ফরিদপুরের জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখা থেকে প্রায় এক কোটি টাকা লুটের ঘটনায় ১৬ বছর আগে নিরাপত্তাপ্রহরী পরেশ চন্দ্র দাসকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে হাইকোর্ট তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করলেও সেই রায়ের সাক্ষী হতে পারেননি তিনি। অর্থকষ্ট, সামাজিক অপমান আর মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে বেড়াতেই ২০২৪ সালে মারা যান পরেশ। আজ আদালতে সম্মান ফিরেছে, কিন্তু ফিরে আসেনি হারিয়ে যাওয়া ১৬ বছরের জীবন।
পরিবার ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর শহরের চরকমলাপুর এলাকার বাসিন্দা পরেশ চন্দ্র দাস ছিলেন জনতা ব্যাংক ফরিদপুর করপোরেট শাখার নিরাপত্তাপ্রহরী। ২০১০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকের ভল্ট থেকে ৯৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯০ টাকা চুরির ঘটনা ঘটে। পরদিন তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। সেই মামলায় অভিযুক্ত করা হয় পরেশ চন্দ্র দাসকে।
মামলার পর থেকেই বদলে যায় তার পরিবারের জীবন। মামলা চালাতে গিয়ে জমিজমা বিক্রি, ধার-দেনা আর আর্থিক সংকটে পড়ে পরিবারটি। সামাজিকভাবে নানা অপমান ও অবহেলারও শিকার হতে হয় তাদের।
২০২০ সালে নিম্ন আদালত পরেশকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন। পরে ২০২৩ সালে দায়রা আদালত সাজা কমিয়ে দুই বছর করেন। তবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে হাইকোর্টে আপিল করেন তিনি। অবশেষে ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে তাকে সম্পূর্ণ খালাস দেন। কিন্তু তার ছয় মাস আগেই, ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন পরেশ।
শুধু ফৌজদারি মামলাই নয়, চুরি হওয়া টাকা উদ্ধারের দাবিতে ২০১৩ সালে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলাও করে। ২০১৬ সালে আদালত সেই মামলা খারিজ করে ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১০ হাজার টাকা খরচ ধার্য করেন। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে আপিল করলে ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সেটিও খারিজ হয়ে যায়। একই সঙ্গে অযথা হয়রানির জন্য পরেশের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, আইনের চোখে ন্যায়বিচার মিললেও জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় তারা হারিয়েছেন। মামলার কারণে পরেশের মৃত্যু পর্যন্ত পরিবারকে চরম অর্থকষ্ট, সামাজিক লাঞ্ছনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে।
পরেশ চন্দ্র দাসের ভাই সুরেশ চন্দ্র দাস বলেন, মামলা চালাতে গিয়ে এক রকম নিঃস্ব এ পরিবার। নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ভাই তা দেখে যেতে পারেনি। অনেক কষ্ট করে সংসার চলছে তাদের। মামলা চলাকালীন ক্ষতিপূরণ ও প্রাপ্য অধিকার দাবি জানাই সরকারের কাছে।
পরেশ চন্দ্র দাসের ছেলের বউ অনীতা রানী দাস জাগো নিউজকে বলেন, বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে এসে এসব কারণে অনেক কষ্ট করেছি। অন্যের বাড়ি কাজ করতে হয়েছে, নিজের সন্তানের দুধটুকু কেনার জন্য অর্থ কষ্টে ভুগেছি আমরা। মানুষের কাছে অনেক লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। অনেকেই আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সামাজিক ও মানসিকভাবে ছোট হয়েছি। এখনও অনেকটা অসহায় ও কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
পরেশ দাসের বড় ছেলে প্রনব দাস বলেন, আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে বাবাসহ আমাদের পরিবারকে অনেক ভোগান্তি ও হয়রানি পোহাতে হয়েছে। সামাজিকভাবেও হেয় হতে হয়েছে। বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, তবে তিনি রায়টা দেখে যেতে পারেননি, যা আমাদের কষ্ট দেয়। বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় তার চাকরি পরবর্তী প্রাপ্য সুবিধা আমাদের পরিবারকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করবে, এবং ক্ষতিপূরণ পাবে এটাই প্রত্যাশা।
পরেশ দাসের স্ত্রী রীতা রানী দাস জাগো নিউজকে বলেন, মামলার পর থেকে নানা দুঃখ দুর্দশার মধ্যে দিয়ে আমার সময় পার হয়েছে। মামলা চালাতে গিয়ে আমরা অনেক ধার-দেনার মধ্যে ডুবে আছি। সম্পদ বলতে স্বামীর রেখে যাওয়া মাত্র ছয় শতক জমি ছাড়া কিছুই নেই। স্বামী চলে গেছে, সন্তানকে হারাতে চাই না। জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও সরকার দ্রুত আমাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ফিরিয়ে দিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াবে এমনটাই প্রত্যাশা।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.