সকালের ঘুমঘুম ভাব কাটাতে কিংবা বিকেলের ক্লান্তি দূর করতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা দুধ-চায়ের জুড়ি নেই। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দিনের শুরু করা যেমন অনেকের অভ্যাস, তেমনই কাজের ফাঁকে এক কাপ চা হয়ে উঠতে পারে ছোট বিরতি। স্বাস্থ্য সচেতনতার এই সময়ে গ্রিন টি কিংবা ভেষজ চায়ের জনপ্রিয়তা বাড়লেও দুধ-চায়ের প্রতি বাঙালির ভালোবাসা কিন্তু কমেনি। তবে আপনার যদি ফ্যাটি লিভার থাকে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে-প্রিয় দুধ-চা কি পান করা যাবে কি না ?
চিকিৎসকদের মতে, ‘গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভার’ থাকলে অতিরিক্ত চিনি ও ফুল-ক্রিম দুধ দিয়ে তৈরি চা স্বাস্থ্যকর নয়। তবে এর অর্থ চা খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে তা নয়, বরং বানানোর পদ্ধতিতে সামান্য বদল আনলেই চা হয়ে উঠতে পারে পুরোপুরি নিরাপদ ও পুষ্টিকর।
গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভার:
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গ্রেড-১ ফ্যাটি লিভারকে ‘মাইল্ড সিম্পল হেপাটিক স্টিয়াটোসিস’ বলা হয়।
লিভারে চর্বি জমার মৃদু বা প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে বোঝানো হয়। এ অবস্থায় লিভারের কোষে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে। শুরুতেই খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত শরীরচর্চার মতো স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে অনেক ক্ষেত্রেই অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব। তাই শুরুতেই সচেতন হওয়া জরুরি, যাতে লিভারের চর্বি জমার সমস্যা গ্রেড-২, গ্রেড-৩ কিংবা মারাত্মক ‘লিভার সিরোসিস’-এর ঝুঁকিসহ আরও গুরুতর পর্যায়ে না পৌঁছায়।
ফ্যাটি লিভার হলে চায়ে বেশি নজর দিতে হবে চিনিতে
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে চায়ের কাপে একের পর ১ চামচ চিনি যোগ করার অভ্যাস বদলানো জরুরি। চা, কোমল পানীয় বা অন্যান্য মিষ্টি পানীয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করলে মোট ক্যালরি বাড়তে পারে এবং এটি ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই সাদা চিনি, বাদামি চিনি কিংবা মিষ্টি করার জন্য কনডেন্সড মিল্ক বেশি পরিমাণে ব্যবহার না করাই ভালো। সম্ভব হলে চায়ে চিনি ধীরে ধীরে কমিয়ে একসময় চিনি ছাড়াই পানের অভ্যাস করা যেতে পারে।
দুধের ক্ষেত্রেও পরিমিত পরিমাণ বেছে নিন:
দুধ লিভারের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে ফুল-ক্রিম বা বেশি চর্বিযুক্ত দুধ নিয়মিত বেশি পরিমাণে খেলে খাদ্যতালিকায় ক্যালরি ও সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তাই ফ্যাটি লিভার থাকলে পরিমিত পরিমাণে কম চর্বিযুক্ত দুধ বেছে নিতে হবে।
চাইলে দুধের পরিমাণও কমিয়ে তুলনামূলক হালকা করে চা বানাতে পারেন। যারা দুধ সহ্য করতে পারেন না, তাদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আমন্ড মিল্ক, সয়া মিল্ক বা ওটস মিল্ক ব্যবহার করতে পারেন।
আমেরিকার ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ’-এর অধীনে প্রকাশিত বেশ কিছু গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়- ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় বাধা হলো খাবারের ‘ফ্রি সুগার’ বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত চিনি। গবেষকদের মতে, চিনিযুক্ত পানীয় বা অতিরিক্ত রিফাইন্ড সুগার গ্রহণ করার ফলে লিভারে দ্রুত ফ্যাট জমা হতে শুরু করে এবং ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি হয়।
অন্যান্য গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দুধ নিজে থেকে লিভারের সরাসরি ক্ষতি না করলেও চায়ের সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি ও উচ্চ ফ্যাটযুক্ত দুধ দীর্ঘক্ষণ ফুটিয়ে খেলে তা যকৃতে অতিরিক্ত ক্যালরি ও চর্বির চাপ সৃষ্টি করে। তাই লিভার ভালো রাখতে চিনি মুক্ত ও পরিমিত লো-ফ্যাট দুধে তৈরি চা পানের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
চায়ের স্বাদ বাড়াতে মসলা ব্যবহার করুন:
চায়ে বাড়তি চিনি না দিয়েও স্বাদে বৈচিত্র্য আনা যায়। আদা, এলাচ, দারুচিনি কিংবা লবঙ্গের মতো মসলা অল্প পরিমাণে ব্যবহার করলে চায়ে সুন্দর সুগন্ধ ও স্বাদ ভালো হয়।
শুধু চা বদলালেই হবে না:
ফ্যাটি লিভারের যত্নে শুধু এক কাপ চায়ের হিসাব করলেই হবে না। পুরো দিনের খাবার, শরীরের ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার দিকেও নজর দিতে হয়। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা ফ্যাটি লিভারের উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে।
তাই সকালে এক কাপ দুধ-চা খেলে সেটিকে ঘিরে অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং চায়ে চিনি কমান, দুধের পরিমাণ ও ধরন সম্পর্কে সচেতন হন এবং সারাদিনের খাবারে অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার কমানোর চেষ্টা করুন।
সূত্র: ওয়েবএমডি, এনডিটিভি
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.