ঢাকার মিরপুরের আট বছরের সাইফ স্কুল থেকে ফিরেই মায়ের কাছে কেক চায়। সপ্তাহে কয়েক দিন তার টিফিনে থাকে প্যাকেটজাত বিস্কুট বা কেক। বিকেলে খেলতে যাওয়ার সময় কিনে নেয় কোমল পানীয়। সাইফের মা নাজমা আক্তার মনে করেন, প্যাকেটের গায়ে যেহেতু পুষ্টি ও ভিটামিনের কথা লেখা থাকে তাই খাবারটি নিশ্চয়ই খুব খারাপ নয়।
কিন্তু কিছুদিন আগে একটি পণ্যের প্যাকেট হাতে নিয়ে থমকে যান তিনি। সামনে বড় করে লেখা পুষ্টির কথা। পেছনে ছোট অক্ষরে উপাদানের তালিকা। সেখানে কোন তথ্য সন্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে পারেননি। তার প্রশ্ন, ‘প্যাকেটের গায়ে এত কথা লেখা থাকে। কিন্তু কোন তথ্য দেখে আমি বুঝব খাবারটি আমার সন্তানের জন্য কতটা ভালো?’
এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শুধু একটি পরিবারের খাদ্যাভ্যাস নয়। আছে খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা, পণ্যের নিরাপত্তা, দায়িত্বশীল বিপণন, তথ্যের স্বচ্ছতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং সুশাসনের প্রশ্ন। অর্থাৎ শিশুদের জন্য ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মূল ব্যবসার মধ্যেই শিশুর অধিকার কতটা বিবেচনায় নিচ্ছে, সেটিও ইএসজি (পরিবেশগত, সামাজিক এবং সুশাসন) ও সিএসআর (কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা) এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নাজমা আক্তারের এই প্রশ্ন শুধু একজন অভিভাবকের নয়। বাংলাদেশের অনেক পরিবার এখন শিশুদের জন্য প্যাকেটজাত খাবার কিনছে। বিস্কুট, চকলেট, কেক, চিপস, বিভিন্ন ধরনের পানীয় ও নানা ধরনের খাবার শিশুদের খাদ্যতালিকায় ঢুকে পড়েছে। শিশুদের খাবারের এই বাজারে বড় অঙ্কের ব্যবসাও হচ্ছে। কিন্তু সেই ব্যবসার সঙ্গে শিশুর স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অধিকার কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে? সেই প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।
শিশুদের অধিকার নিয়ে করপোরেট দায়বদ্ধতার ধারণা এখন শুধু বৃত্তি, স্বাস্থ্যসেবা বা দাতব্য কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যবসা কীভাবে শিশুদের প্রভাবিত করছে, পণ্যের নিরাপত্তা, বিজ্ঞাপন ও বিপণন, কর্মক্ষেত্র, সরবরাহব্যবস্থা, পরিবেশ এবং প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণ এসবও এর অংশ।
প্যাকেটের সামনে যা দেখা যায়:
শিশুদের জন্য জনপ্রিয় কয়েকটি প্যাকেটজাত খাবার হাতে নিলে প্রথমেই চোখে পড়ে মোড়কের সামনের অংশ। উজ্জ্বল রং, শিশুদের পছন্দের ছবি, আকর্ষণীয় শব্দ এবং পুষ্টি নিয়ে নানা দাবি থাকে সেখানে। কোনো পণ্যে ভিটামিনের কথা লেখা থাকে। কোনো পণ্যে শক্তি বাড়ানোর কথা বলা হয়। কোথাও বিশেষ কোনো উপাদানের উপস্থিতিকে সামনে আনা হয়।
সন্তানের জন্য খাবার কেনার সময় অনেক অভিভাবকই প্রথমে প্যাকেটের সামনের অংশটি দেখেন। কিন্তু খাবারের উপাদান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সাধারণত থাকে পেছনে। সেখানে থাকে উপাদানের তালিকা, পুষ্টিমান, পরিবেশন মাত্রা ও অন্যান্য তথ্য।
ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা ও দুই সন্তানের মা মারুফা আক্তার বলেন, ‘সন্তানের জন্য খাবার কেনার সময় প্যাকেটের পেছনের পুষ্টি ও উপাদানের তালিকা সাধারণত দেখা হয় না। সময়ের অভাবেও বিস্তারিত পড়াও হয় না। সামনে সুন্দরভাবে পুষ্টির কথা লেখা থাকলে সেটাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোন খাবারে কত চিনি, লবণ বা চর্বি আছে তা অনেক সময় জানা হয় না।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং কয়েকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের একটি গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে প্রচলিত ২৪টি প্যাকেটজাত প্রক্রিয়াজাত খাবারের পুষ্টিমান পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ৪৬ শতাংশ পণ্যের মোড়কে সম্পৃক্ত চর্বির তথ্য ছিল না। মোট খাদ্যতন্তু ও রূপান্তরিত চর্বির তথ্য ছিল না ৩৮ শতাংশ পণ্যে। চিনির তথ্য দেওয়া হয়নি ২১ শতাংশ এবং লবণের তথ্য দেওয়া হয়নি ২১ শতাংশ পণ্যে।
গবেষকেরা পরীক্ষাগারে পাওয়া পুষ্টিমানকে প্যাকেটের ঘোষিত তথ্যের সঙ্গে তুলনা করেও পার্থক্য পেয়েছেন। একটি চিপসের নমুনায় পরীক্ষায় পাওয়া সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ মোড়কে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে ৭৮০ দশমিক ২ শতাংশ বেশি ছিল। একটি চানাচুরের নমুনায় পরীক্ষায় পাওয়া চিনির পরিমাণ ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে ১ হাজার ৬৪৪ শতাংশ বেশি পাওয়া যায়। গবেষকেরা বলেছেন, প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টি সম্পর্কে ভোক্তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বর্তমান তথ্য সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।
এখানেই প্রতিষ্ঠানের ইএসজি সংক্রান্ত দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে— পণ্য সম্পর্কে যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তা কতটা স্বচ্ছ, বোধগম্য ও নির্ভরযোগ্য?
পুষ্টির দাবি কতটা স্পষ্ট:
শিশুদের খাবারের ক্ষেত্রে ‘পুষ্টিকর’ বা ‘স্বাস্থ্যকর’ ধরনের শব্দ অভিভাবকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু একটি খাবারে কোনো একটি পুষ্টি উপাদান থাকলেই পুরো খাবারটি স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন।

ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারের পুষ্টিবিদ ও খাদ্য পরামর্শক সাবিহা সুলতানা বলেন, ‘শিশুদের জন্য প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় শুধু প্যাকেটের সামনের দিকের লেখা বা বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। প্যাকেটের উপাদান তালিকা, চিনি, লবণ, সম্পৃক্ত ও রূপান্তরিত চর্বির পরিমাণ এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ ভালোভাবে দেখা জরুরি।
তিনি বলেন, ‘উপাদান তালিকার শুরুতেই চিনি বা বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিকারক উপাদান থাকলে খাবারটিতে চিনির পরিমাণ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একইভাবে অতিরিক্ত লবণ, সম্পৃক্ত চর্বি ও রূপান্তরিত চর্বি রয়েছে কি না সেটিও দেখা দরকার। শিশুর কোনো নির্দিষ্ট খাবারে অ্যালার্জি থাকলে প্যাকেটের সতর্কতামূলক তথ্যও অবশ্যই দেখতে হবে।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের সর্বশেষ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৪ শতাংশ খর্বকায়। ১৩ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায়। একই সময়ে অতিরিক্ত ওজনের সমস্যাও দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে পরিচালিত একাধিক জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১ দশমিক ৭ শতাংশের অতিরিক্ত ওজনের তথ্য পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন কী শিশুর পছন্দ বদলায়?
শিশুদের খাবারের বাজারে শুধু পণ্যের গুণমান নয়, বিজ্ঞাপনও গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও, খেলাধুলার অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে শিশুদের সামনে খাবারের প্রচার হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের লক্ষ্য করে খাবারের প্রচারে কার্টুন চরিত্র, খেলোয়াড়, উপহার, প্রতিযোগিতা, খেলা, প্যাকেটের নকশা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিদের ব্যবহার করা হয়। এসব প্রচার শিশুদের খাবারের পছন্দ ও কেনার অনুরোধকে প্রভাবিত করতে পারে।
শিশু যখন একটি বিজ্ঞাপন দেখে বলে, ‘আম্মু, এটা কিনে দাও’! তখন সেই পণ্য কেনার সিদ্ধান্তে শিশুর ভূমিকা তৈরি হয়। এখানে শিশুটি সরাসরি ক্রেতা নয়। কিন্তু ক্রয় সিদ্ধান্তে তার প্রভাব রয়েছে।
ঢাকার নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আফ্রিদা জান্নাত বলেন, ‘বিজ্ঞাপনে যখন দেখি অন্য বাচ্চারা খাচ্ছে, তখন আমারও খেতে ইচ্ছে করে। বাবা-মা'কে মাঝে মধ্যেই ওই খাবারগুলো কিনে চাই। কখনো কিনে দেয়, কখনো দেয় না।’
স্কুলের সামনে কোন খাবার?
শিশুদের খাদ্যাভ্যাস বুঝতে স্কুলের আশপাশে কী ধরনের খাবার বিক্রি হচ্ছে এবং শিশুরা সেসবের কোনটি কিনছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার কয়েকটি স্কুলের আশপাশে দেখা যায়, ছুটির সময় শিশুদের ভিড় জমে ছোট দোকান, ভ্যান ও অস্থায়ী খাবারের দোকানে। সেখানে প্যাকেটজাত বিস্কুট, চিপস, কেক, চকলেট, মিষ্টি জাতীয় খাবার ও বিভিন্ন ধরনের পানীয় বিক্রি হয়। কম দাম ও সহজে পাওয়া যায় বলে এসব খাবার শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
রাজধানীর কাকলি উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে দোকান নিয়ে বসা মনসুর আলম বলেন, ‘স্কুল ছুটির সময় শিশুদের কাছে ছোট প্যাকেটের কেক, বিস্কুট, চিপস ও বিভিন্ন ধরনের পানীয়ের চাহিদা বেশি থাকে। শিশুরা সাধারণত নিজের পছন্দ অনুযায়ী এসব খাবার কিনতে চায়। প্যাকেটের গায়ে আকর্ষণীয় ছবি বা লেখা থাকলে তারা সেগুলোর প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায়। দাম কম হওয়ায় অনেক শিশু নিজের কাছে থাকা টাকা দিয়েই এসব খাবার কিনে নেয়।’
মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে সন্তানের জন্য খাবার কিনছিলেন আসমাউল হোসনা। তিনি বলেন, ‘স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রতিদিনই সন্তান খাবার কিনে চায়। প্রতিদিন কী খাচ্ছে, সব সময় খেয়াল রাখা সম্ভব হয় না। প্যাকেটের ছবিই বেশির ভাগ সময় দেখা হয়। কী লেখা আছে সেগুলো তেমন পড়া হয় না।
শিশুরা কোন খাবার কেনে, কেন কেনে এবং অভিভাবকেরা কেন সেই খাবার কিনে দেন— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে শিশুদের খাদ্য পরিবেশের একটি বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। কারণ শিশুর খাদ্যাভ্যাস শুধু পরিবারের সিদ্ধান্তে তৈরি হয় না। স্কুল, আশপাশের দোকান, বিজ্ঞাপন এবং বাজারের পরিবেশও সেই অভ্যাস তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা মনের বন্ধু’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তৌহিদা শিরোপা বলেন, ‘শিশুরা শুধু খাবারের স্বাদ বা প্রয়োজনের কারণে কোনো পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয় না। প্যাকেটের রং, ছবি, কার্টুন চরিত্র, বিজ্ঞাপনের ভাষা এবং অন্য শিশুদের দেখানো এসব বিষয়ও তাদের পছন্দ তৈরিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুদের লক্ষ্য করে খাদ্যপণ্যের প্রচারের ক্ষেত্রে তাদের মানসিক বিকাশ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠানের দায় কোথায়?
শিশুদের খাবার বিক্রি করা একটি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। প্রতিষ্ঠানের লাভ করার অধিকার আছে। একই সঙ্গে ভোক্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও আছে। শিশুদের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের জন্য খাবার বাজারে আনার আগে কী ধরনের পরীক্ষা করা হয়, পণ্যের পুষ্টিমান কীভাবে যাচাই করা হয় এবং মোড়কে দেওয়া তথ্য কীভাবে নিশ্চিত করা হয় —এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভোক্তার অভিযোগ এলে সেটি কীভাবে নথিভুক্ত ও যাচাই করা হয়, সমস্যাযুক্ত পণ্য বাজার থেকে তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না, সেটিও জানা দরকার। কারণ দায়িত্বশীল ব্যবসা শুধু ভালো উদ্যোগ গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ, ঝুঁকি, পণ্যের নিরাপত্তা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থাও তার অংশ।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিং সংক্রান্ত গাইডলাইন ও প্রযোজ্য মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রাণ-এর সকল খাদ্যপণ্যের মোড়ক তৈরি করা হয়। প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে পণ্যের আকার, পুষ্টিমান, উপাদান এবং ভোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
তিনি আরো বলেন, ‘প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়গুলোর আমরা গুরুত্বারোপ করি। প্রাণের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে যেসব মোড়ক রিসাইকেল করা সম্ভব, সেগুলো পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর যেসব মোড়ক রিসাইকেল করা সম্ভব নয়, সেগুলো নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হয়। আমরা বিশ্বাস করি, নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল প্যাকেজিং নিশ্চিত করাও একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ব্যবসার মধ্যেও শিশুর অধিকার:
বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য বৃত্তি দেয়, স্বাস্থ্যসেবা দেয়, পুষ্টি কর্মসূচি চালায়। এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের শিশু অধিকারভিত্তিক সামাজিক দায়বদ্ধতা শুধু এসব কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত কি না, সেটিও ভাবার বিষয়।
একটি প্রতিষ্ঠান একদিকে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে সেই প্রতিষ্ঠান যদি শিশুদের কাছে এমন কোনো খাবার বাজারজাত করে, যার পুষ্টিমান নিয়ে প্রশ্ন আছে, তাহলে পুরো কর্মকাণ্ডকে একসঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা আব্দুল্লাহ হাসান বলেন, ‘শিশুদের জন্য সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু বৃত্তি দেওয়া বা স্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি যে পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করছে, সেগুলো শিশুদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের জন্য কতটা নিরাপদ, সেটিও দেখতে হবে। মূল ব্যবসার সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিশুদের লক্ষ্য করে কোনো পণ্য বাজারজাত করলে সেখানে তথ্যের স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল প্রচারের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। কারণ শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন ও পণ্যের তথ্য সম্পর্কে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।’
অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু ‘প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের জন্য কত টাকা খরচ করেছে’ এমন হওয়া উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড শিশুদের অধিকার ও কল্যাণকে কতটা বিবেচনায় নিচ্ছে। এটাই পরিবেশগত, সামাজিক ও শাসনব্যবস্থাভিত্তিক দায়িত্বশীলতার বড় পরীক্ষা।
মোড়কের তথ্য সহজ হওয়া দরকার:
শিশুর খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়ে একজন অভিভাবক যেন দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বুঝতে পারেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পণ্যে কত চিনি, কত লবণ, কত চর্বি রয়েছে, পরিবেশন মাত্রা কত এবং কোন বয়সের শিশুর জন্য এটি উপযোগী —এসব তথ্য সহজভাবে বোঝার সুযোগ থাকা দরকার।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমির কর্মকর্তা রেজিনা আক্তার বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক শিশুর অপুষ্টির সমস্যা রয়েছে। অতিরিক্ত ওজন ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই শিশুদের খাবারের ক্ষেত্রে শুধু পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির বিষয়টি দেখলে হবে না। শিশুর স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, ‘প্যাকেটের তথ্য সহজ ও স্পষ্ট হওয়া দরকার। যাতে অভিভাবকেরা দ্রুত বুঝতে পারেন তারা সন্তানের জন্য কী কিনছেন। একইভাবে শিশুদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনাও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। কোনো পণ্যের প্রচার যেন শিশু ও অভিভাবককে বিভ্রান্ত না করে, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
রেজিনা আক্তারের মতে, ‘শিশুদের খাবার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার, খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে। শিশুদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে প্যাকেটের পেছনে উপাদান ও পুষ্টিমান লিখতে হলেও, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তা লেখে অত্যন্ত ছোট অক্ষরে। যা সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে পড়া প্রায় অসম্ভব। ক্ষতিকর ফ্যাট বা অতিরিক্ত চিনির তথ্যগুলো যেন ক্রেতার চোখে সহজে ধরা না পড়ে। সে জন্যই এই কৌশল ব্যবহার করা হয় বলে মনে করেন অনেকে।
সমাধান কোথায়?
শিশুদের খাবারের বাজার বন্ধ করার কথা কেউ বলছে না। বরং এই বাজারকে আরও নিরাপদ ও তথ্যসমৃদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারের পুষ্টিবিদ ও খাদ্য পরামর্শক সাবিহা সুলতানা বলেন, ‘প্যাকেটের পুষ্টিমান দেখার সময় পরিবেশন মাত্রার বিষয়টিও মনে রাখতে হবে। কারণ প্যাকেটে দেওয়া পুষ্টির হিসাব অনেক সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবারের জন্য দেওয়া থাকে। শিশু বাস্তবে কতটা খাবার খাচ্ছে, তার সঙ্গে সেই হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্যাকেটের সামনে ১০০ শতাংশ প্রাকৃতিক, স্বাস্থ্যকর বা এ ধরনের আকর্ষণীয় দাবি থাকলেই খাবারটিকে নিরাপদ বা পুষ্টিকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অভিভাবকদের উচিত এসব দাবির পাশাপাশি উপাদান তালিকা ও পুষ্টিমান দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুর খাবারে বাড়তি চিনি না দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
সাবিহা সুলতানার মতে, ‘শিশুর খাবার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তথ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া। প্যাকেটের তথ্য যত সহজ ও স্পষ্ট হবে, অভিভাবকদের জন্য সঠিক খাবার বেছে নেওয়াও তত সহজ হবে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মালিহা শিফা বলেন, ‘প্যাকেটজাত খাবার এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে গেছে। শিশুরা যে খাবার খাচ্ছে, সেটি নিরাপদ কি না এবং এতে কী পরিমাণ চিনি, লবণ ও চর্বি রয়েছে সে তথ্য অভিভাবকদের সহজভাবে জানার সুযোগ থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রথম দায়িত্ব হলো পণ্যের নিরাপত্তা ও পুষ্টিমান নিশ্চিত করা। মোড়কে তথ্য এমনভাবে দিতে হবে, যাতে একজন সাধারণ অভিভাবকও দ্রুত বুঝতে পারেন। শিশুদের লক্ষ্য করে প্রচারের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল নীতি থাকা দরকার।’
সিএসআর থেকে ব্যবসায় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন?
সাইফের মা নাজমা আক্তারের সেই প্রশ্নে ফিরে আসা যাক, ‘প্যাকেটের গায়ে এত কথা লেখা থাকে। কিন্তু কোন তথ্য দেখে আমি বুঝব খাবারটি আমার সন্তানের জন্য কতটা ভালো?’
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর থাকা দরকার। কারণ শিশুরা নিজের খাবারের বাজার তৈরি করেনি। কিন্তু সেই বাজারের গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তাদের একটি অংশ তারা। তাই শিশুর জন্য তৈরি একটি খাবারের মান বিচার করতে শুধু তার স্বাদ, প্যাকেটের আকর্ষণ বা সামনে লেখা পুষ্টির দাবি দেখলেই হবে না। দেখতে হবে খাবারটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, পণ্যের তথ্য কতটা স্বচ্ছ, কীভাবে তা বাজারজাত করা হচ্ছে, শিশুর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং কোনো অভিযোগ বা ঝুঁকি দেখা দিলে প্রতিষ্ঠান কী ব্যবস্থা নিচ্ছে।
একটি প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য বৃত্তি দিতে পারে, স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারে, পুষ্টি কর্মসূচি চালাতে পারে। এসব উদ্যোগ করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু শিশুর অধিকার রক্ষার প্রশ্নটি সেখানে শেষ হয় না।
প্রতিষ্ঠানের তৈরি পণ্য, বিপণনের ধরন, প্যাকেজিং, তথ্য প্রকাশ, ভোক্তার নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ওপর প্রভাব —এসবও তার দায়বদ্ধতার অংশ। অর্থাৎ সামাজিক দায়বদ্ধতা শুধু প্রতিষ্ঠানের বাইরে করা কোনো উদ্যোগ নয়। প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তার মধ্যেও সেই দায়বদ্ধতার প্রকাশ থাকা দরকার।
একটি প্রতিষ্ঠান কত টাকা সামাজিক কাজে ব্যয় করেছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার পাশাপাশি আরও বড় প্রশ্ন হলো— প্রতিষ্ঠানটি যে ব্যবসা করছে, সেই ব্যবসা কি শিশুর অধিকার, স্বাস্থ্য ও কল্যাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
শিশুর প্লেটে শেষ পর্যন্ত কী যাচ্ছে, সেই সিদ্ধান্ত শুধু পরিবারের হাতে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, বাজার, নীতিনির্ধারক এবং ভোক্তার দায়িত্বও। তাই শিশু অধিকারভিত্তিক করপোরেট দায়বদ্ধতার আসল পরীক্ষা হয় শুধু একটি সিএসআর কর্মসূচিতে নয়। বরং প্রতিদিনের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.