পুলিশে নারী সদস্যদের ক্ষেত্রে কোনো কাঠামোগত সমস্যা বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন কি?

শামীমা পারভীন: এটি বাংলাদেশ পুলিশ তথা পুরো দেশের জন্যই একটি বড় গৌরবের বিষয় যে, আমি ১৫টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন’-এর রিজিওনাল কোঅর্ডিনেটর এবং সেন্ট্রাল অ্যান্ড সাউথ ইস্ট এশিয়ান অঞ্চলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

আমাদের পুলিশ বাহিনীতে বৈষম্যের জায়গা কিছুটা তো রয়েছেই। যেমন— নিয়োগ প্রক্রিয়ার (Recruitment) কথাই যদি বলি; আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা এমনিতেই পিছিয়ে পড়া একটি গোষ্ঠী। সেখানে পুলিশিংয়ের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় সামাজিক নানামুখী সংস্কার ও পারিবারিক বাধার কারণে মেয়েদের শুরুতেই উৎসাহিত করা হয় না। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নারীদের বিশেষভাবে সামনে আনার সুযোগ তৈরি করা দরকার।

দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে কোনো রাষ্ট্র বা অর্থনীতির পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই নীতিনির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া আবশ্যক। মাঠপর্যায়ে, বিশেষ করে থানার ‘উইমেন হেল্প ডেস্কে’ সেবা প্রার্থীরা নারী পুলিশ সদস্যদের কাছে নিজেদের সমস্যা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং বেশি আস্থা পান। সহজাত মমত্ববোধের কারণে সেখানে এক ধরনের ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়। তাই পুলিশে নারী সদস্য বাড়ানোর পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের কাজের সুযোগ আরও প্রসারিত করা উচিত।

বিজনেস ডাইজেস্ট: ঢাকার বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ সুপার হিসেবে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে নাকি অবনতি? নাকি অপরাধের ধরন ও পদ্ধতি বদলেছে?

শামীমা পারভীন: ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বের কারণে ঢাকা জেলা অবশ্যই একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এলাকা। রাজধানীসংলগ্ন হওয়ায় অপরাধীরা নিজেদের লুকিয়ে রাখার ভৌগোলিক সুবিধা নিতে ঢাকায় অবস্থান করতে পছন্দ করে। অপরাধ সংঘটিত করে দ্রুত গা-ঢাকা দেওয়া তাদের জন্য সহজ হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ক্রাইমসহ প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন ধরনের অপরাধের বিস্তার ঘটছে। কিন্তু সেই তুলনায় আমাদের পুলিশ বাহিনীতে উন্নত প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে; অর্থাৎ প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে আমরা এখনও পুরোপুরি তাল মিলিয়ে উঠতে পারিনি। এরপরও আমাদের বিদ্যমান সীমিত লজিস্টিক সাপোর্ট ও কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা ঢাকা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনছি।

বিজনেস ডাইজেস্ট: ৫ আগস্টের পর সার্বিক পরিস্থিতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও মোহাম্মদপুর বা জেনেভা ক্যাম্পের মতো কিছু এলাকা এখনও অপরাধের আখড়া হিসেবে থেকে গেছে, যেখানে প্রকাশ্য খুন ও মাদকের তৎপরতা দেখা যায়। এসব সংবেদনশীল এলাকা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা কোথায়?

শামীমা পারভীন: দায়িত্ব গ্রহণের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন— বাহিনীতে যোগদানের পর থেকে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের পেশাদার কর্মকর্তা এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। তাই যেকোনো অপরাধকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে মোকাবিলা করতে হবে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, পুলিশি কার্যক্রমে পেশাদারিত্বই মুখ্য হবে এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ করা হবে না।

এই নির্দেশনা আমাদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। গত কয়েক মাস ধরে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করছি। বিশেষ করে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে বলেছেন এবং কোনো কম্প্রোমাইজ না করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও আপনি যেসব এলাকার কথা উল্লেখ করলেন, সেগুলো ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অধীন। তা সত্ত্বেও ডিএমপি কমিশনার, আইজিপি এবং আমরা সবাই সমন্বয় রেখে এসব ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পটে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

বিজনেস ডাইজেস্ট: ঢাকার ভেতরে মাদক কিংবা অপরাধের ২০টি বা ৫০টি নির্দিষ্ট ‘হটস্পট’— এমন কোনো পরিসংখ্যান কি আপনারা চিহ্নিত করতে পেরেছেন?

শামীমা পারভীন: সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত পরিসংখ্যান কৌশলগত কারণে আমরা গণমাধ্যমে আনছি না, তবে অপরাধ নিয়ে আমাদের নিজস্ব গবেষণা এবং ডেটাবেজ রয়েছে।

ঢাকা জেলার কথা বললে— গার্মেন্টসবেষ্টিত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা আশুলিয়া, গাবতলীসংলগ্ন আমিনবাজার এবং হেমায়েতপুরের কথা বলা যায়। ভৌগোলিক কারণে এসব এলাকায় ভাসমান মানুষের আনাগোনা বেশি, যা মাদকের কেনাবেচায় অপরাধীরা ব্যবহারের চেষ্টা করে। আমরা এসব এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনেছি। ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলের চিহ্নিত দুই বড় মাদক ব্যবসায়ী শামীম ও মাহবুবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; তাদের মধ্যে একজন বর্তমানে কারাগারে আছে এবং অন্যজন জামিনে রয়েছে। এছাড়া, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও সাভারসহ অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বিজনেস ডাইজেস্ট: সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা আছে— মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু মূল ‘রাঘববোয়াল’ কিংবা সাপ্লাই চেইনের নিয়ন্ত্রকরা অধরাই থেকে যায়। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

শামীমা পারভীন: জনগণের এই পর্যবেক্ষণ একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়; তাদের ধারণা অনেকাংশেই সঠিক। সত্যি বলতে, মাদকের ব্যাপ্তি এখন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। তবে, মনে রাখতে হবে— বাংলাদেশে কিন্তু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এসব মাদক তৈরি হয় না, এর প্রায় পুরোটাই সীমান্ত পেরিয়ে বাইরে থেকে আসে। তাই মাদকের চেইন ভাঙতে হলে সবার আগে সীমান্ত এলাকায় লাগাম টানতে হবে এবং সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে আরও কঠোর হতে হবে।

বিজনেস ডাইজেস্ট: এর অর্থ কি সীমান্ত এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী (বিজিবি) কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না?

শামীমা পারভীন: বিষয়টি ঠিক সেভাবে দেখা উচিত নয়। বিজিবি কাজ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো। তবে, শুধু বিজিবিকে দায়ী না করে পুলিশসহ সব সংস্থাকে একে অপরকে দোষারোপের (ব্লেম গেম) সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত ফোর্সের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, সাংবাদিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতাদেরও এক ছাতার নিচে আনতে হবে।

এ ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনি প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা। আমরা যখন কোনো বড় বা মাঝারি মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করি, দেখা যায় তারা ১০-১৫ দিন বা এক মাসের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আসছে। জামিন পেয়ে এরা আরও বেপরোয়া হয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে পুরনো অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে আমাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই চিহ্নিত মাদক কারবারিরা যেন সহজে জামিন না পায়, সে জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় কার্যকর কঠোরতা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা জরুরি।

বিজনেস ডাইজেস্ট: কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার সমাজে ক্যানসারের মতো রূপ নিয়েছে, যেখানে দিন দিন অল্পবয়সী শিশু-কিশোরেরা জড়িয়ে পড়ছে। ‘গ্যাং থার্টি সিক্স’-সহ বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকা জেলা পুলিশের বিশেষ কোনো নজরদারি রয়েছে কি?

শামীমা পারভীন: একজন মা হিসেবে আমি বলব— সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং সন্ধ্যার পর অনর্থক বাইরে অবস্থান করছে কি না, তা নিয়ে প্রতিটি বাবা-মাকে খেয়াল রাখতে হবে। সামাজিক এই ব্যাধি একা পুলিশের পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়; অভিভাবকদের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের নীতি-নৈতিকতা শেখানো এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে এগিয়ে আসতে হবে।

আর একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো— কিশোর গ্যাং কালচারের জন্য কেবল ওই কিশোরদের দোষ দিলে চলবে না; উপযুক্ত পরিবেশের অভাব ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির কারণেও তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আমরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছি এবং সন্ধ্যার পর চায়ের দোকান বা আড্ডা দেওয়ার স্থানগুলোতে নজরদারি জোরদার করেছি। এছাড়া, খুব শিগগিরই ঢাকা জেলাজুড়ে কিশোরদের সুপথে ফেরানো ও গ্যাং কালচার নির্মূলে একটি বিশেষ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজনেস ডাইজেস্ট: ঢাকায় নারীদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশের কাছে সবচেয়ে বেশি কী ধরনের অভিযোগ বা মামলা আসে?

শামীমা পারভীন: অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেকেই প্রথমে মেয়ে নিখোঁজ বা অপহরণের অভিযোগ নিয়ে আসেন। তবে, তদন্তে নেমে প্রায়ই দেখা যায়— অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অল্পবয়সী কোনো কিশোরী পরিবারকে না জানিয়ে সহপাঠী কিংবা স্থানীয় পরিচিত কারও সঙ্গে চলে গেছে, যার বেশির ভাগই মূলত প্রেমঘটিত। পরবর্তী সময়ে দুই পরিবার নিজেদের মধ্যে আপসে পৌঁছালে পুলিশকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমি অভিভাবকদের অনুরোধ করব— সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিন এবং তাদের আবেগ-অনুভূতির খেয়াল রাখুন।

এর বাইরে নারীদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে পারিবারিক সহিংসতা (ডমেস্টিক ভায়োলেন্স), বিশেষ করে মাদকাসক্ত স্বামীর নির্যাতন কিংবা যৌতুকসংক্রান্ত নির্যাতনের মামলাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি আসে।

বিজনেস ডাইজেস্ট: সাইবার অপরাধ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রায়ই বোঝে না কোথায় গিয়ে অভিযোগ জানাবে। পুলিশের সাইবার সেবা কতটা সহজলভ্য এবং সাধারণের জন্য এই সেবা সহজ করতে নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি?

শামীমা পারভীন: সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা রিপোর্টিং তুলনামূলকভাবে কম হয়। ডিজিটাল অপরাধের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট অনেক সময় অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় সঠিক সাক্ষ্য-প্রমাণ (এভিডেন্স) সংগ্রহ এবং অপরাধী শনাক্ত করতে বিশেষ প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হয়, যার কিছুটা ঘাটতি এতদিন পুলিশ বাহিনীতে ছিল।

সম্প্রতি পুলিশ সপ্তাহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত ‘সাইবার ইউনিট’ গঠন করা হবে। ইতোমধ্যে এটি পাসও হয়েছে। প্রতিটি মেট্রোপলিটন ও জেলা পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট উইং কাজ করবে। বর্তমানেও প্রতিটি থানায় সাইবার টিম কাজ করছে। তবে, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে সফলতার হার কিছুটা কম। এছাড়া, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের তরুণদের অসচেতনতাও একটি বড় কারণ। তাই পুলিশি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে, যাতে তারা কোনো ধরনের প্রতারণা বা অপরাধের শিকার না হন।

বিজনেস ডাইজেস্ট: সাইবার অপরাধের মামলাগুলোতে প্রায়ই দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে অপরাধ দমনে যুক্ত পুলিশ সদস্যদের জন্য আরও বড় পরিসরে ও উচ্চতর প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন কি?

শামীমা পারভীন: অবশ্যই, প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে জাতিসংঘ (ইউএন) বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় ছোট পরিসরে কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, তবে তা চাহিদার তুলনায় সীমিত। পর্যাপ্ত দক্ষতা ও উন্নত প্রশিক্ষণ ছাড়া সাইবার অপরাধের জটিল তদন্ত দক্ষতার সঙ্গে শেষ করা কঠিন। পুলিশে এ সংক্রান্ত জনবল ও লজিস্টিকসের ঘাটতি দীর্ঘদিনের। সেই বাস্তবতায় আলাদা ‘সাইবার ইউনিট’ গঠন করা হচ্ছে।

বিজনেস ডাইজেস্ট: দেখা যায়, সাইবার বা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কোনো কর্মকর্তা অন্য কোনো সাধারণ ইউনিটে বদলি হয়ে গেলে দক্ষ জনবল অপচয়ের একটি নতুন সংকট তৈরি হয়। এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

শামীমা পারভীন: আপনার পর্যবেক্ষণ যথার্থ। আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে ‘কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এর ওপর দুই বছরের স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) শেষ করেছি; এ বিষয়ে আমার গবেষণা ও প্রকাশনাও (পাবলিকেশন) রয়েছে। অথচ বর্তমানে আমি ঢাকা জেলায় সাধারণ পুলিশিংয়ের কাজ করছি।

আমার মতো অনেক পুলিশ কর্মকর্তা আছেন, যারা সাইবার ক্রাইম বা কাউন্টার টেররিজমের ওপর উচ্চতর পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। এখন সাইবার অপরাধ বিষয়ে বিশেষ দক্ষ কোনো কর্মকর্তাকে যদি এপিবিএন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন) বা ভিন্ন কোনো ইউনিটে পদায়ন করা হয়, তাহলে তো লাভ হলো না। তাই আমাদের নীতি-নির্ধারকদের এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ‘রাইট পারসন ইন দ্য রাইট প্লেস’ নীতি নিশ্চিত করা যায়। এতে জনগণ পুলিশের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ও মানসম্মত সেবা পাবে।

বিজনেস ডাইজেস্ট: সম্প্রতি কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনার পর তিনি পুলিশিং ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতার কথা প্রকাশ করেছেন। আমজনতার মধ্যেও এমন অভিযোগ শোনা যায়। পুলিশের প্রতি মানুষের এই আস্থা হারানোর সংকটকে কীভাবে দেখছেন?

শামীমা পারভীন: কাজের ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি ও কাঠামোগত ঘাটতি যে পুলিশ বাহিনীতে রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিগত ১৭-১৮ বছরে পুলিশকে যেভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং অনৈতিক আদেশ মানতে বাধ্য করা হয়েছে, তার ফলশ্রুতিতেই সাধারণ মানুষের মনে অনাস্থা ও অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে। রাতারাতি এটি দূর করা সম্ভব নয়।

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশকে জীবন দিয়ে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এটি থেকে আমরা বড় ধরনের শিক্ষা নিয়েছি। বর্তমান সরকার পুলিশকে সম্পূর্ণ পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে স্বাধীনভাবে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি স্যার এবং আমরা— সবাই মিলে জনগণের সেই হারানো আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

বিজনেস ডাইজেস্ট: ৫ আগস্টের আগের ও পরের পুলিশিং ব্যবস্থার মধ্যে আপনি কী ধরনের তফাত বা পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?

শামীমা পারভীন: আমি বলব— বিস্তর তফাত রয়েছে। আগে পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে বা ঢাকার পুলিশ সুপার পদের যে ক্ষমতার দাপট ও ভীতি প্রদর্শনের মানসিকতা ছিল, সেখান থেকে আমরা পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছি। এখন পুলিশ কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে বা রুট লেভেলে গিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। এখন যারা নেতৃত্বে রয়েছেন, তাদের মধ্যে সেই অহমিকা বা দাপট দেখানোর চর্চাটা নেই।

অবশ্য আগের সবাই যে খারাপ ছিলেন, তা নয়। হয়তো তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারের চাপে পড়ে অনেক কর্মকর্তা বাধ্য হয়ে কাজ করেছেন। তবে, বর্তমান সরকার কাজের ক্ষেত্রে পূর্ণ পেশাদার স্বাধীনতা দেওয়ায় আমরা একটি মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছি। আমরা এ-ও সচেতনভাবে মাথায় রাখছি, যদি কোনো ভুল করি তবে আবারও সেই পুরোনো অনাস্থার জায়গাতেই ফিরে যেতে হবে। তাই পরম দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

বিজনেস ডাইজেস্ট: সম্প্রতি পুলিশের অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বাহিনীতে যোগদানের সময় রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থেকেই তিনি আসেন, তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক বৃত্তে জড়িয়ে পড়েন কিংবা পেশাগত বঞ্চনার শিকার হন। এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনা কতটা জরুরি বলে মনে করেন?

শামীমা পারভীন: বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে অ্যাড্রেস করা প্রয়োজন। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই সবাই পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। কিন্তু পরবর্তীতে দীর্ঘদিনের চলমান শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোর চাপে পড়ে অনেককে বাধ্য হয়ে আদেশ পালন করতে হয়— এটি বাস্তবতা।

তবে, চাপ ছাড়াও অনেকের মধ্যে ব্যক্তিগত লোভ-লালসা, অনৈতিক সুবিধা বা কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং পাওয়ার উদ্দেশ্যে স্বপ্রণোদিত হয়ে অবৈধ ও অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়, যা আমি কোনোভাবেই সমর্থন করি না।

একজন কর্মকর্তা যদি রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থেকে অন্যায্য আদেশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান ও পেশাদারত্ব বজায় রাখেন, তবে সর্বোচ্চ তাকে হয়তো কোনো নন-অপারেশনাল বা কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হতে পারে; কিন্তু এতে তার চাকরি চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না।

তাই ব্যক্তিগত ও পেশাগত স্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ হওয়া জরুরি।

বিজনেস ডাইজেস্ট: আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পুলিশিং ব্যবস্থায় তিনটি বড় পরিবর্তন আনতে বলা হলে কোন বিষয়গুলোকে আপনি অগ্রাধিকার দেবেন? আর ঢাকা জেলায় আপনার দায়িত্বকাল শেষে কেমন পুলিশিং ব্যবস্থা রেখে যেতে চান?

শামীমা পারভীন: পাঁচ বছরের অগ্রাধিকারের কথা বললে— প্রথমত, থানা পর্যায়ে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা। যেকোনো সাধারণ মানুষ সংক্ষুব্ধ বা ভুক্তভোগী হলে তিনি যেন মনে করেন— থানা এমন একটি জায়গা, যেখানে গেলে তিনি সঠিক প্রতিকার পাবেন। তার সেবায় একজন প্রতিনিধি অপেক্ষা করছেন। থানাগুলোতে সার্ভিস ডেলিভারির এই মান নিশ্চিত করাই হবে প্রথম কাজ।

“আমার মতো অনেক পুলিশ কর্মকর্তা আছেন, যারা সাইবার ক্রাইম বা কাউন্টার টেররিজমের ওপর উচ্চতর পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। এখন সাইবার অপরাধ বিষয়ে বিশেষ দক্ষ কোনো কর্মকর্তাকে যদি ভিন্ন কোনো ইউনিটে পদায়ন করা হয়, তাহলে লাভ হলো না। আমাদের নীতি-নির্ধারকদের খেয়াল রাখতে হবে— যে বিষয়ে যে কর্মকর্তা দক্ষ, তাকে ‘Right person in the right place’ অনুযায়ী দায়িত্ব দিতে হবে।”
শামীমা পারভীন, পুলিশ সুপার (এসপি), ঢাকা
দ্বিতীয়ত, মাত্র আড়াই লাখ পুলিশ সদস্য দিয়ে এত বিশাল জনগোষ্ঠীর মন জয় করা সম্ভব নয়। তাই ‘কমিউনিটি পুলিশিং’-এর মাধ্যমে অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে সাধারণ জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বহু গুণে বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক প্রভাব ও হস্তক্ষেপমুক্ত একটি স্বাধীন ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা। এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক আমূল পরিবর্তন রাতারাতি বা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে অর্জন করা সম্ভব নয়; এর জন্য দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।

আর ঢাকা জেলায় মেয়াদ শেষে আমি এমন একটি পুলিশিং ব্যবস্থা রেখে যেতে চাই, যেখানে জনগণ ও পুলিশ মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। মানুষ রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন এবং সন্তানদের নিরাপদে চলাফেরা নিয়ে অভিভাবকদের কোনো সংশয় থাকবে না। অপরাধকে মানুষ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা হিসেবে দেখবে, কোনো নিত্যদিনের বাস্তবতা হিসেবে নয়।

বিজনেস ডাইজেস্ট: এই প্রায় পাঁচ মাসে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে আপনার দায়িত্ব পালনে সবচেয়ে বড় আত্মতৃপ্তির জায়গা কোনটি?

শামীমা পারভীন: আমি খুব বড় বড় অর্জনের কথা বলতে চাই না। তবে দিন-রাত যেকোনো সময়ে, এমনকি গভীর রাতেও সাধারণ মানুষের ফোন রিসিভ করেছি এবং মাঠপর্যায়ে সরাসরি গিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়েছি। গত পাঁচ মাসে ঢাকা জেলায় বড় কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, দখলদারি কিংবা জমি দখলের মতো বড় চাঞ্চল্যকর অপরাধ ঘটেনি— এটি নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তির বিষয়।

তবে, আমার সবচেয়ে বড় আত্মতৃপ্তি হলো— একজন নারী পুলিশ সুপারের কাছে গেলে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে, মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারা। আমার দরজা সবার জন্যই উন্মুক্ত। শুধু ঢাকা নয়, দেশের দূরদূরান্ত— এমনকি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও সাধারণ মানুষ কল করে বলেছেন, ‘আপা, আপনাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে ভরসা পেয়েছি; বিশ্বাস করি আপনার সাহায্য পাব।’

মানুষের কাছে এই বার্তাটি পৌঁছাতে পেরেছে যে, ঢাকা জেলার নারী এসপির কাছে কোনোভাবে পৌঁছাতে পারলে সমাধানের একটি পথ অবশ্যই বের হবে। এই আশা নিয়ে অনেকে আমার কার্যালয়ে সরাসরিও আসেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও আন্তরিকতা ও সঠিক চেষ্টার মাধ্যমেই আমি এই আস্থার জায়গা তৈরি করতে পেরেছি। সাধারণ মানুষের এমন অকৃত্রিম বিশ্বাস স্পর্শ করতে পারার চেয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তার জন্য বড় অর্জন আর কী হতে পারে!

বিজনেস ডাইজেস্ট: মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

শামীমা পারভীন: আপনাকেও ধন্যবাদ। বিজনেস ডাইজেস্টের জন্য রইল শুভকামনা।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর