‘হাশর’ শব্দের অর্থ একত্র বা সমবেত করা। ইসলামি পরিভাষায়, মৃত্যুর পর কেয়ামতের দিন সব মানুষকে পুনরায় জীবিত করে আল্লাহর সামনে সমবেত করাকে হাশর বলা হয়। এটি ইমানের অষ্টম শাখা, এর ওপর আমাদের বিশ্বাস আনা ফরজ। এই বিশ্বাসের সঙ্গে মানুষের দুনিয়াবি জীবনেরও গভীর যোগ রয়েছে। কারণ, মানুষের প্রতিটি কাজের পরকালীন পরিণতি আছে। হাশরের দিন সেটি স্পষ্ট হবে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত হাশরের বাস্তবতা ও এর ইমানের তাৎপর্য বুঝতে সাহায্য করে। নীচে হাশরের ওপর ইমানের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো।
১. মৃত্যুর পর মানুষ আবার জীবিত হবে:
হাশরের ওপর ইমানের অন্যতম ভিত্তি হলো মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষের অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটবে না। কেয়ামতের দিন সব মানুষকে পুনরায় জীবিত করে আল্লাহর সামনে দাঁড় করানো হবে। এই পুনরুত্থান ও সমাবেশ অবশ্যম্ভাবী।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে এক মহান দিবসে? যেদিন মানুষ বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে এসে দাঁড়াবে।’ (সুরা মুতাফফিফিন: ৪-৬)
২. নিজের আমলনামা নিজেকেই পড়তে হবে:
মানুষের প্রতিটি কাজ সংরক্ষিত হচ্ছে এবং কেয়ামতের দিন তা তার সামনে প্রকাশ করা হবে। সেদিন মানুষ নিজের আমলনামা হাতে পাবে এবং নিজের কৃতকর্মের হিসাব নিজেই দেখতে পারবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি প্রত্যেক লোকের ভাগ্য তার কাঁধেই ঝুলিয়ে রেখেছি (অর্থাৎ তার ভাগ্যের ভাল-মন্দের কারণ তার নিজের মধ্যেই নিহিত আছে) আর কেয়ামতের দিন তার জন্য আমি এক কিতাব বের করব যাকে সে উন্মুক্ত অবস্থায় পাবে। (তাকে বলা হবে) ‘পাঠ কর তোমার কিতাব, আজ তোমার হিসাব নেওয়ার ব্যাপারে তুমিই যথেষ্ট।’ (সুরা বনি ইসরাইল, ১৩-১৪)
৩. দুনিয়ার সব কাজের হিসাব দিতে হবে:
মানুষ দুনিয়ার জীবনে অনেক কাজই ভুলে যায়। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কাজই হারিয়ে যায় না। হাশরের দিন মানুষকে তার কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করা হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যেদিন আল্লাহ তাদের সবাইকে জীবিত করবেন, তারপর তারা যা করেছিল সে সম্পর্কে তাদের অবহিত করবেন। আল্লাহ তার হিসাব রেখেছেন, যদিও তারা তা ভুলে গেছে।’ (সুরা মুজাদালাহ: ৬)
৪. মানুষ ডান বা বাঁ দিক থেকে আমলনামা পাবে:
হাশরের দিন কেউ আমলনামা ডান হাতে পেয়ে সহজ হিসাব ও আনন্দ লাভ করবে, আর কেউ তা পিঠের পেছন দিক থেকে পেয়ে ধ্বংস ও শাস্তির মুখোমুআল্লাহ আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব নেওয়া হবে খুব সহজভাবে; আর সে তার স্বজনদের কাছে আনন্দিত হয়ে ফিরে যাবে। আর যাকে তার আমলনামা পিঠের পেছন দিক থেকে দেওয়া হবে, সে মৃত্যুকে ডাকবে এবং জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে।’ (সুরা ইনশিকাক: ৭-১২)
৫. আমলনামায় ছোট-বড় সব কাজ প্রকাশ পাবে:
দুনিয়ায় যে কাজকে তুচ্ছ মনে করে মানুষ ভুলে যায়, হাশরের দিন সেটিও আমলনামায় দেখতে পাবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদের দেখবে তাতে যা আছে, তার কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত। তারা বলবে, ‘হায়! এ কেমন কিতাব, যা কোনো ছোট কিংবা বড় কাজই গণনা না করে ছাড়েনি!’ তারা যা করেছে তা সামনে উপস্থিত পাবে, আর তোমার রব কারও প্রতি জুলুম করবেন না।’ (সুরা কাহফ, ৪৯)
৬. মানুষ আপনজন থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে:
হাশরের দিনের ভয়াবহতা এমন হবে যে, মানুষ নিজের হিসাব ও পরিণতি নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। মানুষ তার ভাই, মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তান কারও কথা ভাববে না।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা ও বাবার কাছ থেকে, তার স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকবে।’ (সুরা আবাসা: ৩৪-৩৭)
৭. মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সাক্ষ্য দেবে:
হাশরের দিন মানুষ নিজের অপরাধ অস্বীকার করতে পারবে না। আল্লাহর নির্দেশে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। তাই মানুষের কথা ও কাজের পাশাপাশি তার নিজের শরীরও সেদিন তার কর্মের সাক্ষী হয়ে উঠবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, আর তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা ইয়াসিন: ৬৫)
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.