প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে ঢাকা শহর। মাঝারি বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় পথঘাট-অলিগলি। যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। বাড়ে জনভোগান্তি। সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক দুর্বিষহ পরিস্থিতি। এবার শরতের বৃষ্টিতেও ডুবছে ঢাকার সড়ক।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না। প্রতি বছর বর্ষায় নগরীর বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সামান্য বৃষ্টিতে প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত পানিতে তলিয়েছে। ভাদ্র-আশ্বিন মাসের বৃষ্টিতেও ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ডুবছে। প্রধান সড়কের পাশেও পানি জমে থাকতে দেখা যাচ্ছে। অথচ এ খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে সংস্থা দুটি।
নগরবাসীর অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে একটু ভারী বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হয়। সড়কে হাঁটু সমান পানি জমে। তখন ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে চলতে গিয়ে অনেকে দুর্ঘটনার মুখেও পড়েন। বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। এবার শরতের বৃষ্টিতেও বিভিন্ন এলাকায় পানি জমছে। বিমানবন্দরের মতো জায়গাও তলিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে। নগর কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না।
তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সংশ্লিষ্টরা জানান, নগরে জলাবদ্ধতা নিরসনে তারা তিন মাস আগ থেকেই কাজ শুরু করেন। এখনো সম্ভাব্য জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলোর ড্রেন, নালা, খাল পরিষ্কারে কাজ চলছে। যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা বেশি হয়, তা সমাধানে আলাদা প্রকল্প নিচ্ছে সংস্থা দুটি।
বর্ষা মৌসুমে একটু ভারী বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হয়। সড়কে হাঁটু সমান পানি জমে। তখন ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে চলতে গিয়ে অনেকে দুর্ঘটনার মুখেও পড়েন। বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে
কিন্তু নাগরিক অসচেতনতায় করপোরেশনের কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না। অর্থাৎ, মানুষ ড্রেন, নালায় প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ ময়লা-আবর্জনা ফেলায় পানি যথাসময়ে অপসারণ হতে পারছে না বলে মনে করে দুই সিটি করপোরেশন।
গত ২২ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত টানা তিন ঘণ্টায় ঢাকায় ৭১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর দিনগত রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয় ৩৪ মিলিমিটার। এ বৃষ্টিপাতে নগরের বিভিন্ন এলাকার শতাধিক স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বৃষ্টিতে কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও জমে যায় কোমর সমান পানি।
ডিএনসিসি:
ডিএনসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্র জানায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর বৃষ্টিতে ডিএনসিসি এলাকার অর্ধশতাধিক সড়ক-গলিতে বৃষ্টির পানি জমে। এর মধ্যে ফার্মগেট, নাখালপাড়া, মিরপুর-১ এর দারুস সালাম রোড, মিরপুর-১০ থেকে ১৪ নম্বর, বেগম রোকেয়া সরণির কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশন, মিরপুরের প্যারিস রোড, কালশী, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর, আশকোনা, আগারগাঁও, শাহজালাল বিমানবন্দর সড়কে হাঁটু সমান পানি জমে। এসব স্থানে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত পানি জমে ছিল। তবে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে তেমন পানি জমেনি।
ফার্মগেটের বাসিন্দা আবির হোসেন বিজনেস ডাইজেস্টকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর ফার্মগেটের তেমন কোথায়ও পানি জমেনি। কিন্তু এবার প্রধান সড়কসহ আশপাশের অলিগলিতে হাঁটুপানি জমছে। পানি নামতে ৫-৭ ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে। অথচ প্রতি বছর বর্ষার আগে জলাবদ্ধতা নিসরণের কথা বলে ডিএনসিসি। কিন্তু এ সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই।’
ডিএনসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্র জানায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২২১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার স্ট্রম ওয়াটার ড্রেন ও ১ দশমিক ৫৪৭ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করা হয়েছে। নর্দমা নির্মাণ করা হয়েছে ১০৫ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার। এছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। কিছু এলাকায় এখনো ড্রেন নির্মাণকাজ চলছে।
এর মধ্যে ধানমন্ডি-২৭ এর জলাবদ্ধতা নিরসনে এরই মধ্যে নতুনভাবে ক্যাচপিট নির্মাণ করা হয়েছে। আয়রন গ্রেটিংস স্থাপন করা হয়েছে এবং নিয়মিত কুইক রেন্সপন্স টিম দিয়ে ক্যাচপিট বা ড্রেনেজ লাইন পরিষ্কার করা হচ্ছে। ফলে ২২ সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমেছে।
কালশী এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে মাস্টার ড্রেন লাইন নির্মাণকাজ চলমান। নাখালপাড়া ও তৎসংলগ্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে পাইপলাইন নির্মাণসহ রাস্তার উন্নয়ন কাজও চলমান। মিরপুর-১ দারুস সালাম রোডের জলাবদ্ধতা কমাতে রাস্তা ও নর্দমার কাজ চলছে। বেগম রোকেয়া সরণি, কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনের জলাবদ্ধতা নিরসনে পাইপ, নর্দমা নির্মাণকাজ চলমান। একইভাবে প্যারিস রোড, উত্তরা সেক্টর-৪, বিমানবন্দর রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় নালা নির্মাণের কাজ চলছে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর সিটির নগর ভবনে ‘ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএনসিসির উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন করেন ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। কিন্তু তাদের পরিকল্পনা ঘোষণার কয়েকদিনের মাথায় বৃষ্টিতে ঢাকা তলিয়ে যায়।
জানতে চাইলে ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন বিজনেস ডাইজেস্টকে বলেন, ‘২২ সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিতে যেসব স্থানে পানি জমেছিল, সেগুলো দ্রুত অপসারণে সকাল থেকে কাজ করেছে ডিএনসিসি। ফলে কোনো সড়কে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকেনি। আর যেসব এলাকা বেশি জলাবদ্ধ হয়, সেখানে ড্রেন, নালা উন্নয়নে কাজ চলছে। এসব কাজ শেষ হলে নগরে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে যাবে।’
ডিএসসিসি:
প্রতি বছর ঘুরেফিরে নিউমার্কেট, আজিমপুর, পলাশী, ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, বংশালের নাজিরাবাজার, কাজী আলাউদ্দিন রোড, শান্তিনগর, বেইলি রোড, কাকরাইল, পল্টনের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। এসব এলাকায় গত ২২ সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিতেও হাঁটুপানি জমেছিল। এর মধ্যে গ্রিন রোড, নিউমার্কেট ও আজিমপুরের অবস্থা ছিল সবচেয়ে নাজুক। এসব এলাকা থেকে পানি নামতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছে।
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, আগে আজিমপুর ও নিউমার্কেট এলাকার বৃষ্টির পানি বুড়িগঙ্গায় নিষ্কাশনে তিনটি ড্রেন ছিল। এর মধ্যে ঢাকা কলেজের সামনে নায়েম রোড হয়ে নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেটের সামনে দিয়ে এবং আজিমপুরের আইয়ুব কলোনি থেকে তিনটি ড্রেন বিজিবি সদরদপ্তরের ভেতর দিয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মিলিত হতো।
২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের পর নায়েম রোড ও আইয়ুব কলোনির ৩০ ইঞ্চির বড় দুটি ড্রেন স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর ৩ নম্বর রোডের গেটের ভেতর দিয়ে একটি ড্রেনে পানি নিষ্কাশন হলেও নিউমার্কেটের প্লাস্টিক, কাপড়সহ নানান আবর্জনায় ড্রেনটির ওই স্থান ভরাট হয়ে থাকে। ড্রেনের এই অংশে ম্যানহোলগুলো দূরে থাকায় পরিষ্কার করতেও বেগ পেতে হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের।
তবে প্রতি বছর নিউমার্কেটের সামনে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ওই মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। দাউদ উল্লা হিল মজিদ নামে এক ব্যবসায়ী বিজনেস ডাইজেস্টকে বলেন, ‘নিউমার্কেটের ভবন কাঠামো বেশ পুরোনো। চারপাশের রাস্তার চেয়ে মার্কেটের ভেতরের জায়গা নিচু। ফলে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে মার্কেটে ঢোকে। এতে মালামাল নষ্ট হয়ে যায়। অথচ এ মার্কেটের চারপাশের নালা-নর্দমা তৈরিতে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করছে সিটি করপোরেশন।’
আজিমপুরের বটতলা এলাকার বাসিন্দা সাব্বির শেখ বলেন, ‘আগে বৃষ্টি হলে বাসা থেকে ছাতা নিয়ে বের হতাম। এখন বৃষ্টি হলে ভাবি, জলাবদ্ধ এলাকা পার হবো কী করে। অর্থাৎ, সড়কে জলাবদ্ধতা এতটাই বেশি, নৌকা চলাচল করতে পারবে। নগরবাসীর দুর্ভোগ কমানোর দায়িত্ব করপোরেশনের। কিন্তু তাদের কোনো উদ্যোগই নেই।’
ডিএসসিসির প্রকৌশল দপ্তর সূত্র জানায়, পানি নির্গমনের আউটলেট অংশ এবং খাল-নদীর অংশের পানির লেভেল প্রায় একই হওয়ায় পানি নিষ্কাশনের ধীরগতি বিদ্যমান থাকায় কিছু এলাকার পানি নামতে দেরি হয়েছে। কারণ স্লুইস গেট, ফ্লাড গেট, রেগুলেটর দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। যদিও গত মে মাসের সভায় এসব স্লুইস গেট পরিদর্শন ও দ্রুত প্রতিবেদন তৈরি করে একটি প্রকল্প প্রণয়নের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়।
তিন মাসেও এ সিদ্ধান্ত আলোর মুখ দেখেনি। এছাড়া কমলাপুর পাম্প স্টেশনের পাম্পগুলো ঢাকা ওয়াসার বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধির সহযোগিতায় দ্রুত মেরামত এবং ছয়টি নতুন পোর্টেবল পাম্প গত ৩০ জুনের মধ্যে কেনার সিদ্ধান্ত হয় ৩১ মের বৈঠকে। তবে কমলাপুরের তিনটি বড় পাম্পের মধ্যে একটি পাম্প এখনো বিকল। পোর্টেবল পাম্প কেনার বিষয়ে এখনো দরপত্রই হয়নি।
জানতে চাইলে ডিএসসিসি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া বিজনেস ডাইজেস্টকে বলেন, ‘প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে নগরীর ড্রেন ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। এ কারণে ভারী বৃষ্টির পরও নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানি কম সময়ের মধ্যে নেমে যায়। তবে নিউমার্কেটসহ বেশকিছু এলাকার পানি নামতে অনেকটা সময় লাগছে।’
তিনি বলেন, ‘নিউমার্কেট এলাকার পানি অপসারণে বিজিবি সদরদপ্তরের ভেতর দিয়ে হাজারীবাগের খালে লাইন তৈরির জন্য ডিএসসিসি একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আগে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিজিবি বাধা দিয়েছিল। তাই কাজ যথাসময়ে শুরু করা যায়নি। এখন তারাও জলাবদ্ধতার শিকার। ফলে বিজিবিও চাচ্ছে প্রকল্পের কাজ যেন শুরু হয়।
জলাবদ্ধতায় মৃত্যু:
বৃষ্টির পানি জমে শুধু ভোগান্তি নয়, মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। ২০২৩ সালে মিরপুরে কমার্স কলেজ সংলগ্ন ঝিলপাড় বস্তির বিপরীত পাশের রাস্তায় বৃষ্টিতে জমা পানিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একই পরিবারের চারজন মারা যান। এ ঘটনার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলেও বর্ষাকাল যেতেই মানুষ ভুলে যায়। সেই জলাবদ্ধতারও কোনো সুরাহা হয়নি।
গত ২২ সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিতে নাজিরাবাজারে জলাবদ্ধতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মো. আমিন (৩০) নামের এক দোকান কর্মচারীর মৃত্যু হয়। নিহত আমিন পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার বাসিন্দা। তিনি পেশায় একটি বেকারি দোকানের কর্মচারী ছিলেন এবং থাকতেন বিডিআর এলাকায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.