১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন ঘিরে নানান প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহার ঘোষণা করছে রাজনৈতিক দলগুলো। দলগুলোর কাছে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যবসার ভালো পরিবেশের প্রতিশ্রুতি চাইছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা।
অর্গানিক কসমেটিক্সের প্রতিষ্ঠান ‘রিবানা’। ২০২৫ সালে জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান। বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের মতো ছোট উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা খুবই সাধারণ। প্রতি মাসের এক তারিখে যেন টিম মেম্বারদের বেতন দিতে পারি ও দেশের সামগ্রিক পরিবেশটা স্মুথ থাকে, এটাই সবচেয়ে বড় চাওয়া। এজন্য দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সবার আগে দরকার।’
তিনি বলেন, ‘ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দুর্নীতি। ট্রেড লাইসেন্স থেকে শুরু করে ব্যাংকিং, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট, প্রতিটি স্তরে এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। যদি এসব প্রক্রিয়া আরও বেশি ডিজিটালাইজ করা যায়, তাহলে নতুন উদ্যোক্তারা অনেকটাই স্বস্তি পাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর এসব বিষয়ে অগ্রাধিকার ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রয়োজন।
ব্যাংকিং খাতের সমস্যা প্রসঙ্গে এই উদ্যোক্তা বলেন, ব্যবসা শুরুর সময় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার মতো ছোট লোন কোনো ব্যাংক দিতে চায় না। ব্যাংকের কর্মকর্তারা এই রিস্ক নিতে চান না। অথচ এই ছোট ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট না পাওয়ার কারণেই অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা ছেড়ে চাকরিতে চলে যেতে বাধ্য হন। এই জায়গাটায় সাপোর্ট বাড়ানো গেলে অনেক উদ্যোক্তাকে ঝরে পড়া থেকে বাঁচানো সম্ভব। আমরা চাই রাজনৈতিক দলগুলো এসব বিষয়ে প্রতিশ্রতি দেবেন।
হস্ত ও কারুশিল্প এবং তাঁত ও বুটিকস পণ্যের প্রতিষ্ঠান ‘সুতার কাব্য’। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা মোছাম্মৎ সিরাজুম মনিরাও ২০২৫ সালে জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন। বর্ষসেরা এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা দেশ একটা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকুক, যেন আমরা ভালোভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারি। নির্বাচিত সরকার না থাকলে অন্য দেশের বিনিয়োগকারী কমে যায়, এক্সপোর্টেও সমস্যা হয়। বাইরের লোকজন দেশে এসে বিনিয়োগ করতে চায় না। আমাদেরও প্রোডাক্ট পাঠাতে সমস্যা হয়, দেশের মধ্যেও বেচাকেনা কমে যায়। আমাদের মতো ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য তখন খুব কষ্ট হয়ে যায়।’
সিরাজুম মনিরা বলেন, নির্বাচনে থাকা রাজনৈতিক দল ও ভবিষ্যত সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া-দেশে যেন ব্যবসা-বাণিজ্যের একটা ভালো পরিবেশ থাকে। আমরা যেন সুন্দর ও সুস্থভাবে বেচাকেনা করতে পারি, কর্মচারীদের ঠিকমতো বেতন দিতে পারি। এটাই আমাদের মূল প্রত্যাশা।’
এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘সেফটি ও সিকিউরিটির একটা বড় বিষয় আছে। কোনো কিছু হলেই ব্যবসা বন্ধ করে রাখতে হয়। আবার অর্থ প্রাপ্তির দিক থেকেও সমস্যা হচ্ছে। এখন ব্যাংকগুলো ঠিকমতো লোন দিতে চায় না। লোন নিলেও আমাদের টেনশন থাকে বেচাকেনা কম থাকার কারণে ইনস্টলমেন্ট ঠিকমতো দিতে পারবো কি না। এটা একটা বড় দুশ্চিন্তার জায়গা।
সিরাজুম মনিরা বলেন, আরেকটা বড় সমস্যা হচ্ছে কাঁচামালের দাম। পাটের দাম বেড়ে গেছে, সুতার দাম বেড়ে গেছে। যেগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যেমন ইন্ডিয়া থেকে সুতা আসে। এখন বিভিন্ন কারণে আমদানিতে সমস্যা হওয়ায় দেশের ভেতর কাঁচামালের দাম অনেক বেড়ে গেছে। আমরা কিন্তু প্রোডাক্টের দাম সেইভাবে বাড়াতে পারি না। এতে করে আমাদের লাভের জায়গাটা কমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, যদি পাটকলগুলো আবার চালু করা যায়, পাটের সুতা যদি আমাদের দেশেই উৎপাদন করা যায়, তাহলে আমরা দেশি কাঁচামাল কম দামে কিনতে পারবো। এতে কাঁচামালের অর্থ দেশের ভেতরেই থাকবে ও আমাদের মতো উদ্যোক্তাদের জন্য কাজ করা সহজ হবে।
মাত্র দুই বছরেই চামড়া শিল্পে বাজিমাত দেখিয়েছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাহমিনা আক্তার শাম্মী। চামড়াজাত পণ্যে দেশ ও দেশের বাইরে ভালো ব্যবসা করছে শাম্মীর ‘অর্লিনস লেদারস অ্যান্ড ফুটওয়্যার’। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাম্মী বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমাদের প্রত্যাশা- জটিল শর্ত ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে স্বল্পসুদে ঋণ পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা। নতুন ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য কর অবকাশ ও ভ্যাটের হার কমানো দরকার। ডিজিটাল মার্কেটিং ও রপ্তানিমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো দরকার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণে সহযোগিতা, পণ্য ব্র্যান্ডিং ও রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ- এগুলো আমাদের প্রত্যাশা।
তাহমিনা আক্তার শাম্মী বলেন, যারা ক্ষমতায় আসবেন তারা যেন নীতি স্থিতিশীলতা ও হয়রানি বন্ধ এবং বাংলা ও ইংরেজিতে ট্রেড লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা করা, লজিস্টিক সাপোর্ট ও ক্ষুদ্র শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যবসার খরচ কমানো প্রয়োজন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে শুধু কথা নয়, বাস্তবায়নযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ দেখতে চাই, যাতে আমরা টিকে থাকতে পারি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারি।
ফেসবুক পেজ ও শোরুমের মাধ্যমে জামদানি, টাঙ্গাইলের শাড়ি ও বাটিক থ্রি-পিস বিক্রি করে ‘তনয় ক্রিয়েশন’। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ক্যানসারজয়ী কানিজ ফাতেমা তানিয়া বলেন, আমরা অবশ্যই একজন ভালো মানুষ চাই, যে আমাদের সর্বপ্রকার সহযোগিতা করবে। আমরা চাই সন্ত্রাসমুক্ত, আদর্শবান একজন প্রার্থী, যে আমাদের পাশে দাঁড়াবে ও জনগণের হয়ে কাজ করবে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের যে পরিস্থিতি, তাতে আমাদের ব্যবসায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের প্রোডাক্ট ঠিকমতো বিক্রি করতে পারছি না। কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে, ফলে উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
ব্যবসায়িক সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের অস্থিরতার কারণে মানুষ এখন কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে। এতে আমাদের ব্যবসায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, যা আমাদের জন্য খুবই খারাপ অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
টাঙ্গাইলের এসএমই উদ্যোক্তা কানিজ ফাতেমা তানিয়া আরও বলেন, আমরা চাই একজন যোগ্য প্রার্থী আসুক, যিনি আমাদের সমস্যাগুলো বুঝবেন ও আমাদের জন্য ভালো কিছু করবেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.