আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরের তুলনায় এখন প্রায় ২৫-২৯ শতাংশ বেশি। সরকারি নীতি অনুযায়ী প্রতি মাসে ভোজ্যতেলের দাম পুনর্নির্ধারণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা জানিয়ে কয়েক দফায় দেশে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও দেন মিল মালিক ও আমদানিকারকরা। তবে ভোক্তার ওপর চাপ বিবেচনায় সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর লিটারপ্রতি ৫ টাকা দাম বাড়ানোর সম্মতি দেয় সরকার। একই সঙ্গে স্বল্প সময়ের মধ্যে আবারো মূল্য সমন্বয়ের আশ্বাস দেয়া হয়।
বাজারসংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকার একবারে বড় ধরনের মূল্য সমন্বয়ের পরিবর্তে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করায় অনেক কোম্পানি পরবর্তী মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষায় সরবরাহ সীমিত রেখেছে। ফলে বাজারে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিনের সংকট দেখা দিয়েছে, যা বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। এর প্রভাবে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের চাহিদা বেড়েছে, পাশাপাশি দামেও ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ ভোজ্যতেলই আমদানি করতে হয় বিশ্ববাজার থেকে। বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি পিঙ্কশিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের গড় দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১৫৪ ডলার। জুলাই-সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৩৭ ডলারে। চলতি বছর দাম আরো বেড়ে জুনে টনপ্রতি ১ হাজার ৭৪০ ডলারে ওঠে, যা গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরের গড়ের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি। এরপর কিছুটা নিম্নমুখী হলেও দাম এখনো গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। জুলাইয়ে টনপ্রতি দাম ছিল ১ হাজার ৬৫৮ ডলার, আগস্টে ১ হাজার ৬৩৮ ডলার এবং সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৬০০ ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ জুনের চূড়া থেকে দাম কমলেও গত বছরের একই সময়ের গড়ের তুলনায় সেপ্টেম্বরে তা এখনো প্রায় ২৫-২৯ শতাংশ বেশি।
বিপরীতে চলতি বছর দেশের বাজারে দুই দফায় দাম বাড়ানো হলেও আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করা হয়নি। প্রথম দফায় ২৯ এপ্রিল প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ থেকে ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সময়ে পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৫৫ থেকে বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়। এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর আবারো দাম সমন্বয় করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা, পাঁচ লিটারের দাম ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা এবং খোলা সয়াবিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
দেশের বৃহৎ ভোজ্য বাজারে ব্যবসা করছে হাতে গোনা কয়েকটি আমদানিকারক ও মোড়কজাতকারী প্রতিষ্ঠান। সরকারি নীতি অনুযায়ী প্রতি মাসে ভোজ্যতেলের দাম পর্যালোচনা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা নিয়মিত হয় না। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপের আশঙ্কায় সরকার সাধারণত মূল্য সমন্বয়ে ধীরে চলো নীতি নেয়।
মিল মালিক ও আমদানিকারকদের দাবি, প্রতিবার তারা যে হারে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন, সরকার তার এক-তৃতীয়াংশও অনুমোদন করেনি। দেশীয় বাজার পরিস্থিতি, ভোগ্যপণ্যের মূল্য অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা এবং রমজানসহ বিভিন্ন সংকটকালে ভোক্তাস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক দামের চেয়েও কম মূল্যবৃদ্ধিতে সম্মত হতে তাদের অনুরোধ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে স্বল্প সময়ের মধ্যে আবারো দাম সমন্বয়ের আশ্বাস দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর দেশে সর্বশেষ মূল্য সমন্বয়ের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দামে উল্লম্ফন ঘটে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমদানি করা সয়াবিন তেলের কস্টিং লিটারপ্রতি ২১১ টাকায় উঠলেও রমজানে ভোক্তার ওপর চাপ না বাড়াতে সরকারের অনুরোধে তখন দাম সমন্বয় করা হয়নি। আমদানিকারকদের দাবি, দীর্ঘ আলোচনার পর ২৯ এপ্রিল লিটারপ্রতি মাত্র ৪ টাকা দাম বাড়ানো হয়। অল্প সময়ের মধ্যে আবারো মূল্য সমন্বয়ের আশ্বাস দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তী তিন মাসে সয়াবিন তেলের কস্টিং লিটারপ্রতি ২১৭ টাকায় উঠলেও বিক্রয়মূল্য ছিল ১৯৯ টাকা। এতে লিটারপ্রতি প্রায় ১৮ টাকা লোকসান হয়েছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা।
গত ২ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ভোক্তাস্বার্থ বিবেচনায় লিটারপ্রতি ৫ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় সরকার। এতে আপত্তি জানান ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, এত কম মূল্য সমন্বয় হলে আমদানিকারকদের বড় অংকের লোকসান গুনতে হবে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। পরে স্বল্প সময়ের মধ্যে আবারো মূল্য সমন্বয়ের আশ্বাস দেয় সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে লিটারপ্রতি ৫ টাকা দাম বাড়াতে সম্মত হন আমদানিকারকরা। নতুন মূল্য ৩ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়।
নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও বাজারে বোতলজাত সয়াবিন সরবরাহ আশানুরূপ বাড়েনি। বাজারসংশ্লিষ্টদের দাবি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করায় অনেক কোম্পানি পরবর্তী সমন্বয়ের অপেক্ষায় সরবরাহ সীমিত রেখেছে। শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর বিপণন প্রতিনিধিরা নিয়মিত বাজারে না আসায় প্রয়োজন অনুযায়ী ভোজ্যতেল সংগ্রহ করতে পারছেন না খুচরা বিক্রেতারা। এর প্রভাব পাইকারি ও খুচরা বাজারে। বিশেষ করে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিনের সংকট তৈরি হয়েছে, তবে পাঁচ লিটারের বোতলজাত ভোজ্যতেল তুলনামূলকভাবে পাওয়া যাচ্ছে। সংকটের সুযোগে কোথাও কোথাও মোড়কে লেখা দামের চেয়েও বেশি দামে বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের চাহিদা।
বিষয়টি স্বীকার করেন ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘দাম বাড়ানোর পর সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করছি। চলতি সপ্তাহে সার্বিক ভোগ্যপণ্য বাজার নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এসব বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকও রয়েছে। আশা করি সরকার ও আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান বের করা সম্ভব হবে।’
জানা গেছে, বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) সয়াবিন তেল ৭ হাজার ৫০০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে, যা দেড় মাস আগেও ছিল ৭ হাজার ২০০ টাকা। একই সময়ে পাম অয়েলের দাম মণপ্রতি ৩০০ টাকা বেড়ে ৬ হাজার ৬০০ টাকায় উঠেছে। সুপার পাম অয়েল লেনদেন হচ্ছে মণপ্রতি ৬ হাজার ৮০০ টাকায়। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন ২০৮-২১০ টাকা, পাম অয়েল ১৭৫-১৮০ টাকা এবং সুপার পাম অয়েল ১৯০-১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করলেও এর উল্টো প্রভাব পড়ছে সরবরাহে। কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেয়ায় ভোক্তাদের অনেক ক্ষেত্রে মোড়কে উল্লেখিত দামের চেয়েও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। খোলা ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারিত থাকলেও মোড়ক না থাকায় অতিরিক্ত মূল্য নেয়ার বিষয়টি শনাক্ত করাও তুলনামূলক কঠিন। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, দাম সমন্বয়ে বিলম্বের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাজারে বাড়তি দাম দিয়ে পণ্য কিনতে হচ্ছে তাদের।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের বাণিজ্য নীতি বিভাগের উপপ্রধান মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের বিষয়টি ট্যারিফ কমিশনের কাজ নয়। প্রায় প্রতি মাসেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ভোজ্যতেলের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করে একটি যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করতে বলা হয়। আমরা নির্দেশনা অনুযায়ী একটি প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেই।
দেশের ভোজ্যতেলের বাজার, দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পর্কে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আগামী মাস থেকে ভোজ্যতেলের চাহিদা বাড়তে থাকবে। সে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক আছে, সেটা বোঝা জরুরি। সরকার দর বেঁধে দিলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ক্যালকুলেশনে লোকসানের আভাস পাওয়া গেলে আমদানিকারকরা কেন পণ্য আমদানি করবে?’ নিত্যপণ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারের এ ধরনের নীতির ফলে ভোজ্যতেল আমদানিকারকের তালিকা অনেক ছোট হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর পর গত কয়েক সপ্তাহে পাইকারিতে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম কেজিতে ৬ টাকারও বেশি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও দেশে নিয়মিত মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় এর প্রভাব খোলা তেলের বাজারে বেশি পড়ছে বলে তাদের দাবি। সরকার লিটারপ্রতি ৫ টাকা দাম বাড়ালেও গত দেড় মাসে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম বেড়েছে লিটারপ্রতি ৬-৭ টাকা।
ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিলম্ব বা দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, ‘দীর্ঘসূত্রতা এবং বিলম্ব হয় এমন অভিযোগ সঠিক নয়। ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সরকারকে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনায় নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি মূল্য, স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি এবং মজুদের অবস্থা বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.