প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের আমি একজন নিয়মিত এবং মুগ্ধ দর্শক। উনি বিদেশ গেলে আমি মোটামুটি অধীর আগ্রহে উনার ফেরার অপেক্ষা করি; কারণ আমি জানি উনি দেশে ফিরলেই সংবাদ সম্মেলন হবে। আমার মতো কিছু কট্টর নিন্দুক বাদ দিলে মোটা দাগে সকলেই একমত হবেন যে, দেশে দেশে যেখানে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতিবিদরা এড়িয়ে চলছেন গণমাধ্যমের সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্বকে, সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম তো বটেই। এখন প্রশ্ন হলো আমার এতো আগ্রহের কারণ কি? কারণ প্রধানত দু’টি- একটি মুখ্য, অন্যটি গৌণ। গৌণ কারণটিই আগে বলি। এই সংবাদ সম্মেলনে আমার সব পরিচিত মুখ সামনের বেশকিছু সারি আলোকিত করে বসে থাকেন, তাদের আনন্দোজ্জ্বল মুখ দেখতে ভালো লাগে। সকলেই তাদের মুখের ভাব যথাসম্ভব গম্ভীর রাখার চেষ্টা করলেও ভেতরের চাপা আনন্দ তাতে চাপা পড়ে না। জিজ্ঞাস করতে পারেন আমি তাদের পরিচিত বলছি কেন? বলছি এ কারণেই যে, প্রতিরাতের টকশো টেবিলে তাদের কেউ না কেউ আমার সাথে ‘নিরপেক্ষ’ সাংবাদিক হিসেবে উপস্থিত থাকেন। তাদের নিরপেক্ষতায় আমি চমৎকৃত হই; আমি নিশ্চিত, দর্শক চমৎকৃত হন আরও বেশি। যাইহোক, এবার আসি মুখ্য কারণে।
মুখ্য কারণ হলো- বিনোদন। প্রশ্নকর্তাদের প্রশ্ন শুনে আমি যেমন বিনোদিত হই, প্রধানমন্ত্রীও আনন্দ পান। উনার হাসিখুশি মুখ দেখতে ভালো লাগে।
যে দেশে গণমাধ্যম মোটাদাগে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারে সেখানে নাকি রাজনীতিবিদরা রীতিমতো ভয় পান সাংবাদিকদের। কখন কি প্রশ্ন করে ফেলেন, উত্তর মনঃপূত না হলে পাল্টা কি প্রশ্ন আসে, বলা আর না বলার মধ্যে ভারসাম্য কি করে রাখা যায় ইত্যাদি নানা কিছু নিশ্চিত ভাবেই বেকায়দায় ফেলে রাজনীতিবিদদের। আর সাংবাদিকের দায়বদ্ধতা যেহেতু জনগণের প্রতি, কোনো বিশেষ দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতি নয়, তাই সঙ্গত কারণেই সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা আর পেশাদারিত্ব ছাড়া অন্য কিছুই তার প্রশ্নের পথে কোনো বাধা হতে পারে না। সে কারণেই সত্যিকার সাংবাদিকতার মুখোমুখি হওয়া রাজনীতিবিদদের জন্য খুব একটা স্বস্তির বিষয় নয়- কখনোই।
প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের ধরনগুলো মোটামুটি একই রকম। উনি যে দেশ সফর করেন সেখানে উনার সফরের বিস্তারিত উনি বলার পর সাংবাদিকরা প্রশ্ন করার সুযোগ পান। তখনই শুরু হয় আসল মজা। প্রশ্নগুলো প্রায় সময়ই হয় সংক্ষিপ্ত কিন্তু তার আগে যে দীর্ঘ সময় প্রশ্নকর্তা ভূমিকা করেন সেটি হয় ইন্টারেস্টিং। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া দেশ কতটা অন্ধকার, তিনি কতটা অপরিহার্য, কৃষি থেকে শিল্প, ভূগোল থেকে বিজ্ঞান, ভূপৃষ্ঠ থেকে নভোমণ্ডল যেখানে ভালো যা কিছু হচ্ছে তার কৃতিত্ব কেবলই যে প্রধানমন্ত্রীর সে কথাটাই তারা নিষ্ঠার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে থাকেন।
প্রধানমন্ত্রীর শেষ যে সংবাদ সম্মেলন হলো গত ২রা মে তার ঠিক একদিন পরই বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে ফরাসি সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স প্রকাশ করলো বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচক। বিষয়টি কাকতালীয় হলেও মজার। এবার সেই সূচকে দুই ধাপ পিছিয়ে ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৫তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শুধু আফগানিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নিচে বা বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থায় কারা আছে জানতে কৌতূহলের বশে তালিকায় ঢুকে দেখি কেবল দক্ষিণ এশিয়ার দেশই নয়, আফ্রিকার অনেক দেশ এমন কি যে দেশটি নিয়ে আমাদের ট্রোলের সীমা নাই সেই উগান্ডাও আছে আমাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে।
এবার একটা গল্প বলি। আমার পরিবারের সঙ্গে গণমাধ্যমের সরাসরি যোগাযোগ আছে। আমার পিতা অলি আহাদ ছিলেন ইত্তেহাদ পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক। এই পত্রিকাটির একটি ইতিহাস আছে। মুসলিম লীগের হাশেম-সোহ্রাওয়ার্দী গ্রুপের উদ্যোগে দৈনিক ইত্তেহাদ প্রথম প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে। ১৯৪৬-৪৮ সাল পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন আবুল মনসুর আহমেদ। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় যুক্ত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরও দৈনিক ইত্তেহাদ প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে পত্রিকাটির সার্কুলেশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পূর্ব বাংলায় এজেন্ট নিয়োগ করে দৈনিক ইত্তেহাদের প্রচার ও প্রসারে সে সময় ব্যাপক ভূমিকা রাখেন শেখ মুজিব। বলা হয় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো বলে তৎকালীন খাজা নাজিমুদ্দিন সরকার পত্রিকাটির প্রচার নিষিদ্ধ করে। এরপর দীর্ঘ সময় পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ ছিল।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশ করেন আমার পিতা জনাব অলি আহাদ। ১৯৭২ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেহাদের ডিক্লারেশন নেন তিনি। এরপর ৭২ থেকে ৭৪ নিয়মিতভাবে প্রতি সপ্তাহে প্রকাশিত হতে থাকে পত্রিকাটি। সরকারবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে ৭৪ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে কারাবরণ করেন অলি আহাদ। যেহেতু পত্রিকাটির প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন তিনি এবং এর যাবতীয় ব্যয় তিনিই নির্বাহ করতেন তাই তার কারাবরণের পর পত্রিকাটির প্রকাশ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। কারামুক্তির পর ৭৬ সাল থেকে আবার নিয়মিত প্রকাশ পেতে থাকে ইত্তেহাদ। শুরু থেকেই এন্টিএস্টাব্লিশমেন্ট অবস্থানের কারণে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পত্রিকাটি। এরশাদের মার্শাল ’ল সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের কারণে ৮২ সালের শেষের দিকে আবার বন্ধ করা হয় পত্রিকাটি, অলি আহাদকে নেয়া হয় কারাগারে। পরবর্তীতে আবার ৮৩ সালে পত্রিকাটি প্রকাশের লাইসেন্স নেন তিনি কিন্তু বারবার কারাবরণ আর পত্রিকায় প্রকাশিত সরকারবিরোধী রিপোর্টের কারণে কিছুদিন পরপরই সরকারের রোষানলে পড়ে লাইসেন্স হারাতে হয় তাকে। এক পর্যায়ে এসে তীব্র অর্থাভাবের কারণে পত্রিকাটির প্রকাশ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। পত্রিকাটির সুনাম, ঐতিহ্য ও ব্যাপ্তির কথা বিবেচনা করে সে সময় অনেকেই চেয়েছিলেন পত্রিকাটির স্পন্সর হতে। কিন্তু অলি আহাদ বিশ্বাস করতেন পত্রিকার আর্থিক মালিকানা যদি অন্য কারও কাছে চলে যায় তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতা করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। এত কথা বলার কারণ একটাই। আজকাল যেমন বড় ব্যবসায়ীরা পত্রিকা খোলেন নিজের ব্যবসা নিরাপদ করতে সে সময় বড় বড় রাজনীতিবিদরা চাইতেন পত্রিকা চালাতে। তাতে নিজের মত স্বাধীন ভাবে প্রকাশের একটি সুযোগ পেতেন তারা।
১১. রিজার্ভ সংকটের জন্য কোভিড, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বমন্দাকে দায়ী করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের আসল রিজার্ভ এখন তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্যও যথেষ্ট না, অথচ ভারত এগারো থেকে বার মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারবে বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে। বাংলাদেশের রিজার্ভ সংকটের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বলা কারণগুলো ভারতের জন্যও কি প্রযোজ্য নয়? ভারত পারলে আমরা পারলাম না কেন?
১২. বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যয়ে বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্নমানের রাস্তা কেন তৈরি করা হয়?
১৩. অর্থনীতিবিদদের মতে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে কেন বিনিয়োগ করা হলো?
১৪. ক্ষমতায় আসতে এবং থাকতে গিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে ফেলা এবং বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণরূপে দলীয়করণের যে প্রথা চালু হলো সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য কি?
১৫. আপনার দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের আগে বলেছিলেন- “পিটার হাসের মুরব্বিদের সঙ্গে তলে তলে আপস হয়ে গেছে।” কিসের বিনিময়ে সেই আপস হয়েছিল? সেই আপসের ফলেই কি বিরোধী দলের ২৭ হাজার নেতাকর্মী কারাগারে রেখে একতরফা নির্বাচন করতে পেরেছিলেন?
১৬. ‘আমি ভারতকে যা দিয়েছি তা তারা সারা জীবন মনে রাখবে’- আপনার এই মন্তব্যকে উদ্ধৃত করে বলতে চাই তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য বৈষম্য, ট্রানজিট, বন্দর ব্যবহারের সুবিধাসহ নানা ক্ষেত্রে ভারতকে অন্যায় সুবিধা নেয়ার মতো কোনো ক্ষেত্রেই ভারত বাংলাদেশের স্বার্থ দেখেনি। এর মানে কি, ভারতের সঙ্গে দরকষাকষির মূল্য সূত্রই কি ছিল ক্ষমতায় থাকা?
১৭. ২০২৪ সালে একজন প্রার্থী নিজেকে ভারতের প্রার্থী বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। ভারতের প্রার্থী কয়জন ছিল ওই নির্বাচনে?
১৮. আপনি কি মনে করেন ‘ইন্ডিয়া আউট’- ক্যাম্পেন সফল হওয়ার অন্যতম একটি মূল কারণ মানুষ বিশ্বাস করে বাংলাদেশের মানুষকে তাদের ভোটের অধিকার বঞ্চিত করে ভারত এই সরকারকে নিজ স্বার্থে ক্ষমতায় রেখেছে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি জবাব দেবেন কি?