১০ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’। শারীরিক সুস্থতা নিয়ে আমাদের সচেতনতা ও প্রস্তুতির শেষ না থাকলেও, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখনো থেকে গেছে অনেকটাই লোকচক্ষুর আড়ালে। বিশেষ করে আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যকে হেয় করে দেখা বা তা নিয়ে তৈরি হওয়া সামাজিক সংকোচ ও ট্যাবু আজও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। কিন্তু একটি সুস্থ, সচল ও গতিশীল সমাজ গঠনে মনোরোগ চিকিৎসা এবং আধুনিক মানস সেবার বিস্তার এখন সময়ের দাবি।
অবহেলার শিকার মানসিক স্বাস্থ্য:
পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি চারজনে অন্তত একজন মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে মানসিক সমস্যায় ভোগেন। তা সত্ত্বেও, মোট স্বাস্থ্য বাজেটের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ বরাদ্দ থাকে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে। শারীরিক ব্যাধির ক্ষেত্রে আমরা যেভাবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিই, ডিপ্রেশন (হতাশা) বা অ্যানজাইটির (দুশ্চিন্তা) ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না।
উল্টা মানসিকভাবে অসুস্থ কাউকে সরাসরি ‘পাগল’ বলে চিহ্নিত করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি অসুস্থ ব্যক্তিটিকে কেবল সমাজ থেকে একাই করে দেয় না, বরং তাকে ঠেলে দেয় চরম ঝুঁকির মুখে।
মনোরোগ চিকিৎসায় মনোযোগের গুরুত্ব:
মনোরোগ চিকিৎসা শুধু কয়েকটি ওষুধ খাওয়ার ওপর নির্ভর করে না; এটি এক দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, বোঝাপড়া ও কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া। এজন্য প্রধানত প্রয়োজন,পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ ও অবকাঠামো,দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল।
ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সাধারণ
হাসপাতালগুলোতে মানসিক চিকিৎসা সেবা দ্রুত সহজলভ্য করা সম্ভব, অন্যান্য সাধারণ শারীরিক পরীক্ষার মতো মানসিক স্বাস্থ্যের নিয়মিত পরীক্ষাকেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা উচিত। রোগী যেন কোনো সংকোচ বা ভয় ছাড়া তার মনের কথা প্রকাশ করতে পারেন, পরিবার থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত এমন এক সুরক্ষিত ও আন্তরিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
সন্তান জন্মের পর মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য:
আমাদের সমাজে একটি বড় ধরনের অবহেলার জায়গা হলো সন্তান জন্মের পর মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য। সন্তান প্রসবের পর হরমোনের দ্রুত পরিবর্তন, ঘুমহীনতা, শারীরিক দুর্বলতা এবং নতুন দায়িত্বের চাপে অনেক মা-ই মেজাজের তীব্র ওঠানামা, গভীর বিষণ্ণতা, অপরাধবোধ ও দুশ্চিন্তায় ভোগেন, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘পোস্টপার্টম ডিপ্রেশন’ বলা হয়।
এটি কোনো সাময়িক দুর্বলতা বা মা হিসেবে ব্যর্থতা নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাযোগ্য মানসিক সমস্যা। এ সময়ে পরিবার ও সমাজের সাপোর্ট এবং প্রয়োজনে সঠিক মানসিক চিকিৎসা না পেলে মা ও সদ্যজাত শিশুর জীবনই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মায়েদের এই সুনির্দিষ্ট মানসিক সংকট নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা ও পারিবারিক সহানুভূতি অত্যন্ত জরুরি।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও সামাজিক সচেতনতা
অন্যান্য শারীরিক ব্যাধির মতোই মানসিক রোগও যে সম্পূর্ণ চিকিৎসাযোগ্য-এই সত্যটি গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। শিশু, তরুণ ও নতুন মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া গেলে অনেক জটিলতা শুরুতেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ভবিষ্যতের পথচলা:
মনকে সুস্থ না রেখে শুধু শরীরকে সুস্থ রাখা অসম্ভব। তাই কেবল একদিন দিবস উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের নজর দিতে হবে টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের দিকে। মনোরোগ চিকিৎসায় পর্যাপ্ত সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, যথাযথ বাজেট বরাদ্দ এবং সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা নিশ্চিত করতে পারলেই ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’-এর মূল আহ্বান সার্থক হয়ে উঠবে।