সবে মাত্র আমাদের আকদ সম্পন্ন হয়েছে। নতুন সম্পর্কের স্নিগ্ধ আবেশ তখনও মনজুড়ে। বরের পক্ষ থেকে যতই দাওয়াত আসুক না কেন, নতুন বউয়ের মনে একটু-আধটু লাজুকতা তো থাকেই। আকদের ঠিক এক সপ্তাহ পর তিনি হঠাৎ বললেন, ‘একজন পিটিআই ম্যাম শামীমা সুলতানা (সহকারী সুপারিন্টেন্ডেন্ট) চট্টগ্রাম পিটিআই তোমাকে দেখতে চেয়েছেন। তিনি আমাদের দাওয়াত করেছেন, তোমার যেতেই হবে।’
আমি এক কথায় রাজি হইনি। শুধু একবার নয়, বারবার বলেছি, ‘আমি যাব না, আমার খুব লজ্জা লাগে।’ এমনকি বের হওয়ার আগ মুহূর্তেও একই কথা বলেছিলাম। কিন্তু তিনি আমার না কে কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নন। মৃদু হেসে শুধু বললেন, ‘একবার গিয়ে তো দেখো।’ শেষ পর্যন্ত তার ইচ্ছার কাছে নিজের সংকোচকে হার মানিয়ে রওনা হলাম।
কোতোয়ালি হয়ে চৌধুরী রোড পেরিয়ে পৌঁছালাম সেই কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায়। তবে তাকে শুধু ‘ম্যাম’ বলে পরিচয় করিয়ে দিলে যেন তার প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন ঠিক একজন মায়ের মতো। দরজা খুলেই এমন আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন, যেন বহুদিনের পরিচিত কেউ ফিরে এসেছে। আমাকে ‘বউমা’ বলে সম্বোধন করলেন। সেই একটি শব্দেই হৃদয়ের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এলো।
এরপর তিনি অত্যন্ত স্নেহভরে তার স্বামীর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন ‘ইনি মিসেস (….)’। কথাটি শুনেই বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন যেন আলোড়ন উঠল। এই প্রথম সত্যিকার অর্থে অনুভব করলাম আমি এখন সত্যিই কারও মিসেস, কারও জীবনসঙ্গিনী।
আঙ্কেলও ভীষণ অমায়িক মানুষ (ড. খাস্তগীর, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক)। আর আন্টি তো আমাদের কাছে পেয়ে যেন ভীষণ আনন্দিত। আমার সঙ্গে এমন স্বাভাবিকভাবে গল্প করছিলেন, মনে হচ্ছিল আমাদের পরিচয় আজকের নয়, বহু বছরের। অথচ বাস্তবতা হলো, এটাই ছিল প্রথম দেখা। এরই মাঝে এলেন আন্টির ভাগ্নে ও তার স্ত্রী। তাদের সঙ্গেও পরিচয় হলো। কী অসাধারণ আন্তরিকতা! অল্প সময়ের মধ্যেই এমন আপন করে নিলেন যে কোথাও একটুও অচেনা লাগেনি।
কিছুক্ষণ পর ডিনারের আয়োজন হলো। টেবিলজুড়ে সাজানো নানা রকম সুস্বাদু খাবার, আর অবাক হয়ে দেখলাম আমার পছন্দের প্রায় সব পদই সেখানে রয়েছে। আন্টি নিজের হাতে একে একে প্রতিটি রেসিপি আমার প্লেটে তুলে দিচ্ছিলেন। সেই যত্নে যেন মায়ের স্পর্শ মিশে ছিল। তৃপ্তি ভরে খাচ্ছিলাম।
শেষে একটি পদ আর খাব না ভেবেছিলাম। কিন্তু সবাই যখন এত তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছিল, তখন নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। এক চামচ মুখে দিতেই মনে হলো এ যেন অমৃত! বিশেষ করে আমের চাটনির ডাল এতটা সুস্বাদু যে তার স্বাদ যেন আজও জিহ্বায় লেগে আছে। খাওয়া শেষ হলেও গল্প শেষ হলো না। আরও কিছুক্ষণ গল্প করতে করতে একে অপরকে আরও একটু চিনে নিলাম। তারপর মিষ্টি দই দিয়ে শেষ হলো আপ্যায়নের পর্ব।
এরপর সবাই মিলে একই ফ্রেমে বন্দি করলাম স্মৃতিগুলো। তখন আন্টি হেসে বললেন, ‘চলো, এবার তোমাদের কাপল ছবি তুলি।’ এক রুম থেকে আরেক রুম, তারপর ফুলে সাজানো বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোলা হলো কত সুন্দর সুন্দর ছবি। নতুন জীবনের শুরুতে এমন সুন্দর মুহূর্ত সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর আন্টি আমাদের বারান্দায় নিয়ে গিয়ে কর্ণফুলী নদীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখাচ্ছিলেন। বৃষ্টিভেজা রাত, নদীর বুক ছুঁয়ে আসা শীতল বাতাস, আর প্রিয় মানুষগুলোর সান্নিধ্য সব মিলিয়ে মুহূর্তটি যেন কোনো গল্পের দৃশ্য হয়ে উঠেছিল। গল্প করতে করতে কখন যে রাত ১১টা পেরিয়ে ১২টা বেজে গেল, তা বুঝতেই পারিনি। মনে হচ্ছিল, আজ শুধু একটি দাওয়াতে আসিনি; বরং একটি সুন্দর সম্পর্কের জন্ম হতে দেখলাম। পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে যেন এক অদৃশ্য আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি হয়ে গেল।
কিন্তু প্রতিটি সুন্দর মুহূর্তেরই যেমন শেষ আছে, তেমনি ঘনিয়ে এলো বিদায়ের ক্ষণ। মন একেবারেই চাইছিল না চলে আসতে। তবু না চাইলেও বিদায় জানাতে হলো। ফিরে আসার পথে বারবার মনে হচ্ছিল, জীবনে কিছু কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় খুব অল্প সময়ের জন্য, অথচ তারা হৃদয়ে স্থায়ী ঠিকানা করে নেয়। এই সন্ধ্যাটা আমার কাছে তেমনই এক অনন্য স্মৃতি, ভালোবাসা, আন্তরিকতা, সম্মান আর আপন করে নেওয়ার এক নির্মল অনুভূতি।
আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা, আমাদের যুগল জীবনের প্রতিটি দিন এমন সুন্দর মানুষ, এমন আন্তরিক সম্পর্ক আর এমন অমূল্য মুহূর্তে ভরে উঠুক বারবার।
লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ।