সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় হলো তার পরিবার, আর প্রথম শিক্ষক মা-বাবা। শিশু জন্মের পর থেকেই তার চারপাশের পরিবেশ, বিশেষ করে বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের আচরণ দেখে শিখতে শুরু করে। বলা হয়ে থাকে,‘শিশুকে মানুষ করার আগে নিজেকে মানুষ করতে হয়’। কারণ শিশু তার পরিবারের লোকজনের অভ্যাস, চালচলন ও আচার-ব্যবহার অনুকরণ করেই বেড়ে ওঠে।
শিশুর প্রথম পাঠ ও প্রাথমিক শিক্ষা:
শিশুর শেখার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় খুব ছোটবেলা থেকেই। মায়ের কোলে বা বাবার হাতে হাত রেখে চলা, কথা বলার চেষ্টা করা কিংবা হাঁটি হাঁটি পা পা করে হেঁটে যাওয়ার মাধ্যমেই তার শিক্ষার সূচনা। এরপর তাকে বর্ণমালা চেনানো, বই পড়তে শেখানো, ছবি আঁকা, গান কিংবা ছড়া শেখানোর মতো প্রাথমিক কাজগুলো ঘর থেকেই শুরু হয়।
পরবর্তীতে শিশু যখন একটু বড় হয়, তাকে আশেপাশের গাছপালা, নদী, পরিবেশ, পশুপাখি কিংবা আত্মীয়স্বজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। আধুনিক যুগে ডিজিটাল প্রযুক্তি যেমন-টিভি, কম্পিউটার বা সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমের ভালো দিকগুলোর সঠিক ব্যবহারও শিশু পরিবার থেকেই শেখে।
পারিবারিক শিক্ষার গভীর প্রভাব:
শুধু মুখে মুখে বা বই পড়ে শেখাটাই শিশুর সব শিক্ষা নয়, আচরণের মাধ্যমে যা শেখে তা-ই শিশুর মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। শিশুর ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের মূল ভিত্তি তৈরি হয় পরিবারে। পারিবারিক পরিবেশ শিশুর শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।
যেমন, সত্য বলা, সৎ থাকা, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা এবং পরোপকারী হওয়ার শিক্ষা শিশু ঘর থেকেই পায়। এছাড়া খাওয়ার নিয়ম, ঘুমানোর অভ্যাস, পোশাক পরা, পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় তাও শেখাতে হবে। এইসব শিষ্টাচার পরিবারই প্রথম শেখায়।
ডিজিটাল যুগে অভিভাবকত্বের চ্যালেঞ্জ:
বর্তমান প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্বে ঘরের শিক্ষার ধরন অনেকটাই বদলে গেছে। আজকাল অনেক ঘরেই শৈশবের স্থান দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন, টিভি বা ট্যাবের স্ক্রিন। অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতা শিশুর সামাজিক বিকাশ, কল্পনাশক্তি এবং মনস্তাত্ত্বিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
এখানেই অভিভাবকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা হয়তো সম্ভব নয়, তবে তার সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সন্তানকে স্ক্রিন থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে সহজ উপায়ের একটি হলো তাকে নিজের সময় দেওয়া। একসঙ্গে খেলাধুলা করা, গল্প করা, রান্নায় ছোটখাটো সাহায্য নেওয়া বা বই পড়ার মধ্য দিয়ে যে বন্ধন তৈরি হয়, তা কোনো ডিজিটাল ডিভাইস দিতে পারে না।
বিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আপনার সন্তানকে অক্ষর জ্ঞান দেবে, বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রি দেবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার সনদ দেবে। কিন্তু তাকে সৎ, দয়ালু, দায়িত্বশীল এবং মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কাজটি সম্পন্ন হয় ঘর থেকেই।
ঘরই হলো সেই জায়গা, যা শিশুর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ করে এবং তার চরিত্রকে সুন্দর রূপ দেয়। তাই শিশুর প্রথম বিদ্যালয় হিসেবে ঘরকে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও ইতিবাচক শেখার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই প্রতিটি পরিবারের প্রধান দায়িত্ব।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.