একদিনের রিমান্ড শেষে আবার আদালতে হাজির করা হয়েছিল জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে আদালত থেকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে শুনানি ঘিরে এজলাসে হট্টগোল, পরে আদালত প্রাঙ্গণে বিভিন্ন পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
রোববার (৪ অক্টোবর) বেলা আড়াইটার দিকে আদালতের হাজতখানা থেকে আখতারুজ্জামানকে বের করা হয়। তাকে লুঙ্গি পরা অবস্থায় এজলাসে আসতে দেখা যায়। এসময় তাকে ঘিরে ছিল কড়া পুলিশি নিরাপত্তা ও বেষ্টনী। আদালত চত্বরে তার সমর্থকদেরও স্লোগান দিতে দেখা যায়।
শুনানি শুরুর আগে এজলাসে একপর্যায়ে হট্টগোল তৈরি হয়। তাৎক্ষণিকভাবে কী নিয়ে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে শুনানি শেষে আদালত থেকে বের হওয়ার সময় চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নিচে আইনজীবীদের কয়েকজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবীদের ভাষ্য, হাতাহাতিতে বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিত আইনজীবীদের কয়েকজন জড়িত ছিলেন। তবে ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী অভিযোগ করেন, আসামিপক্ষ বহিরাগতদের আদালতে এনে এজলাসে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করেছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আসামিপক্ষের অন্য আইনজীবীদের তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ
বিমানবন্দরে সরকারি কাজে বাধা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে করা মামলায় একদিনের রিমান্ড শেষে আখতারুজ্জামানকে রোববার আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাজেদুল ইসলাম তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
অন্যদিকে, আখতারুজ্জামানের পক্ষে আইনজীবীরা জামিন আবেদন করেন। প্রায় ৩০ মিনিট ধরে উভয়পক্ষের শুনানি চলে। শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে বিকেল ৪টার দিকে তাকে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, মামলায় যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, সেগুলো আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থে কেন তাকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন, সেটিও বলা হয়েছে। শুনানি শেষে আদালত সংশ্লিষ্ট আদেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক মামলাটিকে ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, বিমানবন্দরে দুর্নীতি, লাগেজ চুরি, প্রবাসীদের হয়রানি ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে নামমাত্র এই মামলা করা হয়েছে। মামলায় কোনো ‘কজ অব অ্যাকশন’ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
আব্দুর রাজ্জাক আরও বলেন, আখতারুজ্জামান আগে সংসদ সদস্য ছিলেন এবং পরে অন্য একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেও মামলা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন।
আদালতে কড়া নিরাপত্তা, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ
আখতারুজ্জামানকে আদালতে আনার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কঠোর। পুলিশ সদস্যদের একটি বেষ্টনীর মধ্যে দিয়ে তাকে এজলাসে নেওয়া হয়। এসময় আদালত চত্বরে তার সমর্থকদের স্লোগান দিতে দেখা যায়।
এদিনও পরিচয়পত্র না থাকা সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশ ও অবস্থান নিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রশ্ন করতে দেখা যায়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিক প্রবেশের বিষয়ে আদালতের কোনো নির্দেশনা রয়েছে কি না জানতে চাইলে জানানো হয়, আদালতের কোনো নির্দেশনা নেই।
গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনার পর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলাটি করা হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, ওই ঘটনার সময় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদের সঙ্গে আখতারুজ্জামানের বাগবিতণ্ডা হয় এবং তাকে হুমকি দেওয়া হয়।
এছাড়া সংরক্ষিত এলাকায় ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ায় এক নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে অসদাচরণ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা, জমজমের পানির বোতল ছুড়ে ফেলা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসামিপক্ষ বলছে, বিমানবন্দরে যাত্রী ও প্রবাসীদের হয়রানি এবং লাগেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিবাদ করার কারণেই আখতারুজ্জামানকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে।
একদিনের রিমান্ড থেকে কারাগারে
শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পরে বিমানবন্দর থানার ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
পরদিন গতকাল শনিবার তাকে আদালতে হাজির করে পাঁচদিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে রোববার তাকে আবার আদালতে হাজির করা হয়। এদিন জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এর আগে শনিবার আদালতে নেওয়ার পথে আখতারুজ্জামান রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা করে বলেছিলেন, রাষ্ট্রের মিসম্যানেজমেন্ট আর চলতে পারে না। এভাবে রাষ্ট্র চলতে পারে না। তিনি ‘নির্যাতন দিয়ে আমাদের সংগ্রাম থামানো যাবে না’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন।
সেদিন আদালতে নেওয়ার সময় হাতকড়া ও হেলমেট পরানো নিয়ে আপত্তি জানান আখতারুজ্জামান। পরে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলে ‘সরকারের অবৈধ আদেশ মানি না’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। আদালতে যাওয়ার পথেও তাকে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.