গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে। বেশিরভাগ কারখানায় উৎপাদন কমেছে, কোথাও বন্ধ রাখতে হয়েছে কার্যক্রম।
তবে ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারের ৪এ ইয়ার্ন ডায়িং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানায় পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে এখনো শ্রমিকেরা নিয়মিত হুডি তৈরি করছেন, পোশাকে ব্র্যান্ডের লোগো লাগাচ্ছেন।
ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও নেক্সটের মতো ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সাল থেকে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করেছে। সৌরবিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিজেলনির্ভর নিজস্ব ব্যবস্থার কারণে জাতীয় গ্রিডের ওপর তাদের নির্ভরতা তুলনামূলক কম।
৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে সৌরশক্তি থেকে
৪এ ইয়ার্ন ডায়িংয়ের কারখানায় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ মানুষ কাজ করেন। কারখানাটি প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের প্রায় ৪০ শতাংশ সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদন করে। বাকি বিদ্যুতের বড় অংশ আসে নিজস্ব গ্যাস ও ডিজেলচালিত জেনারেটর থেকে।
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম মালিক আবদুল্লাহ হিল নাকিব বলেন, তারা কখনো একটি মাত্র জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর করেননি। সব সময় বিকল্প ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা করেছেন।
তবে জ্বালানি সংকটের কারণে তাদেরও খরচ বেড়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে। প্রথমে তেলের সংকট ছিল, পরে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে।
নাকিবের হিসাবে, ডিজেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়েছে। এতে মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ লাখ টাকা জ্বালানির পেছনে খরচ হচ্ছে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে কমছে পোশাকের অর্ডার
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে জ্বালানি সংকটের প্রভাব আরও ব্যাপক। সাম্প্রতিক এক জরিপে ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার তথ্য নেওয়া হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে ৫৫ শতাংশ কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল বা কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
আর ৭৮ শতাংশ কারখানা কোনো না কোনো পর্যায়ে উৎপাদন কমিয়েছে বা আংশিকভাবে বন্ধ রেখেছে।
এ কারণে পণ্য পাঠাতে দেরি হচ্ছে। কোথাও আবার ক্রেতাদের ধরে রাখতে কম দামে অর্ডার নিতে হচ্ছে।
বাড়ছে জ্বালানির দাম, চাপ বাড়ছে কারখানায়
বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের মধ্যে গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে আবার জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকেই বাড়তি খরচ করে আকাশপশে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিচ্ছেন।
পোশাক রপ্তানিকারক শাহিদুল্লাহ আজিম বলেন, তাদের মুনাফার পরিমাণ এমনিতেই খুব কম। জ্বালানির দাম বাড়ায় সেই মুনাফার ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।
তিনি জানান, কানাডার এক ক্রেতা আগে ২৫ হাজার পোশাক নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্তেআট হাজার পোশাকের অর্ডার দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতাদের আস্থার ওপর এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রতিযোগী দেশ নিয়ে উদ্বেগ:
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে পোশাকশিল্পের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।
তাই জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব শুধু কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, শুধু জ্বালানির বাড়তি খরচ বহন করাই সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়। গ্যাসের সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট আরও বেশি উদ্বেগের বিষয়।
তার মতে, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে একই মাত্রায় জ্বালানি সংকট না থাকায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার পরিকল্পনা:
ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকটের প্রভাব কমাতে ৪এ ইয়ার্ন ডায়িং বড় আকারের ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
কারখানাটির ছাদ প্রায় পুরোটাই সোলার প্যানেলে ঢাকা। নতুন ব্যাটারি ব্যবস্থা চালু হলে বিদ্যুতের কোনো উৎস সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
নাকিব বলেন, বাড়তি খরচ এখন তারা সামাল দিতে পারছেন। তবে দেশের সব পোশাক কারখানার পক্ষে এমন বাড়তি ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে তাই জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন খরচ, সরবরাহের সময় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা।
সূত্র: রয়টার্স