1. admin@businessdigestbd.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০৮ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম উচ্চ মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় : ৪ বিষয়ে শিক্ষক সংকট বেশি, শিখনে ঘাটতি পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে দুর্নীতি : ঢাকা ওয়াসার গচ্চা ১৫৬২ কোটি টাকা যশোরে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের প্রাসাদ থেকে অল্প দূরে আছড়ে পড়ল বিমান, ৯ জন নিহত শিক্ষকদের পে-স্কেল বাস্তবায়নে ৩২৬৭ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানায় ছুটি ৪০ হাজার বেতনে চাকরি দেবে রকমারি.কম, থাকছে যেসব সুবিধা পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে মজুরি বোর্ড ঘোষণা ছেলেকে নিয়ে হ্যালোইন উৎসবে শাবনূর

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও তাদের জড়িত হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ

মাকামাম মাহমুদ প্রীতম
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪
  • ১৪৬ বার পঠিত

কিছু দেশ হিজবুল্লাহকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন বলে মনে করলেও, এটি লেবাননের রাজনীতি ও সমাজের সাথে দৃঢ়ভাবে গেঁথে আছে। লেবাননের সেনাবাহিনী থেকেও তারা বেশি সশস্ত্র। তারা নিজেদের মার্কিন ও ইসরায়েলি নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, পাশাপাশি ইরানের সাথে তাদের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। হিজবুল্লাহ নামের অর্থ “আল্লাহর দল”।

হিজবুল্লাহ একটি ধর্মীয় আন্দোলন, যার সদস্যরা প্রধানত ইসলামের শিয়া সম্প্রদায়ের। যদিও লেবানন এর সকল শিয়া মুসলিমরা এর সমর্থন করে না। এটি একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক দলও বটে যাদের লেবাননের পার্লামেন্টে সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদে মন্ত্রী আছে। যদিও তারা দাবি করে যে তাদের ১ লক্ষের বেশি যোদ্ধা রয়েছে, তবে এটি যাচাই করা কঠিন। কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে এই সংখ্যা আরও কম, সম্ভবত ২০ থেকে ৫০ হাজার এর মত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। এটি একটি গোপনীয় সংগঠন, তারা তাদের সদস্যদের পরিচয় গোপন রাখে এবং না আছে তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক ঘাঁটি। হাসান নাসরাল্লাহ হলেন শিয়া ধর্মগুরু, যিনি ৩০ বছরেরও অধিক সময় ধরে হিজবুল্লাহকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাকে সরাসরি প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা যেত কিন্তু যেসব এলাকায় হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন জোরালো রয়েছে, যেমন রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলী এবং লেবাননের দক্ষিণে, তার ছবি লক্ষণীয়। সেই সাথে ইরানের নেতাদের পোস্টারও দেখা যায়। কারণ হিজবুল্লাহ তাদের সাথে ইরানের সংযোগ গোপন করে না। কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে, হিজবুল্লাহ কার্যকরভাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী “ইসলামিক রেভেলিউশনারি গার্ড কর্পস” বা আইআরজিসি এর একটি শাখা।

যেভাবে উত্থান হলো হিজবুল্লাহর :

লেবানন ঐতিহাসিকভাবে সাম্প্রদায়িক এবং ধর্মীয় রেখায় গভীরভাবে বিভক্ত হয়েছে। শিয়া ছাড়া অন্য দুটি প্রধান দল হলো সুন্নি মুসলিম এবং খ্রিস্টান। তাদের সকলকে লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয় যাতে করে ক্ষমতার সুষ্ঠ বন্টন হয়। তবে, বাস্তবে এটি সাধারণত লেবাননের বিভাজনকে আরও খারাপ করে। শিয়া সম্প্রদায় প্রায়শই মনে করে যে তাদের সাথে অবিচার করা হয় এবং লেবাননের সরকার তাদের উপেক্ষা করে। ১৯৭০ সালে শিয়া অধিকারের জন্য একটি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। পিএলও (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন) সহ অন্যান্য দলগুলিও ক্ষমতার জন্য লড়াই করছিল। পিএলও দক্ষিণ লেবাননে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ১৯৭৫ সাল নাগাদ তারা সবাই একে অপরের বিরুদ্ধে চলে যায় এবং একটি গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। যুদ্ধটি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চলেছিল এবং হিজবুল্লাহ যুদ্ধের বিশৃঙ্খলতার মধ্যে দিয়েই গঠিত হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে, ইরানের রাজতন্ত্র উৎখাত হয় এবং শিয়া নেতৃত্বে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। যার নেতৃত্ব দেন রুহুল্লাহ খমেনি। এই বিপ্লব ইরানকে উক্ত অঞ্চলের প্রধান শিয়া শক্তিতে পরিণত করেছিল। ইরান তাদের মতাদর্শ এবং প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল এবং লেবাননে যা চলছিল তা ইরানকে একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৮২ এর পরে যখন ইসরাইল লেবানন আক্রমণ করেছিল। ইসরায়েলি বাহিনী বৈরুতে পৌঁছেছিল, পরবর্তীতে তারা দক্ষিণ লেবাননের একটি অঞ্চল দখলে করে নেয় এবং ২০০০ সাল পর্যন্ত তা ইসরায়েলের দখলেই থাকে। ১৯৮২ সালে লেবাননের শিয়াদের একটি দল যারা ইতিমধ্যেই ইরানের বিপ্লবী মতাদর্শের সাথে যুক্ত ছিল তারা ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একত্রিত হয়েছিল। ইরান এই সংস্থাটিকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রের জন্য অর্থ দিয়ে এর সুযোগ নিয়েছিল এবং এর নাম দেওয়া হয়েছিল হিজবুল্লাহ।

তাদের উত্থান থেকেই হিজবুল্লাহ নিজেদেরকে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। ১৯৮৫ সালে তারা বলেছিল যে ইসরায়েলেকে অস্তিত্ব থেকে বিলুপ্তি তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যগুলির মধ্যে একটি। তারা আরও বলেছে যে তারা শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসাবে লেবাননে অবস্থানরত মার্কিন এবং ফরাসি সেনাদের হটাবে। তাদের কৌশলগুলির মধ্যে ছিল হত্যা, অপহরণ করা, আত্মঘাতী হামলা এবং বৈরুতে মার্কিন দূতাবাসের বোমা হামলা যেখানে ৬৩ জন নিহত হয়। তারপর ১৯৯০ সালে হিজবুল্লাহর মধ্যে পরিবর্তন আসে। লেবাননের গৃহযুদ্ধ শেষ হয়, এবং দলটি রাজনৈতিক একটি প্রধান শক্তিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। ১৯৯২ সালে পার্লামেন্টে প্রথম আসন লাভ করার পর, এটি লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের জন্য একটি বিশিষ্ট কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। ২০০৫ সাল থেকে হিজবুল্লাহর মন্ত্রিপরিষদের মন্ত্রীরা বিভিন্ন সরকারী বিভাগ পরিচালনা করছেন। লেবাননের অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি থেকে হিজবুল্লাহর উল্লেখযোগ্য স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হল এর অস্ত্রাগার। গৃহযুদ্ধের শেষে, হিজবুল্লাহ তাদের অস্ত্রগুলি রেখে দিয়ে ছিল কারণ, তাদের মতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তাদের অস্ত্র প্রয়োজন। তারা দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল এবং ২০০০ সালে ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত চলে যাওয়ার পর তারা অনেক প্রশংসা পেয়েছিল। যুদ্ধ সে থেকে চলমান ছিল। ২০০৬ সালে ৩৪ দিন স্থায়ী ছিল ইসরায়েল লেবানন সংঘাত। লেবাননে হিজবুল্লাহ জনপ্রিয়তার একটি বড় অংশ আসে এই ধারণা থেকে যে এটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর শক্তি। হিজবুল্লাহ কার্যক্রম এবং প্রভাব শুধু লেবাননেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ইরানের প্রতিরোধের অক্ষ হিসেবে পরিচিত সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠী। ইরান এই এলাকায় তার আগ্রহ ও প্রভাব বাড়াতে সংস্থাগুলির এই নেটওয়ার্ককে অর্থায়ন করে। এই নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত আছে ইরাক ও সিরিয়ার ব্যাটালিয়ন, গাজার হামাস এবং ইয়েমেনের হুথি।
হাসান নাসরাল্লাহর মৃত্যুর প্রভাবঃ অনেকেই শঙ্কা করছেন যে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এবং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী শুক্রবার বৈরুতে হিজবুল্লাহর সদর দফতরে একটি বিশাল বিমান হামলা চালায় এবং নাসরাল্লাহ সহ ৬ জন নিহত ও ৯০ জনের বেশি আহত হয়। হিজবুল্লাহ হাসান নাসরুল্লাহর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করার সাথে সাথে বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে শোক শুরু হয়, যেখানে দক্ষিণ শহরতলিতে ইসরায়েলের হামলায় বাস্তুচ্যুত অনেক লোক আশ্রয় নিয়েছে। নাসরাল্লাহর মৃত্যুর পর হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে ঘোষণা করেছে যে তারা “শত্রুর মোকাবেলা করতে, গাজা ও ফিলিস্তিনকে সমর্থন করতে এবং লেবাননকে রক্ষা করার জন্য তাদের জিহাদ চালিয়ে যাবে” তবে সংগঠনটি এখন কী ধরনের শক্তির অধিকারী হবে তা স্পষ্ট নয় কারণ এর অনেক শীর্ষ কমান্ডার এবং নেতা মারা গেছেন। যদি হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করে, তবে এটি ২০০৬ সালের সংঘাতের মতোই হতে পারে যেখানে কোন বিজয়ী ছিল না, তবে এটি সম্ভবত আরও রক্তক্ষয়ী হতে পারে। হিজবুল্লাহর কাছে ২০০৬ সালে ১২,০০ টি ক্ষেপণাস্ত্র ছিল বলে জানা গেছে; আজ, এটি সেই সংখ্যার দশগুণ বলে মনে করা হয়। তাদের বাহিনী আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। একই সময়ে, সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহ প্রমাণ করেছে যে ইসরায়েল হিজবুল্লাহকে কতটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আঘাত করেছে, যেখানে তারা নাসরাল্লাহ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে এবং হত্যা করতে সক্ষম হয়েছিল। ইসরায়েল সতর্ক করেছে যে তারা জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধে পিছপা হবে না, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু শুক্রবার জাতিসংঘে ভাষণ দিয়ে বলেছেন যে এটি “সম্পূর্ণ বিজয়” না হওয়া পর্যন্ত গাজায় হামাস এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে।

তবে লড়াইয়ের ফলাফল যাই হোক না কেন, জড়িত সকল পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এর মত সংস্থাগুলোর উচিত হবে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা এবং যারা যুদ্ধাপরাধে দায়ী তাদের বিচারের আওতায় আনা। ভবিষ্যতের রক্তপাত রোধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য শান্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরও খবর