এক ইসলামি প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে ডা. জাকির নায়েককে প্রশ্ন করা হয়, আপনার মতে, কোরআনের তাফসিরের ক্ষেত্রে বা আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে ভালো তাফসির গ্রন্থ কোনটি?
উত্তরে ডা. জাকির নায়েক বলেন:
কোরআনের সবচেয়ে সেরা দুটি তাফসির গ্রন্থ হলো, ‘তাফসিরে তাবারি’ এবং ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’। প্রথমটি লিখেছেন ইমাম মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি, যিনি ২২৪ হিজরি সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৩১০ হিজরি সালে ইন্তেকাল করেন। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, তিনি তাফসিরে তাবারি থেকে ভালো আর কোনো তাফসির দেখেননি।
দ্বিতীয় তাফসিরটি লিখেছেন হাফেজ ইমাদ উদ্দিন ইসমাইল ইবনে ওমর ইবনে কাসির, যিনি ৭৭৪ হিজরি সালে ইন্তেকাল করেন। এটি তাবারির প্রায় সাড়ে চারশত বছর পরের কাজ। এই দুটি তাফসিরকেই আমি শ্রেষ্ঠ মনে করি।
তাফসিরে ইবনে কাসিরের বিশেষত্ব হলো, এই তাফসির গ্রন্থে বিভিন্ন মুফাসসিরদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি একত্রিত করা হয়েছে। ইবনে কাসির বিভিন্ন মুফাসসিরের মতামত উল্লেখ করে সেগুলোর ওপর মতামত দিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো মতামত না দিয়ে নিজের বিশ্লেষণের মাধ্যমে আগের তাফসিরগুলোর চমৎকার সংকলন তৈরি করেছেন। তাফসিরের ইবনে কাসির উচ্চ স্তরের গবেষক, পণ্ডিত ও সাধারণ জ্ঞান অন্বেষণকারী সবার জন্যই অত্যন্ত উপযোগী। তাবারি উচ্চ পর্যায়ের গবেষকদের জন্য বেশি উপযোগী।
আরবি ভাষায় আরও অনেক ভালো তাফসির রয়েছে। যেমন তাফসিরে কুরতুবি, জালাল উদ্দিন আল-মহল্লি ও জালাল উদ্দিন আস-সুয়ূতির লেখা ‘তাফসিরে জালালাইন’, ইত্যাদি।
যেহেতু প্রশ্নটি ইংরেজিতে করা হয়েছে, শ্রোতার নিশ্চয়ই জানার আগ্রহ রয়েছে ইংরেজিতে কোন তাফসিরটি সেরা।
দুঃখজনকভাবে তাফসিরে তাবারি এখনো ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি, তবে আলহামদুলিল্লাহ তাফসিরে ইবনে কাসির ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাই ইংরেজিতে পড়তে চাইলে ইবনে কাসিরের ইংরেজি অনুবাদই সবচেয়ে সেরা হবে। বেশ কিছু প্রকাশনী এটি অনুবাদ করেছে, তবে এর মধ্যে আমি রিয়াদের দারুস সালাম কর্তৃক প্রকাশিত সংস্করণটি বিশেষভাবে সুপারিশ করব। দারুস সালামের সংস্করণটিতে তাফসিরে ইবনে কাসিরে বিভিন্ন তাফসিরের যে সমস্ত বর্ণনা ও মতামত এসেছে, যার মধ্যে কিছু সঠিক এবং কিছু দুর্বল বা ইসরাঈলিয়াতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা মতামত ছিল, সেগুলোকে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।
সৌদি আরবের রিয়াদভিত্তিক দারুস সালামের পক্ষ থেকে শায়খ সাফিউর রহমান মুবারকপুরীর তত্ত্বাবধানে একদল গবেষক ও পণ্ডিতের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করা হয়েছিল। শায়খ সাফিউর রহমান মুবারকপুরী ‘আর-রাহীকুল মাকতুম’ গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তার নেতৃত্বে এই গবেষক দলটি ইবনে কাসিরের পুরো আরবি তাফসিরটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন। যে মতামতগুলো সঠিক ছিল না বা ভিত্তিহীন ছিল, সেগুলোকে তারা বাদ দিয়ে ইবনে কাসিরের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ তৈরি করেন। আলহামদুলিল্লাহ, এটি একটি মহৎ ও চমৎকার কাজ। এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণটি প্রথমে আরবিতে তৈরি হয়, পরে ইংরেজিতে অনূদিত হয়। তাফসিরে ইবনে কাসিরের ইংরেজি অনুবাদ হিসেবে দারুস সালামের এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণটিই আমি রেকমেন্ড করব।
এরপর দ্বিতীয় যে তাফসিরটি আমি রেকমেন্ড করব তা হলো আবদুর রহমান আস-সাদীর লেখা ‘তাফসির আস-সাদী’। এটিও অত্যন্ত চমৎকার একটি তাফসির। দারুস সালাম এটিও খুব সুন্দর ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে। ইংরেজি তাফসির গ্রন্থগুলোর মধ্যে এই দুটি তাফসিরই সেরা—প্রথমত ইবনে কাসির, দ্বিতীয়ত আস-সাদী। এ ছাড়া শায়খ আল-হিলালি ও ড. মুহাম্মদ মুসিনের লেখা ‘দ্য নোবল কুরআন’ও রয়েছে, কেউ চাইলে পড়তে পারেন।
কোরআনের অনুবাদ গ্রন্থগুলোর ক্ষেত্রে আমার মতে সবচেয়ে সেরা হলো আবদুল আলীমের অনুবাদ গ্রন্থ। আবদুল আলীমের অনুবাদ গ্রন্থে সাথে চমৎকার ব্যাখ্যা ও ফুটনোট বা পাদটীকা রয়েছে। ফলে এটিকে কেবল একটি সাধারণ অনুবাদ গ্রন্থ না বলে ছোটখাটো তাফসির গ্রন্থ বলা চলে, যদিও এটি তাবারি বা সাদীর মতো বিশাল নয়, বরং মাঝারি আকৃতির। আবদুল আলীম আরবি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন এবং এই গ্রন্থটি রচনার পেছনে তিনি প্রচুর সময় ব্যয় করেছেন। এই বইটির ইংরেজি ভাষাও চমৎকার। যে কোনো অনুবাদেই কিছু না কিছু ত্রুটি থাকতে পারে, আবদুল আলীমের অনুবাদেও কিছু ভুল ছিল, তবে এটি বহুবার সংশোধন করা হয়েছে।
আমি বিশেষ করে আমেরিকার ভার্জিনিয়ার ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক থট’ (IIIT) কর্তৃক প্রকাশিত আবদুল আলীমের অনুবাদের সংশোধিত সংস্করণটি পড়ার পরামর্শ দেব। এই সংশোধিত সংস্করণটিতে চমৎকার তাফসিরধর্মী ব্যাখ্যা ও ফুটনোট যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া আবদুল মাঈদের চার খণ্ডের অনুবাদটিও রয়েছে, যা মূলত তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের জন্য বেশ উপযোগী। আর আপনি যদি কেবল কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই সাধারণ ও সাবলীল ইংরেজির একটি সাধারণ অনুবাদ পড়তে চান, তবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অনুবাদগুলো দেখতে পারেন।
কোরআনের তাফসির ও অনুবাদ সম্পর্কে সংক্ষেপে এই হলো আমার উত্তর। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে কোরআনের সঠিক বুঝ ও মানহাজ নিয়ে আমার ভিডিও আলোচনাটি দেখতে পারেন, যেখানে আমি তাফসির ও অনুবাদ নিয়ে বিস্তারিত বলেছি।
সূত্র: হুদা টিভি
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.