অফিস থেকে ফেরার পথে প্রায় প্রতিদিনই দশ/এগারো বছরের শেফালিকে দেখতাম বিজয় সরণি মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করছে। মাঝেমাঝে আমিও ফুল নিতাম ওর কাছ থেকে। ফুলগুলো খুব একটা সতেজ থাকতো না কিন্তু তাও ওর কাছ থেকেই কিনতাম। কেমন জানি মায়া পড়ে গিয়েছিল অনাথ এই শিশুটির ওপর।
কথা বলে জেনেছিলাম ওরা দুই ভাইবোন এখানেই থাকে ফুটপাতের ওপর। নদীতে ঘর ভেঙে যাওয়ায় কুড়িগ্রাম থেকে শহরে এসেছিল মা-বাবার সাথে। কিছুদিন পর বাবা চলে গেছে ওদের ছেড়ে, মা মারা গেছে। এর মানে শেফালি আর আর ওর ভাই সিরাজ দুজনই পথশিশু। পথই ওদের ঘর, পথই ওদের পরিচয়।
এইভাবেই কয়েকমাস চলে গেল। হঠাৎ লক্ষ করলাম কদিন ধরে শিউলিকে দেখছি না। সঙ্গী-সাথীদের দু’একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, ‘শেফালি চইলা গেছে। সিরাজ টেম্পোর হেলপার হইছে।’
শেফালি কোথায় চলে গেল, এই কথা ওরা জানে না। কিন্তু আমি ধারণা করতে পারি পথশিশুগুলো কোথায় হারিয়ে যায়, কীভাবে হারিয়ে যায়? শিউলিকে হয় কেউ তুলে নিয়ে গেছে, অথবা ও নিজেই কারও সাথে চলে গেছে, অথবা রেপ ভিক্টিম হয়ে হাসপাতালের মর্গে মরে পড়ে আছে অথবা কোনো অজানায় হারিয়ে গেছে। হ্যাঁ, এটাই আমাদের মেয়ে পথশিশুদের ভাগ্য। আর ছেলেশিশুগুলো হয় কিশোর গ্যাং, মাদকসেবী বা মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্য বা রাজনৈতিক কর্মীদের সাথী।
শেফালি ও সিরাজের মতো ঠিক কত পথশিশু বাংলাদেশে আছে, এর সঠিক কোনো সংখ্যা সরকারি গণনায় নেই। কারণ সরকার এদের নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন নয়। যদিও বাবা-মা ও পরিবার-পরিজন হারা এই শিশুদের অভিভাবক রাষ্ট্র স্বয়ং, কিন্তু রাষ্ট্রের মাথাব্যথা ও উদ্যোগ সবচেয়ে কম। সমাজেরও তেমন কোনো চিন্তাভাবনা নেই।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনে ২০২৪ সালে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে আনুমানিক ৩৪ লাখের বেশি শিশু পিতা-মাতার যত্ন ছাড়া বা আংশিক/পুরোপুরিভাবে পথের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছে।
এর আগের এক জরিপে বিবিএস ও ইউনিসেফ বলছে, সরাসরি রাস্তায় বসবাস ও কাজ করা ১৫-১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ঢাকায় আনুমানিক ১ লাখের বেশি এবং সারা দেশে কয়েক লাখ শিশু সরাসরি রাজপথে থাকে।
এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত। মোট পথশিশুর একটি বড় অংশ (প্রায় ৫০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ) অবস্থান করে রাজধানী ঢাকা শহরের বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন, লঞ্চঘাট ও ট্রাফিক সিগন্যালগুলোয়। এছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা এবং রাজশাহীর মতো বড় বিভাগীয় শহর ও নদীবন্দরগুলোয় তাদের উপস্থিতি বেশি।
কেন পরিবার-পরিজন হারিয়ে এতগুলো শিশু পথশিশুর তালিকায় নাম লেখায়? এরা অনেকেই নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গৃহহীন হয়। পরিবারের সাথেই স্থানীয় অভিবাসী হয়ে শহরে আসে এবং একসময় বাবা-মা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
বাসা বা পরিবারে অবহেলা ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে অনেক শিশু পালিয়ে শহরে চলে আসে। আবার একটি অংশ পাচারকারী চক্র বা দালালদের খপ্পরে পড়ে ভিক্ষুক ও টোকাই হয়ে যায়।
যে বয়সে তাদের মা-বাবার কোলে থাকার কথা, স্কুলে যাওয়া, মাঠে খেলা ও নেচে-গেয়ে আনন্দ করার কথা; সেই বয়সেই এদেশের লাখ লাখ শিশু-কিশোরের জীবন থমকে গেছে রাস্তার ধুলোবালিতে, হাটে-বাজারে, অপরাধীদের আস্তানায় এবং যৌনপল্লীতে। এই বাচ্চাগুলো আমাদের সমাজেরই সন্তান, কিন্তু চরমভাবে উপেক্ষিত।
মা-বাবার বিচ্ছেদ কিংবা বাবা-মায়ের মৃত্যুর ফলে এই শিশুরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। অবহেলা ও চরম দারিদ্র্য এদের আশ্রয়হীন করে। এদেরই আমরা পথশিশু হিসেবে চিনি, পথশিশু নামে ডাকি। এরাই এদেশের ঠিকানা, পরিচয়হীন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানব সন্তান।
এই ‘পথশিশু’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ট্রাফিক সিগনালে ফুল বিক্রেতা শিশু, বাসস্ট্যান্ডের শিশু হকার ছেলেটি, টেম্পো চালকের সহযোগী বাচ্চাটি, হাতে করে চুড়ি, চিরুনি ও রাবারব্যান্ড বিক্রেতা ছোট্ট মেয়েটি, কিংবা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চট বিছিয়ে শুয়ে থাকা অসহায় কিছু শিশু মুখ।
যে বয়সে তাদের মা-বাবার কোলে থাকার কথা, স্কুলে যাওয়া, মাঠে খেলা ও নেচে-গেয়ে আনন্দ করার কথা; সেই বয়সেই এদেশের লাখ লাখ শিশু-কিশোরের জীবন থমকে গেছে রাস্তার ধুলোবালিতে, হাটে-বাজারে, অপরাধীদের আস্তানায় এবং যৌনপল্লীতে। এই বাচ্চাগুলো আমাদের সমাজেরই সন্তান, কিন্তু চরমভাবে উপেক্ষিত।
পথশিশুরা অভিভাবকহীন বলেই বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও শিক্ষার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। কিন্তু তা তো হওয়ার কথা নয়। এই পথশিশুদের দেখাশোনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাদের সুরক্ষা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক।
সংবিধান, জাতীয় শিশু নীতি ও আন্তর্জাতিক সনদ বলছে, পথশিশুদের প্রতি রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হচ্ছে তাদের সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা দেওয়া। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।
শুধু তাই নয়, বলা হচ্ছে অভিভাবক ও আশ্রয়হীন এই শিশুদের অবহেলা ও শোষণ থেকে সুরক্ষা দেবে রাষ্ট্র। শিশুদের সুবিধার্থে বিশেষ বিধান তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র পথশিশুদের যেকোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন ও শ্রম শোষণ থেকে সুরক্ষা দিতে বাধ্য।
সেইসাথে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিকল্প যত্ন, বিনামূল্যে চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান ও সেফ হোম স্থাপন, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ও সুরক্ষার দায়িত্ব সরাসরি রাষ্ট্রের ওপর অর্পিত। সংবিধান অনুযায়ী পথশিশুদের শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। অথচ রাষ্ট্র কি সেই দায়িত্ব পালন করছে? না করছে না। এই বিষয়ে রাষ্ট্রের তেমন কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ে না।
পথশিশুদের সবচেয়ে কষ্টকর ও দুঃখজনক দিক হচ্ছে এই শিশুরা, বিশেষ করে কন্যাশিশুরা, প্রতিদিন নানা রকমের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে। খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী এই শিশুরা পথেঘাটে ধর্ষণের শিকার হয় এবং বিক্রি হয়ে যায় যৌনপল্লীতে। এরপর হয়তো একদিন পৃথিবী থেকেই হারিয়ে যায়।
সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের একটি বড় অংশ ‘ড্যান্ডি’সহ মারাত্মক সব মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পথশিশুদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে মাদকে আসক্ত। এই হার ৫৮ শতাংশ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় অপরাধী চক্র, কিশোর গ্যাং এবং অসাধু রাজনীতিকরা এদের অবৈধ কাজে যেমন মাদক বহন, পিকেটিং ও হামলার কাজে ব্যবহার করে।
এই বাচ্চাগুলো পুনর্বাসনের জন্য সরকার এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এনজিও এর ফান্ড আছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন পুনর্বাসন কেন্দ্র ও পথশিশু প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।
তবে চাহিদার তুলনায় এসব সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পরিধি ও কার্যক্রম বেশ সীমিত ও দুর্বল। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং সঠিক তথ্য-উপাত্ত না থাকায় অনেক সময় সহায়তা সঠিক শিশুদের কাছে পৌঁছায় না।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র ও সমাজের এতগুলো মানুষ যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে তাহলে কি পথশিশু সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অসম্ভব হবে?
দেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে এই পথশিশুর সংখ্যা মাত্র ৩০ লাখ। সবাই মিলে উদ্যোগ নিলে সঠিক জরিপ, জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিতকরণ ও পুনর্বাসন করা সম্ভব। এতে করে তারা সরকারি সেবাগুলো সহজে পাবে।
পাশাপাশি মাদক ও নির্যাতন রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেন, অপরাধী চক্র শিশুদের অসাধু কাজে ব্যবহার করতে না পারে। আমাদের মধ্যে অনেকেরই পথশিশুদের অপরাধী বা অস্পৃশ্য ভাবার মানসিকতা আছে। কিন্তু তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে আমাদের, কারণ এরা সমাজেরই সন্তান।
বিপদের কথা হচ্ছে এই পথশিশুরা সমাজচ্যুত কিন্তু সমাজের বাইরের নয়, এরা সমাজের মধ্যেই চলাফেরা করে। এদের যদি আমরা মাদক ও অপরাধ জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে সমাজের অন্যান্য শিশু-কিশোরদেরও ওই পথে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
পথশিশুদের একটি সুস্থ জীবন দেওয়া শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, বরং সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি সংবেদনশীল ও সচেতন হয়, তবে যেকোনো বড় সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
শাহানা হুদা রঞ্জনা : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.