আকাশ মাহমুদ | আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একের পর এক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত পুনর্গঠন করা হয়েছে সাতটি ব্যাংকের পর্ষদ। এর মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দেশে পট পরিবর্তনের পর গত ২৮ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোরশেদ আলম চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এখন আওয়ামী লীগের আরেক নেতা আকরাম হোসেন হুমায়ুন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হওয়ার চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, আজ রোববার মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের বোর্ড রুমে গোপনে পর্ষদ সভা ডাকা হয়েছে। তবে এ সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নানকে। আব্দুল হান্নান বিএনপিপন্থি বলে জানা গেছে। আবার দেশের বাইরে থাকায় অন্যতম উদ্যোক্তা পরিচালক এম আমানুল্লাহ ও এএসএম ফিরোজ আলম আমন্ত্রণ পাননি। এর আগে গত ২৭ আগস্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় মোরশেদ আলম এবং বিদেশে অবস্থানরত এম আমানুল্লাহ ও এএসএম ফিরোজ আলম ভার্চুয়ালি অংশ নেন। সভায় ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান ও ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আকরাম হোসেন হুমায়ুন, ব্যাংকটির পরিচালক আব্দুল আউয়াল সুমন, স্বতন্ত্র পরিচালক ও যুবলীগ নেতা ড. গাজী মোহাম্মদ হাসান জামিলসহ কয়েকজন মোরশেদ আলমকে পদত্যাগের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।
বৈঠকে উপস্থিত দু’জন সদস্য বিজনেস ডাইজেস্টকে জানান, মোরশেদ আলমকে পদত্যাগ করানোর যুক্তি হিসেবে বলা হয়, তিনি আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন। এ সময়ে ব্যাংকের পর্ষদে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্ষদ পুনর্গঠন করে দেবে। যদিও কয়েকজন পরিচালক এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। এ নিয়ে বিভিন্ন কথা কাটাকাটির পর ২৮ আগস্ট মোরশেদ আলম পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। এর পর ব্যাংকটির পাঁচজন পরিচালক মিলে কয়েক দফা গোপনে বৈঠক করে নতুন পর্ষদ গঠনের উদ্যোগ নেন। এর অংশ হিসেবে আজ রোববার দুপুর সাড়ে ১২টায় ব্যাংকের বোর্ড রুমে আবার সভা ডাকা হয়েছে। এ বৈঠক থেকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান, ভাইসচেয়ারম্যানসহ পর্ষদের সব কমিটি পুনর্গঠন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী বিজনেস ডাইজেস্ট এর কাছে পর্ষদ বৈঠক ডাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান পদ থেকে মোরশেদ আলম পদত্যাগ করেছেন কিনা, রোববারের বৈঠকে জানা যাবে। ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান বিজনেস ডাইজেস্টকে বলেন, রোববার ব্যাংকের বোর্ড রুমে পর্ষদ সভা ডাকার কথা তিনিও শুনেছেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি।
মার্কেন্টাইল ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালে। ব্যাংকটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আবদুল জলিল। দীর্ঘদিন তিনি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর আগে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও ব্যাংকটির পরিচালনায় তেমন পরিবর্তন আসেনি। তবে এবার আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বেশ আগেই আবদুল জলিল পরিবার ব্যাংকটিতে প্রতিনিধিত্ব হারিয়েছে। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ আবদুল জলিল মারা যান। এর পর তাঁর নামে থাকা শেয়ার পরিবারের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। ফলে এককভাবে ২ শতাংশ শেয়ার না থাকায় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে জলিল পরিবারের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।
মার্কেন্টাইল ব্যাংক সারা দেশে ১৫২টি শাখা ও ৪২টি উপশাখা নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া ১৯৭টি এটিএম বুথ ও ১৮৭টি এজেন্ট আউটলেট রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে সাতটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করে দিয়েছে। এসব ব্যাংক হলো– ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, সোশ্যাল ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন, এক্সিম, ইউসিবি ও ন্যাশনাল ব্যাংক। এ ছাড়া কয়েকটি ব্যাংক নিজেদের মতো করে পর্ষদ পুনর্গঠন করে নিয়েছে। এরপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে যেসব ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম ও শৃংখলা ভঙ্গের তথ্য রয়েছে পর্যায়ক্রমে সেসব ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে দিচ্ছে।