ভ্রমণ মানেই নতুন জায়গা দেখা, নতুন অভিজ্ঞতা আর আনন্দের মুহূর্ত। তবে ভ্রমণের সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেই আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় দূরবর্তী স্থানে গেলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়। তাই ভ্রমণে বের হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ সঙ্গে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ভ্রমণের সময় কোন কোন ওষুধ সঙ্গে রাখা উচিত সেই বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন বাগেরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. সাকিয়া হক।
কেন ভ্রমণে ওষুধ সঙ্গে রাখা জরুরি?
ডা. সাকিয়া হক বলেন, ভ্রমণের সময় আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে অনেকের শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন: পেটের সমস্যা, সর্দি-কাশি, জ্বর, মাথাব্যথা, অ্যালার্জি বা বমি ভাব। অনেক সময় পাহাড়ি বা দূরবর্তী এলাকায় ভ্রমণ করলে আশপাশে দ্রুত কোনো হাসপাতাল বা ফার্মেসি পাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ আগে থেকেই সঙ্গে রাখলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
জ্বর ও ব্যথার ওষুধ:
ভ্রমণের সময় হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথা হতে পারে। তাই সাধারণ জ্বর ও ব্যথার ওষুধ সঙ্গে রাখা জরুরি। ডা. সাকিয়া হকের মতে, জ্বর বা শরীর ব্যথা কমাতে ব্যবহৃত সাধারণ ওষুধ ভ্রমণ ব্যাগে রাখা যেতে পারে। তবে কোনো ওষুধ নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ থাকলে তা অনুসরণ করা উচিত।
পেটের সমস্যার ওষুধ:
ভ্রমণের সময় অনেকেরই পেটের সমস্যা দেখা দেয়। নতুন খাবার খাওয়া, অনিরাপদ পানি পান করা বা সময়মতো খাবার না খাওয়ার কারণে ডায়রিয়া, গ্যাস্ট্রিক বা পেটব্যথা হতে পারে। তাই ভ্রমণের সময় সঙ্গে রাখা যেতে পারে-ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানার ওষুধ, গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির ওষুধ, ওরস্যালাইন (ওআরএস)।
ডা. সাকিয়া হক বলেন, পেট খারাপ হলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। তাই ওরস্যালাইন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বমি বা মোশন সিকনেসের ওষুধ:
অনেকের গাড়ি, বাস, নৌকা বা বিমানে ভ্রমণের সময় বমি বমি ভাব বা মাথা ঘোরা হয়। বিশেষ করে পাহাড়ি রাস্তা বা দীর্ঘ যাত্রায় এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। এ কারণে ভ্রমণের সময় বমি প্রতিরোধের ওষুধ সঙ্গে রাখা ভালো।
অ্যালার্জির ওষুধ:
ধুলাবালি, ঠান্ডা আবহাওয়া, নতুন খাবার বা ফুলের পরাগের কারণে অনেকের অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডা. সাকিয়া হক জানান, অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা যেতে পারে। এতে হঠাৎ অ্যালার্জি হলে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ভ্রমণের সময় অনেকেই সর্দি, কাশি বা গলা ব্যথায় ভোগেন। বিশেষ করে পাহাড় বা সমুদ্র এলাকায় গেলে ঠান্ডা বাতাসের কারণে এসব সমস্যা বাড়তে পারে। তাই সর্দি-কাশি বা গলা ব্যথার কিছু সাধারণ ওষুধ সঙ্গে রাখা যেতে পারে।
ব্যান্ডেজ ও প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী:
শুধু ওষুধ নয়, ভ্রমণের সময় ছোটখাটো দুর্ঘটনা বা আঘাতের জন্য কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রীও রাখা প্রয়োজন। যেমন: ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, তুলা ও প্লাস্টার।
ডা. সাকিয়া হক বলেন, ভ্রমণের সময় হাঁটাহাঁটি বা অ্যাডভেঞ্চারমূলক কাজ করার সময় ছোটখাটো কাটা বা আঘাত লাগতে পারে। তাই প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী সঙ্গে রাখা ভালো।
যাদের নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়:
অনেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগে থাকেন। তাদের জন্য নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধ সঙ্গে রাখা অত্যন্ত জরুরি। ডা. সাকিয়া হক বলেন, ভ্রমণে বের হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে নিয়ে নেওয়া উচিত, যাতে ভ্রমণের সময় ওষুধের ঘাটতি না হয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নতুন কোনো ওষুধ না খাওয়া
ওষুধ আলাদা একটি ছোট ব্যাগে রাখা
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহার না করা
প্রয়োজন হলে প্রেসক্রিপশনের কপি সঙ্গে রাখা
ডা. সাকিয়া হক বলেন, ভ্রমণে বের হওয়ার আগে নিজের স্বাস্থ্যের অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করলে আরও ভালো।
ডা. সাকিয়া হকের মতে, ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করতে হলে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি অবহেলা করা যাবে না। ছোটখাটো কিছু প্রস্তুতি অনেক বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে। প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা, নিরাপদ খাবার ও পানি গ্রহণ করা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার মাধ্যমে ভ্রমণকে আরও নিরাপদ ও আনন্দময় করা সম্ভব। তাই ভ্রমণে বের হওয়ার আগে ব্যাগ গুছানোর সময় পোশাক বা প্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি একটি ছোট মেডিসিন কিট রাখতেও ভুলবেন না। এতে হঠাৎ অসুস্থ হলেও দ্রুত প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।