আগামী বছরের হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরুর পাঁচদিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন মাত্র ৭৩ জন। তাদের সবাই সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যেতে আগ্রহী। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এখনো একজনও প্রাথমিক নিবন্ধন করেননি।
হজ এজেন্সির মালিকরা বলছেন, বিমান ভাড়া কিছুটা কমলেও সৌদি আরবে আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য সেবার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় হজের সার্বিক ব্যয় কমেনি। এর সঙ্গে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও খুব একটা অনুকূলে নয়। ফলে গত দুই বছরের মতো ২০২৭ সালেও বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রীর সংখ্যা আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী বছরের ১৫ মে (৯ জিলহজ ১৪৪৮ হিজরি) পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ থেকে এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজযাত্রী হজ পালনের সুযোগ পাবেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, হজের কোটা অপরিবর্তিত থাকলেও সেই কোটা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
২০২৭ সালের হজের জন্য প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু হয়েছে গত ২৭ জুলাই। সৌদি আরবের রোড ম্যাপ অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি উভয় ব্যবস্থাপনায় আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিক নিবন্ধন করা যাবে। প্রাথমিক নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) পর্যন্ত প্রাথমিক নিবন্ধনের প্রথম পাঁচদিনে মোট ৭৩ জন হজযাত্রী নিবন্ধন করেছেন। তাদের সবাই সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এখন পর্যন্ত একজনও প্রাথমিক নিবন্ধন করেননি।
ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রাক-নিবন্ধিত ব্যক্তিরা চাইলে ঘোষিত হজ প্যাকেজের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করে একই সঙ্গে চূড়ান্ত নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারবেন। অন্যথায়, আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে প্যাকেজের অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ করে চূড়ান্ত নিবন্ধন করতে হবে।
৩০ হাজার টাকা প্রণোদনা ও হজ পালনের সুযোগ
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, ‘সৌদি আরবের নির্ধারিত রোডম্যাপ অনুযায়ী প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। ফলে নিবন্ধনের সময় বাড়ানোর সুযোগ নেই। যারা হজে যাবেন, তারা অনেক আগে থেকেই নিয়ত করে রাখেন। ঘোষণার অপেক্ষায় ছিলেন। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তারা নিবন্ধন করবেন।
হজযাত্রী নিবন্ধনের সময় কম থাকায় এটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু এজেন্সি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে হজে যাওয়ার জন্য। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নিবন্ধন শেষ করতে হবে।
নিবন্ধনের সময় বাড়ানো হতে পারে কি না, জানতে চাইলে ধর্ম সচিব বলেন, ‘সুযোগ নেই। সৌদি আরবের একটি রোডম্যাপ রয়েছে। কোন সময় কোন ধাপ সম্পন্ন হবে, তা নির্ধারিত।’
হজ এজেন্সি মালিকরা জানিয়েছেন, সৌদি সরকার প্রতি বছরই হজ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনছে। এবারও বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনায় খরচ বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়বে হজযাত্রীর সংখ্যায়।
হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘সৌদি সরকারের নতুন নিয়মে ক্যাটারিং সার্ভিস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ডি ক্যাটাগরি প্রত্যাহারসহ আরও বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যে হজ পালন করা কঠিন ও অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। আমরা বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আপনাদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।’
হাবের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব মাওলানা ইয়াকুব শরাফতী মনে করেন, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব এবারও হজযাত্রায় পড়বে।
মাওলানা ইয়াকুব শরাফতী বলেন, ‘আগে হজের কোটার চেয়ে চাহিদা বেশি ছিল। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে হচ্ছে, এ বছর হজযাত্রীর সংখ্যা খুব একটা বেশি হবে না। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে হজযাত্রীর সংখ্যা বাড়ে।’
তিনি বলেন, সরকার বিমান ভাড়া কিছুটা কমাতে সক্ষম হলেও সৌদি আরবে আবাসন, পরিবহন, মোয়াল্লেম, ক্যাটারিংসহ বিভিন্ন সেবার ব্যয় বেড়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে হজের ব্যয় কমেনি। একই সঙ্গে দেশের মানুষের আর্থিক সক্ষমতাও আগের মতো নেই। এ কারণে গত বছরের তুলনায় এবার হজযাত্রীর সংখ্যা আরও কম হতে পারে।
‘একমাত্র অ্যাড্রেস করার জায়গা হচ্ছে টিকিটের দাম। সৌদি সরকারের নির্ধারিত সেবার ব্যয়ে সরকার বা এজেন্সির কোনো হাত নেই’ বলেন হজ এজেন্সি এয়ার টাচের লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী।
তিনি আরও বলেন, ‘হজ টিকিটে কোনো সিন্ডিকেট যেন না হয়। হাজিদের যেন কোনো জায়গায় বা কারও কাছে যেতে বাধ্য করা না হয়। তারা যাতে নিজেদের পছন্দের এজেন্সির মাধ্যমে হজে যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’
বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের হজ কোটা পাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই কোটা পূরণ হচ্ছে না।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি হজ পালন করেন ২০১৭ সালে। ওই বছর কোটার পুরো এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনই হজ পালন করেন। অন্যদিকে ২০০৯ সালে মাত্র ৫৮ হাজার ৬২৮ জন বাংলাদেশি হজ পালন করেন, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
করোনা মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে স্বাভাবিক হজ কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ২০২২ সালে সীমিত পরিসরে বাংলাদেশের কোটা ছিল ৬০ হাজার। ওই বছর হজ পালন করেন ৫৯ হাজার ৯১৬ জন।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ২০২৩ সালে আবারও এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের কোটা ফিরে আসে। কিন্তু সে বছর হজ পালন করেন এক লাখ ২৩ হাজার ২১৮ জন। অর্থাৎ কোটার তুলনায় প্রায় চার হাজার কম মানুষ হজে যান।
এরপর থেকে ব্যবধান আরও বাড়তে থাকে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮৭ হাজারের বেশি মানুষ হজ পালন করেন। সময়সূচি এগিয়ে আসা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য কারণে ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা আরও কমে দাঁড়ায় ৭৮ হাজার ৫০০ জনে। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ছিলেন ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন।
হজ সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, ডলারের উচ্চ মূল্য, সৌদি আরবে সেবার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব হজযাত্রীর সংখ্যায় স্পষ্টভাবে পড়ছে।
আগামী বছরের হজে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় তিনটি প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্যাকেজ-১ এর মাধ্যমে হজ পালনে খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ১৫ হাজার ২৬৩ টাকা। সাশ্রয়ী প্যাকেজ-২ এর খরচ ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা।