‘তৎকালীন উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক নেতারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আশ্বাসের বাইরে আজ পর্যন্ত আমাদের কোনো দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। টাকা দিয়ে সন্তানদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিহতদের মর্যাদা দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, আহতদের পুনর্বাসন করা। আমরা আন্দোলন করতে চাই না, কিন্তু বারবার মনে হচ্ছে আন্দোলন না করলে যেন কেউ কথা শুনতেই চায় না।’
কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত নাজিয়া তাবাসসুম নিঝুম ও আরিয়ান আশরাফ নাফির বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আশরাফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘ঘটনার এক বছর পার হলেও নিহতদের কোনো পরিবারই রাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বা উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা পায়নি।’

ঠিক এক বছর আগে ২০২৫ সালের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ২৮ শিক্ষার্থী, ৩ জন শিক্ষক, ৩ জন অভিভাবক ও ১ জন আয়াসহ মোট ৩৫ জন নিহত হন। এছাড়া বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও মারা যান। দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন ৮০ জন। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলেন ৫৭ জন।
পেছনের ঘটনা
২০২৫ সালের ২১ জুলাই, দিনটি ছিল সোমবার। দুপুরে সোয়া ১টা নাগাদ উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের জঙ্গিবিমান বিধ্বস্ত হয়। মুহুর্তেই এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেখানে। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে যায় ছোট্টো শিশুদের কোমল শরীর।
এ ঘটনার একদিন পর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আনিসুর রহমান রায়হান জনস্বার্থে একটি রিট আবেদন করেন। রিটে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি সরকারকে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল।

রিট আবেদন আমলে নিয়ে ঘটনা তদন্তে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে পাঁচ কোটি টাকা এবং আহতদের এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে রুল জারি করা হয়েছিল।
কয়েক দফা বৈঠকের পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ, অর্থসহায়তা ও চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর একটি সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সভায় আহতদের প্রত্যেক পরিবারকে পাঁচ লাখ এবং নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

সে হিসাবে পাঁচ লাখ টাকা করে আহতদের ৬৪ জন পাবে ৩ কোটি ২০ লাখ এবং ২০ লাখ টাকা করে নিহতদের ৩৫ পরিবার পাবে সাত কোটি টাকা। রিট চলাকালীন সরকারের এ সিদ্ধান্তের পর বাধ সাধেন ক্ষতিগ্রস্ত অভিভাবকরা। তারা মনে করেন, ক্ষতিপূরণের এ অর্থ বাস্তবসম্মত নয়। এ নিয়ে সরকারের তরফেও দেন-দরবার চলে। তবে, পুরো বিষয়টি এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত।
সরকার থেকে কিছু পাওয়া যায়নি
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নিহত বোরহান উদ্দিন বাপ্পির বাবা আবু শাহীন মোহাম্মদ শাহ আলী বলেন, ‘এক বছরে সরকার থেকে কিছু পাওয়া যায়নি। জামায়াতে ইসলামী একবার এক লাখ টাকা দিয়েছিল। আর প্রাইম ব্যাংক পাঁচ কোটি টাকা দিয়েছিল, সেখান থেকে ভাগে ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছিলাম।’

সরকারের কাছে এখন কী দাবি—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন যে রিট করেছিলেন সেটার বাস্তবায়ন চাই, বিচার চাই, সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণ চাই।’
তখনকার সরকার কোনো খোঁজ নেয়নি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নিহত মাহিদ হাসান আরিয়ানের মা মনিকা আক্তার আঁখি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সহয়তা পাইনি। তখন ইউনূস সরকারের সময় ছিল, তারাও কোনো খোঁজ নেয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন, দেখবেন আমাদের।’
সন্তানের মৃত্যুর কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তারের মামা সাংবাদিক লিওন মীর বলেন, ‘আহত ও নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আমরা ক্ষতিপূরণ চাই না, সন্তানের মৃত্যুর কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না। মারা যাওয়া বাচ্চাকে টাকা দিয়ে কেনা যায় না।’

সুষ্ঠু বিচার ছাড়া আর কিছু চাই না
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ওয়াকিফা ফেরদৌস নিধির ভাই এনামুল হাসান রায়হান বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে সুষ্ঠু বিচার চাই, আর কিছু না। যার স্কুলে আমার বোনকে দিয়ে আসছি তার উচিত ছিল বিচার চাওয়া। আমার বোনের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল স্কুলের। আমার বোন মারা গেছে, তার পরিপূরক কী হতে পারে, সরকার আমাদের জন্য কী করছে?’
রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণীয় দিবস, পরিবারের সম্মানজনক পুনর্বাসন
স্কুলটির ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল তাহিয়া আশরাফ নাজিয়া। আরিয়ান আশরাফ নাফি ছিল তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় নাজিয়া মারা যায় ২২ জুলাই, নাফি ২৩ জুলাই। তারা ছিল আপন ভাই-বোন। নাজিয়ার শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। নাফির শরীরের প্রায় পুরোটাই পুড়ে গিয়েছিল।
কথা হলে এ দুই শিক্ষার্থীর বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার এক বছর পার হলেও নিহতের কোনো পরিবারই রাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বা উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা পায়নি। হাইকোর্ট নিহতদের পরিবারকে পাঁচ কোটি টাকা এবং আহতদের এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না, এ মর্মে রুল জারি করলেও তার বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে সরকার, তৎকালীন উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক নেতারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আশ্বাসের বাইরে আজ পর্যন্ত কোনো দাবিই বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ও আহতদের পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ, এটি আমাদের কাছে ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ নয়।’
আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা দিয়ে সন্তানদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিহতদের মর্যাদা দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, আহতদের পুনর্বাসন করা। আমরা চাই এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণীয় দিবস হিসেবে পালন করা হোক। নিহত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কর্মচারীদের আত্মত্যাগ যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সম্মানজনক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।’
নিহত নাজিয়া ও নাফির বাবা আরও বলেন, ‘সম্প্রতি অভিভাবকদের বৈঠক হয়েছে, আমরা এখনো ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আছি। আমরা আন্দোলন করতে চাই না। কিন্তু বারবার মনে হচ্ছে আন্দোলন না করলে যেন কেউ আমাদের কথা শুনতেই চায় না।’
দুটি রুলেই ক্ষতিপূরণের কথা হয়েছে
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) প্যানেল আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মাদ আমিরুল হক বলেন, ‘মাইলস্টোনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি রিট হয়েছে। দুটি রিটেই ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়েছে। দুটি রিটের একসঙ্গে শুনানি হবে। এছাড়া দুটি তদন্ত কমিশন গঠন হয়েছিল।’

রিটকারীদের আইনজীবী আমিরুল হক বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গত বছরের ২৭ জুলাই তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে ৫ নভেম্বর। তদন্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ ও ভুক্তভোগীদের এর অনুলিপি দেওয়ার জন্য বলা হয়। তবে তৎকালীন সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে রুল দিয়েছেন আদালত।’
এ আইনজীবী বলেন, ‘হতাহতদের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, এ মর্মেও রুল জারি করা হয়েছে। কিন্তু এসব রুলের পর কোনো অগ্রগতি নেই।’