1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৪০ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় : ৪ বিষয়ে শিক্ষক সংকট বেশি, শিখনে ঘাটতি পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে দুর্নীতি : ঢাকা ওয়াসার গচ্চা ১৫৬২ কোটি টাকা যশোরে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের প্রাসাদ থেকে অল্প দূরে আছড়ে পড়ল বিমান, ৯ জন নিহত শিক্ষকদের পে-স্কেল বাস্তবায়নে ৩২৬৭ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি ৪০ হাজার বেতনে চাকরি দেবে রকমারি.কম, থাকছে যেসব সুবিধা পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে শাবনূর

ব্রহ্মপুত্র পাড়ে জয়নুল উদ্যান যেন নগরবাসীর এক স্বস্তির ঠিকানা

জেলা প্রতিনিধি | ময়মনসিংহ |
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৯ বার পঠিত

ময়মনসিংহ নগরীর ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে গেলেই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। কোলাহল, যানজট আর ব্যস্ততার বদলে চোখে পড়ে সারি সারি গাছ, খোলা আকাশ আর ব্রহ্মপুত্রের শান্ত জলধারা। নদীর পাড় ঘেঁষে থাকা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জয়নুল উদ্যান যেন নগরবাসীর জন্য স্বস্তির এক টুকরো জায়গা।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে মানুষের আনাগোনা। কেউ আসেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। কেউ নদীর পাড়ে বসে সময় কাটান, কেউ শিশুদের নিয়ে ঘুরে বেড়ান। বিকেল গড়ালে বাড়তে থাকে ভিড়। শুক্র ও শনিবারের ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের এই সবুজ পরিবেশকে অনেকেই ময়মনসিংহ নগরীর ফুসফুস বলে মনে করেন। ব্যস্ত নগরজীবনে একটু নির্মল বাতাস, প্রকৃতির সান্নিধ্য আর খোলা জায়গার খোঁজে প্রতিদিনই এখানে ছুটে আসেন নানা বয়সি মানুষ। শুধু ময়মনসিংহ নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পর্যটকদেরও দেখা যায় জয়নুল উদ্যান ও সংগ্রহশালা এলাকায়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা সংলগ্ন পার্কের প্রায় এক কিলোমিটার জায়গাকে জয়নুল উদ্যান হিসেবে সাজিয়েছে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্কদের বিনোদনের জন্য এখানে রয়েছে দোলনা, ম্যাজিক নৌকা, ফোয়ারাসহ বিভিন্ন আয়োজন। পার্কের বাইরে রয়েছে নাগরদোলা, চরকি ও ঘোড়ার গাড়ি। ফলে এক জায়গাতেই প্রকৃতি, নদী, ইতিহাস ও বিনোদনের স্বাদ পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।

উদ্যানের অন্যতম আকর্ষণ ব্রহ্মপুত্র নদ। পার্কের একাধিক ঘাটে সারি দিয়ে রাখা হয়েছে বাহারি রঙের পালতোলা নৌকা। নির্ধারিত ভাড়ায় এসব নৌকায় উঠে ব্রহ্মপুত্রের বুকে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ রয়েছে। নদীর মাঝখানে গিয়ে পেছনে তাকালে দেখা যায় সবুজে ঘেরা উদ্যান, তখন নগরের ব্যস্ততা যেন অনেক দূরের কোনো বিষয় মনে হয়।

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে রয়েছে নদীমুখী টাইলস বসানো বসার জায়গা। সেখানে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে সময় কাটান অনেকেই। পাশাপাশি রয়েছে নামাজখানা, বৈশাখী মঞ্চ, ভাষাসৈনিক মোস্তফা মতিন পাঠাগার ও টয়লেটসহ বিভিন্ন সুবিধা।

ভেতরে-বাইরে রয়েছে চটপটি, ফুচকা, চা-কফি ও ফাস্টফুডের দোকান। শিশুদের খেলনা ও বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে বসেন অনেক হকারও। ফলে একদিকে যেমন দর্শনার্থীদের প্রয়োজনীয় কিছু সুবিধা মিলছে, অন্যদিকে এসব দোকান ও চেয়ার-টেবিল নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা।

পার্কের বিভিন্ন স্থানে সারি সারি প্লাস্টিকের চেয়ার দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব চেয়ার খাবারের দোকানকে ঘিরে রাখা হয়েছে। ফলে প্রকৃতির পরিবেশ উপভোগ করতে আসা দর্শনার্থীদের হাঁটাচলায় বাধা তৈরি হচ্ছে। খাবারের দোকানের ধোঁয়া ও ঝাঁঝালো গন্ধেও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু জায়গায় দোকানপাট ও আড্ডার কারণে পরিবেশের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে নারী দর্শনার্থীরা বিভিন্ন সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করেছেন।

সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, ব্রহ্মপুত্র পাড়ের এই পার্কটি নগরবাসীর বিনোদনের অন্যতম প্রধান জায়গা। দীর্ঘদিন পর জায়গাটিকে নতুনভাবে সাজানোয় মানুষ স্বস্তি পেয়েছে। তবে পার্কের জায়গা যেন কোনোভাবেই অব্যবস্থাপনা বা দোকানপাটের দখলে না যায়, সেদিকে কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।

তিনি বলেন, নগরবাসীর জন্য বিনোদনের জায়গা খুব বেশি নেই। তাই কোনো কারণ বা অজুহাতে পার্কের জায়গা বন্ধ বা সংকুচিত করা উচিত নয়। বরং সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা করে এটিকে আরও আকর্ষণীয় করা দরকার।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন জানান, নগরবাসী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য নির্মল পরিবেশ নিশ্চিত করতেই জয়নুল উদ্যানকে সাজানো হয়েছে। মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি ঐতিহ্য ও প্রকৃতির সৌন্দর্য ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি রয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পোশাক ও সাদা পোশাকে পুরো এলাকায় নজরদারি করেন। নিরাপত্তার কারণে সন্ধ্যার পর পার্ক এলাকায় অবস্থানের অনুমতি নেই।

চরপাড়া এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা হামিদুল ইসলাম বলেন, জয়নুল উদ্যানের পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্রের বুকে পালতোলা নৌকায় ঘোরার অভিজ্ঞতা আলাদা।

তিনি বলেন, শহরের মধ্যে এমন একটি জায়গা থাকা সত্যিই ভালো লাগার বিষয়। শিশুদের নিয়ে সময় কাটানো যায়, আবার নদীর পাড়ে বসেও প্রকৃতি উপভোগ করা যায়। পাশেই জয়নুল আবেদিনের সংগ্রহশালা। নতুন প্রজন্মের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু বিনোদন নয়, জয়নুল উদ্যানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ময়মনসিংহের ইতিহাস ও শিল্প-ঐতিহ্য। ব্রিটিশ শাসনামলে এই এলাকার একটি অংশ পরিচিত ছিল উমেদ আলী পার্ক নামে। কাছেই ছিল কালেক্টরেটে কর্মরত ইংরেজ কর্মকর্তাদের বাসভবন। সেখান থেকেই এলাকাটি সাহেব কোয়ার্টার নামে পরিচিতি পায়।

ময়মনসিংহ নগরীর জিরো পয়েন্ট থেকে ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমমুখী সড়ক ধরে প্রায় তিন কিলোমিটার গেলে কাচিঝুলি এলাকা। কাচারি ঘাট থেকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা পর্যন্ত নদীর পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে পার্ক ও উদ্যান।

এই নদীর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের। ব্রহ্মপুত্রের বুকে পালতোলা নৌকা, মাঝির গুণ টানা, চরের মানুষের জীবন-জীবিকা, নদী পারাপারের দৃশ্যসহ অসংখ্য ছবি এঁকেছেন তিনি। নদীর পাড়ে বসেই তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও প্রকৃতির নানা রূপ।

তাই জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা শুধু একটি জাদুঘর নয়, ময়মনসিংহের শিল্প-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। সংগ্রহশালায় রয়েছে শিল্পাচার্যের আঁকা ছবি, ছবি আঁকার সরঞ্জাম ও ব্যবহার্য বিভিন্ন সামগ্রী। সংগ্রহশালাকে ঘিরে থাকা উদ্যান সেই ঐতিহ্যকে প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছে।

ময়মনসিংহকে সিটি অব আর্ট অ্যান্ড কালচার বা শিল্প-সাহিত্যের নগরী হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস। সেই ইতিহাসের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ব্রহ্মপুত্র। নদীর পাড়ে বসেই একসময় শিল্পীরা ছবি এঁকেছেন, সাহিত্যিকরা আড্ডা দিয়েছেন, সাংস্কৃতিক কর্মীরা সংগঠিত হয়েছেন। এখনো তরুণদের অনেকেই শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য নদীর পাড়ে জড়ো হন।

ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় ব্রহ্মপুত্র পাড়ের সৌন্দর্যও। বর্ষায় নদী যখন পানিতে ভরে ওঠে, তখন এক রূপ। শরতে কাশফুল আর নীল আকাশে অন্য রূপ। হেমন্তে নদীর বুকজুড়ে বালুচর, হালকা কুয়াশা আর নরম রোদে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। শীতে চায়ের দোকানে বসে গল্প করেন অনেকে। বসন্তে গাছের পাতাঝরা আর নতুন পাতার সৌন্দর্য টানে দর্শনার্থীদের।

সূর্যোদয়ের আগেই জেগে ওঠে উদ্যান। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ হাঁটতে আসেন। সকাল গড়িয়ে দুপুরে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা বাড়ে। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নানা বয়সি মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ছুটির দিনে সেই ভিড় আরও বেড়ে যায়।

তবে সৌন্দর্য ও বিনোদনের এই আয়োজন টেকসই করতে হলে ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা প্রয়োজন বলে মনে করছেন দর্শনার্থী ও নাগরিক নেতারা। দোকানপাটের নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিকের চেয়ার সরানো, পরিচ্ছন্নতা, খাবারের মান, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং নদীর পাড়ের পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ চান তারা।

শহরের রেলওয়ে স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশায় সহজেই যাওয়া যায় জয়নুল উদ্যান ও সংগ্রহশালায়। তাই সময় পেলেই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এখানে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে কয়েক ঘণ্টা কাটাতে, শিল্পাচার্যের স্মৃতি দেখতে কিংবা শুধু ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বসে স্বস্তির নিশ্বাস নিতে।

নগরায়নের চাপ যত বাড়ছে, ততই প্রয়োজন হচ্ছে এমন খোলা ও সবুজ জায়গার। জয়নুল উদ্যান সেই প্রয়োজনেরই একটি উত্তর। এখন এই উদ্যানের সৌন্দর্য, পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর ভূমিকা নেয়, সেটিই দেখার বিষয়। ময়মনসিংহবাসীর প্রত্যাশা, ব্রহ্মপুত্র পাড়ের এই সবুজ ঠিকানা যেন কোনোভাবেই অনিয়ন্ত্রিত দোকানপাট, দখল কিংবা অব্যবস্থাপনার কারণে তার স্বকীয়তা না হারায়।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর