মানুষের জীবনে ভ্রমণ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ভ্রমণ মূলত জীবনকে উপলব্ধি করতে শেখায়। মনের ক্ষুধা মেটায়। ভ্রমণে চোখের তৃপ্তি লাভ হয়। ভ্রমণ শেষে যেন পরিপূর্ণ হয় মানুষের মন। তাই জীবনে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়া উচিত। কখনো কখনো সাধারণ যাত্রাও আপনাকে ভ্রমণ উপলব্ধি এনে দিতে পারে।
একবার ছোটবোনের সঙ্গে লঞ্চে করে ঢাকা যাচ্ছিলাম। লঞ্চের ডাবল কেবিন ভাড়া ৩ হাজার টাকা। আমি ‘চাঁদের পাহাড়’ বইটি নিয়ে কেবিনের সামনের চেয়ারে বসলাম। নদীর উথাল-পাতাল ঢেউ এবং শীতল বাতাস সময়কে আরও ঘনীভূত করে। এরই মধ্যে একটি বাক্য বাতাসে ভেসে এলো, ‘মো. জহুরুল ইসলাম, মো. জহুরুল ইসলাম, তোমাকে তোমার বাবা ডাকছেন।’ কিছু সময়ের জন্য আন্টির দিক তাকিয়ে থাকলাম। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভাইয়া বাদাম খেতে খেতে বললেন, ‘আরও কত কিছু দেখার বাকি।’
সময় তখন ৭টা। তৃষ্ণার্ত অনুভব হচ্ছে। বোনকে বললাম, ‘সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চল কফি পান করি।’ লঞ্চের কর্মীকে ডাক পাঠালাম। কফির বিষয়টি স্পষ্ট করলাম। কিছুটা সময় পর লঞ্চকর্মী ট্রেতে করে দুই কাপ কফি দিয়ে গেল। স্বাদবিহীন কফি।তবে অপ্রয়োজনীয় চিনি বিশিষ্ট। কফির মূল্য চিনির মতোই অতিরিক্ত। দুই কাপ ৮০ টাকা। তবে যাত্রাপথে মানুষ নিরুপায়।
জ্যৈষ্ঠ মাস। গরমের তীব্রতা প্রকটভাবে বিস্তার লাভ করেছে। রাত তখন ৩টা বাজে। কেবিনে আর থাকা যাচ্ছে না। কৃত্রিম পাখার বাতাস যেন গরমের সাথে বন্ধুত্ব করায় ব্যস্ত। কিছুটা অস্বাভাবিক পরিবেশ। বিরক্তভাব কাটাতে দরজা খুলে কেবিনের সামনে চেয়ারে বসে থাকা। মৃদু বাতাস কিছুটা ক্লান্ত দূর করতে সক্ষম হলো।
হঠাৎ মনে হলো, ‘প্রিয়াঙ্কা’ নাম ধরে শান্ত কণ্ঠস্বরে কেউ ডাকছেন। অন্ধকার এবং জোছনার আবছায়া আলোতে রাবেয়ার মুখ ভেসে উঠল। প্রথমে অপরিচিত মনে হচ্ছিল। আগের মতো নেই। বিবাহিত জীবন। সংসারে জীবনের ঝঞ্ঝাট রাবেয়ার প্রকৃত সৌন্দর্য মলিন করে দিয়েছে। দীর্ঘ আট বছর পর দেখা। পুরাতন স্মৃতিচারণে কেটে গেল কিছুটা সময়। রাবেয়ার ননদের বাচ্চা হয়েছে। মূলত ভালো বৌমা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে রাবেয়ার ঢাকা গমন।
ভোর ৫টার দিকে ঘাটে লঞ্চ নিজস্ব অবস্থান বুঝে নিল। আমরা আরও কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলাম। ৯টার দিকে বাসায় যাওয়ার জন্য বন্দোবস্ত করলাম। ব্যাগ নেওয়ার জন্য একদল কুলি এগিয়ে এলেন। নির্দিষ্ট একজন কুলিকে নির্বাচন করে লঞ্চ থেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। মানুষের কোলাহল ভ্রমণের সমাপ্তি ঘোষণা করলো।
পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই মূলত পরিব্রাজক। সবাই আমরা ভ্রমণপিপাসু। কখনো প্রয়োজনে বেরিয়ে পড়ি। কখনো অপ্রয়োজনে। এই অপ্রয়োজনে বেরিয়ে পড়াকেই আমরা ভ্রমণ বলি। তবে যে কোনো ভ্রমণ থেকেই মানুষ শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে জীবন সমৃদ্ধ করতে পারে।
লেখক: মাস্টার্স (ব্যবস্থাপনা), সরকারি ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স
Copyright © 2026 দৈনিক বিজনেস ডাইজেস্ট. All rights reserved.