একটি পাখি প্রতিদিন যে ডালে বসে তার সঙ্গীর জন্য অপেক্ষা করত, একদিন সেই ডালেই সে একা বসে থাকে। সঙ্গী আর ফিরে আসে না। সে বারবার চারদিকে তাকায়, ডানা ঝাপ্টায়, ডাকতে থাকে। কখনো দীর্ঘক্ষণ একই জায়গায় বসে থাকে। এমন দৃশ্য দেখলে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—পাখিটি কি তার সঙ্গীকে হারিয়ে কষ্ট পাচ্ছে? সে কি বুঝতে পারছে, তার জীবনের পরিচিত সঙ্গীটি আর নেই?
প্রকৃতির এই দৃশ্যগুলো আমাদের নিজেদের জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। মানুষের মতো পাখিদেরও কি ভালোবাসা আছে? তারা কি অভিমান করে, রাগ করে, সঙ্গীর সঙ্গে বিচ্ছেদে কষ্ট পায়? এমনকি বাচ্চা রেখে চলে যাওয়ার মতো ঘটনাও কি তাদের জীবনে ঘটে? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে পাখিদের আচরণের দিকে তাকাতে হয়। কারণ পাখির জীবন শুধু খাবার সংগ্রহ, বাসা তৈরি আর বংশবিস্তারের গল্প নয়। তাদের মধ্যে আছে জটিল সামাজিক সম্পর্ক, সঙ্গী নির্বাচন, সন্তান লালন-পালন, প্রতিযোগিতা এবং বিপদের মুখে টিকে থাকার নানা কৌশল। এসব আচরণের পেছনে আবেগের ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে প্রাণীর আচরণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সহজাত প্রবৃত্তি ও বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষের অনুভূতি আর প্রাণীর আচরণকে আলাদা করে দেখার প্রবণতাও ছিল প্রবল। তবে প্রাণীর অনুভূতি নিয়ে আধুনিক গবেষণা সেই ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
২০১৯ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘পাখির আবেগ: ভয় ও হতাশার তুলনামূলক পর্যালোচনা’ শীর্ষক একটি পর্যালোচনা গবেষণায় পাখির আবেগীয় অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, পাখিরাও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কেমন আচরণ প্রদর্শন করে। গবেষকদের আলোচনায় পাখির আচরণগত প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি এর পেছনে থাকা স্নায়বিক ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াও গুরুত্ব পেয়েছে।
গবেষণাটিতে বিশেষভাবে পাখির ভয় ও হতাশা-সদৃশ প্রতিক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক দিকগুলো তুলে ধরা হয়। তাদের আচরণ, শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা আবেগের সম্ভাব্য প্রকাশ বোঝার চেষ্টা করছেন। পাখির আচরণে ভয়, হতাশা এবং নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়া বিষয়ে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, পাখির অনুভূতি আছে—এমন দাবির যথেষ্ট প্রমাণ আছে। তবে তাদের সব অনুভূতিকে মানুষের অনুভূতির হুবহু প্রতিরূপ ভাবা যথাযথ নয়।
সঙ্গী হারানোর কষ্ট কি পাখিরাও অনুভব করে?
গবেষণায় উঠে এসেছে, অনেক প্রজাতির পাখি প্রজনন মৌসুমে জুটি বাঁধে। কোনো কোনো প্রজাতিতে একই সঙ্গীর সঙ্গে একাধিক মৌসুম কাটানোর প্রবণতা আছে। তারা বাসা তৈরি করে, ডিমে তা দেয় এবং ছানার যত্ন নিতে একসঙ্গে কাজ করে। সঙ্গীর উপস্থিতি তাদের প্রজনন ও সন্তান লালন-পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিন্তু সেই সঙ্গীটি মারা গেলে বা হারিয়ে গেলে কী ঘটে? গবেষণা বলছে, কিছু পাখির ক্ষেত্রে সঙ্গী হারানোর পর ডাকাডাকি, পরিচিত জায়গায় অবস্থান, অস্থিরতা কিংবা আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এসব আচরণকে কখনো কখনো শোকের মতো প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। প্রাণীদের শোক নিয়ে পর্যালোচনা ক্ষেত্রে সামাজিক বন্ধন ছিন্ন হওয়ার পর বিভিন্ন প্রাণীর আচরণগত ও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া আলোচিত হয়েছে। ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, পাখিরা মৃত্যুর চূড়ান্ত অর্থ মানুষের মতোই বোঝে। তবে প্রাণী বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সঙ্গী হারানো পাখির দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা বা বারবার ডাকাকে সরাসরি মানুষের শোকের সমান বলা যায় না। সেটি সঙ্গীকে খোঁজা, পরিচিত সঙ্গীর অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট অস্থিরতা কিংবা অন্য কোনো আচরণগত প্রতিক্রিয়াও হতে পারে।
রাগ, অভিমান আর বিচ্ছেদ:
পাখিদের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংঘর্ষ এবং সঙ্গী পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। খাবার, বাসা, প্রজননক্ষেত্র কিংবা সঙ্গীকে কেন্দ্র করে তারা একে অন্যকে তাড়া করে, আক্রমণ করে, এমনকি বাসা থেকেও সরিয়ে দিতে পারে। কোনো কোনো প্রজাতির পাখি আগের সঙ্গী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী প্রজনন মৌসুমে নতুন সঙ্গী বেছে নেয়। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের ঘটনাকে সঙ্গী পরিবর্তন বা ডিভোর্স বলা যায়। এর পেছনে আগের প্রজননে ব্যর্থতা, নতুন সঙ্গীর প্রাপ্যতা কিংবা পরিবেশগত পরিস্থিতির মতো কারণ থাকতে পারে।
তবে এখানে মানুষের সঙ্গে পাখির সম্পর্কের একটি মৌলিক পার্থক্য ফুটে ওঠে। মানুষ অনেক সময় দীর্ঘদিনের অভিমান, বিশ্বাসভঙ্গ, অপমান কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধের কারণে সম্পর্ক ভেঙে দেয়। পাখিরাও মানুষের মতো সংসার ভাঙে, তাদের মধ্যেও সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে। আর সেই পরিবর্তন তাদের আচরণ ও প্রজননজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে পাখির ক্ষেত্রে সঙ্গী পরিবর্তনের পেছনে অভিমানের বিষয়টি কাজ করে কি না, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
বাচ্চা রেখে চলে যায় কেন?
পাখির মা-বাবার সন্তান লালন-পালনের দৃশ্য প্রকৃতির সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটি। খাবার এনে ছানার মুখে তুলে দেওয়া, বিপদ থেকে রক্ষা করা, বাসায় আগলে রাখা—এসব আচরণ আমাদের কাছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক বলে মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতিতে সব ছানার পরিণতি এক হয় না। কোনো কোনো পাখির বাসা নষ্ট হয়ে যায়, খাদ্যের অভাব দেখা দেয়, মা-বাবার একজন মারা যায়, অথবা শিকারির আক্রমণে ছানার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। এমন পরিস্থিতি হলে, কোনো কোনো পাখি ছানার যত্ন বন্ধ করে দেয়, বাসা ছেড়ে চলে যায়। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে সন্তান পালনের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ধরনও আছে।
মানুষের চোখে এসব ঘটনা নিষ্ঠুর বা দায়িত্বহীন বলে মনে হয়। কিন্তু পাখির জীবনাচরণ গবেষণায় এমনটা হরহামেশাই দেখা যায়। যদিও পাখির পরিবেশ, খাদ্যপ্রাপ্যতা, শারীরিক অবস্থা ও প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। যদিও একটি পাখি বাচ্চা রেখে চলে গেলেই বলা যায় না যে, সে সন্তানকে ভালোবাসেনি। আবার সব ক্ষেত্রেই এমন আচরণকে বেঁচে থাকার কৌশল বলে ব্যাখ্যা করাও যায় না।
নীরবতার ভাষা কি আমরা বুঝি?
মানুষের কষ্ট প্রকাশের ভাষা আছে। কেউ কাঁদে, কেউ কথা বলে, কেউ নিজের ভেতরে গুটিয়ে যায়। পাখিরা মানুষের ভাষায় নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেই আমরা সম্ভাব্য মানসিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাই। কোনো পাখি হঠাৎ খাবার কম খেলে, অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ থাকলে কিংবা আগের মতো সামাজিক আচরণ না করলে তার কারণ হতে পারে ভয়, অসুস্থতা, পরিবেশগত চাপ অথবা সঙ্গীর অনুপস্থিতি। কিন্তু শুধু একটি লক্ষণ দেখে তার মনের অবস্থা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। কোনো পাখিকে সঙ্গী হারিয়ে বিষণ্ন মনে হলে আমরা তার কষ্টের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পাই। এই অনুভূতি স্বাভাবিক।
পাখির কষ্ট বুঝতে পারা কেন জরুরি:
প্রাণীর অনুভূতি নিয়ে গবেষণা কেবল কৌতূহল মেটানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে প্রাণিকল্যাণেরও সম্পর্ক আছে। পাখির অনুভূতি সম্পর্কে যত বেশি জানা যাবে, তাদের প্রয়োজন ও আচরণ বোঝার সুযোগ তত বাড়বে। এতে বন্য পাখির আবাসস্থল রক্ষা, পোষা পাখির যথাযথ পরিচর্যা এবং প্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তুলতে সাহায্য হতে পারে। পাখিরা মানুষের মতোই কষ্ট পায়—যদিও এই বিষয়ের পরিষ্কার ব্যাখ্যা পুরোপুরি জানা যায়নি। তাদের ভয়, চাপ, সামাজিক বন্ধন এবং সঙ্গী হারানোর প্রতিক্রিয়া নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান আজও চলছে। একটি পাখি সঙ্গী হারিয়ে একা বসে থাকলে, ছানার জন্য খাবার নিয়ে ফিরলে কিংবা বিপদের মুখে আতঙ্কিত হয়ে ডাকলে আমরা তার আচরণে জীবনের গভীর কিছু চিত্র দেখতে পাই। কখনো মনে হয়, প্রকৃতির ভাষা আলাদা হলেও সম্পর্কের গুরুত্ব একেবারে অচেনা নয়।
তবে মানুষের অভিজ্ঞতা দিয়ে পাখির মন পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তাদের অনুভূতি মানুষের মতো কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—তারা কী অনুভব করতে সক্ষম, কোন পরিস্থিতিতে তাদের আচরণ বদলে যায় এবং সেই জ্ঞান আমাদের তাদের প্রতি কেমন আচরণ করতে শেখায়। হয়তো পাখির নীরবতা মানুষের ভাষায় অনুবাদ করা সম্ভব নয়। পাখিরা মানুষের মতো ভালোবাসে কি না, মানুষের মতো শোক করে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু তাদের জীবন যে কেবল প্রবৃত্তি দিয়ে পরিচালিত নয়, সে বিষয়ক গবেষণা আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবতে শেখাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.