‘তুমি এখনও বাবা হওনি, তাই তুমি বুঝবে না।’ নারীদের নিরাপত্তা, লিঙ্গবৈষম্য কিংবা মেয়েদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো পুরুষের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়।
এর পেছনে রয়েছে একটি পরিচিত ধারণা-বাবা হওয়ার পর, বিশেষ করে কন্যাসন্তানের বাবা হলে, একজন পুরুষ হয়তো নারীদের জীবনের কিছু বিষয়কে আগের চেয়ে অন্যভাবে দেখতে শুরু করেন।
একজন মেয়ের বাবা হওয়ার পর কি সত্যিই বদলে যেতে পারে একজন পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি? মেয়ের বেড়ে ওঠা, তার নিরাপত্তা, পড়াশোনা, পছন্দ, স্বাধীনতা কিংবা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে গিয়ে কি বাবা নারীদের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পারেন? সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে বিষয়টি কোনো সহজ নিয়ম নয়। কন্যাসন্তান হলেই প্রত্যেক বাবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি সমতাবাদী হয়ে যাবেন- এমন প্রমাণ নেই।
নিজের মেয়ের অভিজ্ঞতা থেকেই বদল আসতে পারে
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। লিঙ্গসমতা নিয়ে একটি সাধারণ আলোচনা হয়তো একজন পুরুষের কাছে দূরের কোনো সামাজিক বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে সেই একই বিষয় অনেক বেশি ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে।

মেয়ের স্কুলে যাওয়া, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, নিজের পছন্দমতো পোশাক বা জীবন বেছে নেওয়া, উচ্চশিক্ষা, চাকরি কিংবা ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে গিয়ে বাবা এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন, যেগুলো আগে হয়তো তার কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।
একটি মেয়ে যখন বড় হয়, তখন তার বাবা শুধু তাকে বড় হতে দেখেন না, সমাজ কীভাবে মেয়েদের দেখে, তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করে এবং কোথায় তাদের সামনে বাড়তি বাধা তৈরি হয় সেগুলো কাছ থেকে দেখতে পারেন। এই ব্যক্তিগত সংযোগই কিছু বাবার চিন্তায় পরিবর্তন আনতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করেন।
কর্মক্ষেত্রেও কি দেখা যায় ‘ডটার ইফেক্ট’?
এই ধারণার পক্ষে সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ এসেছে ডেনমার্কের কর্মক্ষেত্র নিয়ে গবেষণা থেকে। ২০২৬ সালে ‘রিভিউ অব ইকোনমিক স্টাডিজ’-এ প্রকাশিত গবেষণায় গবেষকেরা পুরুষ ম্যানেজারের প্রথম সন্তান ছেলে না মেয়ে-তার সঙ্গে পরবর্তী কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, কোনো পুরুষ ম্যানেজারের প্রথম সন্তান কন্যা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নারীদের পুরুষদের তুলনায় আপেক্ষিক আয় প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নারীদের কর্মসংস্থান প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। গবেষকদের বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের বড় অংশ এসেছে নারী কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে। গবেষণাটি নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট ধরনের ডেনিশ প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়ে করা।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কি বদল আসে?
২০২৬ সালের আরেকটি রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় কন্যাসন্তানের বাবাদের সঙ্গে সন্তানের মায়ের সম্পর্কের কিছু দিকও পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রায় ১ হাজার ৭০০ মার্কিন অভিভাবককে নিয়ে করা তিনটি সমীক্ষায় গবেষকেরা দেখতে পান, কন্যাসন্তানের বাবারা সন্তানের মায়ের প্রতি বেশি অ্যাটাচমেন্ট, কমিটমেন্ট, ট্রাস্ট ও ইনটিমেসি বা সংযুক্তি, অঙ্গীকার, বিশ্বাস ও ঘনিষ্ঠতার কথা জানিয়েছেন।
গবেষকেরা এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে একটি বিষয় সামনে এনেছেন-একজন বাবা তার মেয়ের কাছে পুরুষ ও সম্পর্ক সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারেন।
বাবা কীভাবে মেয়ের মায়ের সঙ্গে আচরণ করছেন, সেটিও মেয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক সম্পর্কে ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করেন। তবে এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি। গবেষণাটি কন্যাসন্তান থাকার কারণে প্রত্যেক বাবার আচরণ বদলে যায়-এমন সার্বজনীন সিদ্ধান্ত দেয়নি।
‘ডটার ইফেক্ট’ আসলে কী?
‘ডটার ইফেক্ট’ বলতে সাধারণভাবে এমন সম্ভাব্য পরিবর্তনকে বোঝানো হয়, যেখানে কন্যাসন্তান বড় করার অভিজ্ঞতা একজন বাবার নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, লিঙ্গসমতা বা সম্পর্ক সম্পর্কে চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে মেয়ের বাবা হলেই কেউ নারীবান্ধব হয়ে যাবেন। বরং নিজের মেয়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলে কিছু সামাজিক বিষয় তার কাছে আরও ব্যক্তিগত ও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে এটিও সত্য, কন্যাসন্তান না থাকলেও একজন পুরুষ নারীর সমতা, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সংবেদনশীল হতে পারেন। শিক্ষা, পরিবার, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক পরিবেশ, মূল্যবোধ এবং কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি-সবকিছুই একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রাখে।

মেয়েকে বড় করতে গিয়ে বাবা নিজেও শেখেন:
একটি সন্তানের বেড়ে ওঠা শুধু শিশুর শেখার গল্প নয়। অনেক সময় বাবা-মায়েরও নতুন করে শেখার সময়। একজন বাবা যখন মেয়েকে বড় হতে দেখেন, তখন হয়তো তার সামনে নতুন প্রশ্ন আসে-কেন মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে এত বেশি ভাবতে হয়? কেন একই আচরণের মূল্যায়ন ছেলে ও মেয়ের ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে? কেন একজন মেয়েকে নিজের পছন্দের ক্যারিয়ার বেছে নিতে এখনও এত বাধার মুখোমুখি হতে হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তার নিজের পুরোনো ধারণাগুলোও বদলাতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত কন্যাসন্তান একজন বাবাকে বদলাবেই-এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, মেয়ের অভিজ্ঞতাগুলোকে তিনি কীভাবে দেখছেন, সেগুলো থেকে কী শিখছেন এবং সেই উপলব্ধি নিজের আচরণে কতটা প্রয়োগ করছেন। হয়তো এখানেই ‘ডটার ইফেক্ট’-এর আসল অর্থ-মেয়ে শুধু বাবার কাছে বড় হয় না, তার বেড়ে ওঠার পথ ধরে বাবাও কখনো কখনো পৃথিবীটাকে নতুন চোখে দেখতে শেখেন।
সূত্র: বিবিসি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, মিডিয়াম
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.